স্যাপিওসেক্সুয়াল আসলে কী এবং কারা?
স্যাপিওসেক্সুয়ালদের প্রেম ও যৌনতার অনুভূতি আবর্তিত হয় মস্তিষ্ককে ঘিরে। শারীরিক সৌন্দর্য বা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে তাদের কাছে অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায় অপরদিকের মানুষটির বুদ্ধিমত্তা। অপরদিকের মানুষটির গভীর চিন্তাশক্তি, কৌতূহলী মনোভাব, প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তাদের প্রচণ্ড আকৃষ্ট করে।
মানুষ যখন কারও প্রেমে পড়ে তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই সে চেহারা, বাহ্যিক সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখে প্রেমে পড়ে। কিন্তু এমনকিছু মানুষ আছেন যারা চেহারা কিংবা শারীরিক সৌন্দর্য নয়, শুধু বুদ্ধিমত্তা দেখেই প্রেমে পড়েন তারা। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’।
আপনি কি স্যাপিওসেক্সুয়াল?
- আপনি কি কাউকে তার চিন্তাধারার জন্য পছন্দ করেন?
- আপনি কি গভীর আলাপ-আলোচনায় বেশি স্বস্তি পান?
- আপনি কি আবেগ নয়, যুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক খোঁজেন?
- আপনি কি প্রথমে বন্ধুত্ব গড়েই ধীরে প্রেমে এগোন?
যদি উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তবে আপনি স্যাপিওসেক্সুয়াল হবার সম্ভাবনা রাখেন।
Sapiosexual বা স্যাপিওসেক্সুয়াল শব্ধটি একটি স্প্যানিশ শব্ধ। এটির অর্থ হলো, বুদ্ধিমত্তার প্রতি যৌনরূপ আকর্ষণ বা উদ্দিপনা। যে ব্যাক্তির মধ্যে এটি থাকে তাকে বলা হয় স্যাপিওসেক্সুয়াল। এই স্যাপিওসেক্সুয়ালিটি হলো, একজন ব্যাক্তি, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যাক্তির প্রতি খুবই আকর্ষণ বা উদ্দিপনা বোধ করে যৌনরূপ আকর্ষণ বা উদ্দিপনার মত।
মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক আলোচনা থেকে তারা রসদ সংগ্রহ করেন, এবং মনে করেন কারো যৌন আকর্ষণ শরীরে নয়, বরং তার মেধায় লুকিয়ে থাকে। আপনিও কি এমন? মিলিয়ে নিন।
স্যাপিওসেক্সুয়ালদের বৈশিষ্ট্য -
১) যেকোন ভাবে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন আরেকজন কে বুঝতে চেস্টা করে থাকেন। ধীরে ধীরে এটি গভীরতর হয়। আর এটায় যে উপাদানটি কাজ করে তাহলো বুদ্ধিমত্তা।
২) এমন ব্যাক্তি প্রায় ছোট ছোট বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলেন। বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বা রসবোধপূর্ণ কথা বলা ব্যাক্তির প্রতি আকর্ষণ, উদ্দিপনা বা ভালো লাগা কাজ করে থাকে। তার সাথে অতিরিক্ত সময় কাটাতে ভালো বোধ হয়।
৩) এরূপ ব্যাক্তি প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ভালবাসেন।
৪) এরূপ ব্যাক্তি বিনয়ী হয়ে থাকেন। যারা পরদুঃখকাতর, সহানুভূতিশীল এবং একে অন্যকে বুঝে থাকেন, তারা এরূপ ব্যাক্তিকে পছন্দ করেন এবং বুদ্ধিমত্তার একটি বৈশিষ্ট্য বহন করে এর মাধ্যমে।
৫) এরূপ ব্যাক্তি দারুণ যোগাযোগ সম্পন্নকারী। হাসি যেন এদের মুখে লেগেই থাকে।
৬) এরূপ ব্যাক্তি একে অপরের প্রশংসা করে থাকেন। এবং যদি আপনাকে আপনার শারীরিক বৈশিষ্ট্য এর চেয়েও বেশি কিছু বলে থাকে তাহলে এটি নিশ্চিত যে আপনার বুদ্ধির জন্যই এমনটা ঘটেছে।
