ঢাকা,  শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

[ আন্তর্জাতিক ]
ক্ষতিপূরণ আদায়ে মালিকের আইনি

ইউক্রেনের কয়েক ডজন হোটেল দখল রাশিয়ার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩২, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ইউক্রেনের কয়েক ডজন হোটেল দখল রাশিয়ার
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চলে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পূর্বে আজভ সাগর উপকূলের কয়েক ডজন হোটেল ও অবকাশযাপন কেন্দ্র দখলে নিয়েছে রাশিয়া। এসব সম্পত্তির মালিকানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে অনেক হোটেলকে ‘মালিকহীন’ ঘোষণা করেছে রুশ নিয়োগ করা কর্তৃপক্ষ। তবে দখল হয়ে যাওয়া নিজের হোটেলের মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ ফিরে পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এক ইউক্রেনীয় ব্যবসায়ী।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের অধিকৃত এলাকায় সাত হাজারের বেশি সম্পত্তিকে ‘মালিকহীন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রুশ নিয়োগ করা প্রশাসন। এর মধ্যে ৫২১টি হোটেল ও অবকাশযাপন কেন্দ্র রয়েছে। অন্তত ৭৭টি হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র ইতোমধ্যে রুশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে গেছে। এর মধ্যে ২০টি রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, সম্পত্তির মালিকেরা চাইলে রুশ আইনে নিজেদের মালিকানা পুনর্নিবন্ধন করতে পারতেন। তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত ইউক্রেনীয়দের সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কারণ, মালিকানা ধরে রাখতে বা দাবি জানাতে তাদের রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

হোটেল হারিয়ে জার্মানি থেকে আইনি লড়াই

দখল হওয়া হোটেলগুলোর একটি হলো ইউক্রেনের কিরিলিভকা এলাকার অ্যাডমিরাল হোটেল। এর মালিক দেনিস কাতিউখা। ২০২২ সালে রুশ বাহিনী ওই এলাকা দখলে নেওয়ার পর হোটেলটির নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি।

রুশ নিয়োগ করা কর্মকর্তারা ইউক্রেনের দেওয়া মালিকানার দলিল ও পাসপোর্ট গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে হোটেলটিকে মালিকহীন হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে একটি রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে হোটেলটির নতুন মালিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর হোটেলটি প্রায় একই ধরনের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে নতুনভাবে চালু করা হয়।

বর্তমানে জার্মানিতে অবস্থান করছেন দেনিস কাতিউখা। সেখান থেকেই নিজের সম্পত্তি ফিরে পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। হোটেল দখলের কারণে আর্থিক ক্ষতির হিসাব তুলে ধরতে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র সংগ্রহ করেন এই ব্যবসায়ী।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের একটি আদালতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। ১১ মাস ধরে চলা মামলায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে কেউ আদালতে হাজির হয়নি। পরে আদালত হোটেল দখলকে কার্যত সম্পত্তি অধিগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করে কাতিউখার পক্ষে ৫১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের রায় দেন।

তবে রাশিয়া এ অর্থ পরিশোধ করবে বলে আশা করছেন না তিনি। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনে গঠিত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায়ও নিজের দাবি নথিভুক্ত করেছেন।

তিন দিনের মধ্যে মালিকানা প্রমাণের শর্ত

রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২২ সালে রুশ বাহিনীর দখলে যাওয়া এলাকার সম্পত্তির মালিকদের নিজেদের মালিকানা প্রমাণের জন্য মাত্র তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে সম্পত্তির দলিল ও পাসপোর্ট নিয়ে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়। যারা যুদ্ধের কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন বা ফিরে যেতে পারেননি, তাদের অনেকের সম্পত্তি মালিকহীন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

রুশ প্রশাসনের বিভিন্ন আদেশ, কোম্পানি ও সম্পত্তির নিবন্ধন এবং পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে এই তথ্য পেয়েছে রয়টার্স। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দখল করা হোটেলগুলোর অনেকগুলো নতুন রুশ ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্লগারের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি রুশ একটি ট্যুর অপারেটরের প্রচারিত তালিকায় মালিকহীন ঘোষিত সম্পত্তির তালিকায় থাকা অন্তত ১০টি হোটেলের সন্ধান পেয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

মালিকানা নিয়ে বিরোধ, বাড়ছে উদ্বেগ

ইউক্রেনের মালিকদের অভিযোগ, যুদ্ধের কারণে নিজেদের সম্পত্তি ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পর এখন সেগুলোর মালিকানা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রশাসন বলছে, সম্পত্তির মালিকেরা রুশ আইনে নিবন্ধনের সুযোগ পেয়েছেন।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) মতে, অধিকৃত অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি দখল ও মালিকানা পরিবর্তনের এ প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সংস্থাটি বলছে, রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ ও সশরীরে উপস্থিত হওয়ার শর্ত বাস্তুচ্যুত ইউক্রেনীয়দের জন্য সম্পত্তির অধিকার রক্ষার পথ কঠিন করে তুলেছে।

এদিকে দখল হওয়া সব হোটেল অবশ্য চালু হয়নি। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু হোটেল এখনো বন্ধ রয়েছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমে অ্যাডমিরাল হোটেলে কক্ষ বুকিংয়ের চেষ্টা করেও সেটি চালু না থাকার তথ্য পেয়েছিল সংবাদমাধ্যমটি।

সম্পত্তির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধের মধ্যেই ইউক্রেনীয় ব্যবসায়ী দেনিস কাতিউখার আইনি লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে আদালতের রায় পাওয়ার পরও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সূত্র: রয়টার্স, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!