৭) এরূপ ব্যাক্তি দুর্দান্ত বন্ধু বানিয়ে থাকেন। তারা ক্রমবিকাশের বা উন্নতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হন এবং অন্যকে অনেক কিছু শিখিয়ে থাকেন।
স্যাপিওসেক্সুয়ালেরা কখনোই হুট করে প্রেমে পড়েন না। যেহেতু শারীরিক সৌন্দর্য তাদের টানে না, তাই প্রেমে পড়তে তাদের সময় লাগে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আগে বন্ধুত্ব হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও বৌদ্ধিক সংযোগ হলে তবেই আসে প্রেমের প্রশ্ন।
নৃবিজ্ঞানের গবেষক ইপন শামসুল স্যাপিওদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন- স্যাপিওসেক্সুয়ালেরা কখনোই হুট করে প্রেমে পড়েন না। যেহেতু শারীরিক সৌন্দর্য তাদের টানে না, তাই প্রেমে পড়তে তাদের সময় লাগে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আগে বন্ধুত্ব হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও বৌদ্ধিক সংযোগ হলে তবেই আসে প্রেমের প্রশ্ন।
তবে দুই ধরণের স্যাপিও দেখা যায়। কিছু আছে যারা বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে আকর্ষণ বোধ করেন। অন্যদের কাছে যৌনতা মুখ্য নয়। বরং ওই মানুষটার সঙ্গে বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি, দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেই ভালোবাসেন তারা। এটাকে বলা যায় প্লেটোনিক প্রেম। যেখানে থাকে না যৌনাকাঙ্ক্ষা কিংবা যৌন আকর্ষণ থাকলেও সেটি মুখ্য নয়।
মেধা বা বুদ্ধির আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি হলেও শারীরিক আকর্ষণ যে একেবারেই নেই, তা নয়। কিন্তু স্যাপিওদের কাছে শারীরিক আকর্ষণটা খুবই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের জন্য কখনোই চেহারাটা বড়ো হয়ে দাঁড়ায় না তাদের কাছে।
স্যাপিওদের কাউকে পছন্দ মানে সত্যিই পছন্দ। এর একটা কারণ স্যাপিওদের সহজে কাউকে পছন্দ হয় না, অনেকটা সময় লাগে। উলটোদিকের মানুষটার সঙ্গে মেধা ও বৌদ্ধিকভাবে সংযোগ স্থাপনের পরই আসে তাকে ভালোলাগার প্রশ্ন। ফলে যখন কাউকে তাদের ভালো লাগে, তখন সেটা বেশ সিরিয়াসই হয়।
স্যাপিওসেক্সুয়ালদের সব সম্পর্কই শুরু হয় বন্ধুত্ব দিয়ে, সেখানে প্রেমের ছিটেফোঁটাও থাকে না। তাই যখন আপনার মনে প্লেটোনিক স্তর পেরিয়ে প্রেমের সূত্রপাত হয়, তখন আপনার বন্ধুও একইরকম ভাবছেন কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ফলে বন্ধুকে মনের কথা বলবেন কি বলবেন না, তা নিয়ে আপনার মনে সংশয় তৈরি হয়।
যারা অতিরিক্ত চিৎকার, মেজাজ দেখানো, কিংবা বোকামী করে তারা স্যাপিওদের দু’চক্ষের বিষ। যারা নিজেদের অনুভূতিকে যুক্তির সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে পারেন, যারা চট করে মেজাজ হারান না, জটিল পরিস্থিতিকেও শান্তভাবে সমাধান করার চেষ্টা করেন, সেরকম মানুষকেই পছন্দ করেন স্যাপিওরা।
খুব বেশি মানুষের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা হয় না সচরাচর। প্রেমের সংখ্যাও আপনার খুবই কম। সাধারণত নিজের ছোট বৃত্তেই থাকতে পছন্দ করেন আপনি। তাই আশপাশের অনেকেই আপনাকে অহঙ্কারী বলে ভুল করেন। তাতে আপনার মোটেই বিচলিত হওয়ার কারণ নেই, নিজের পছন্দ আর ধ্যানধারণায় স্থির থাকুন।