প্রাণীদের জীবনেও শব্দদূষণের প্রভাব!
শব্দপূর্ণ পরিবেশে-
- কমে যাচ্ছে প্রাণীর সংখ্যা
- প্রায় ৮০ শতাংশেরই শারীরিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে
- শিকার ধরতে শিকারি প্রাণীদের প্রায় আড়াই গুণ বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হয়
শব্দদূষণ যে কেবল মানব শরীরেই প্রভাব ফেলে তা-ই নয়, এর গভীর প্রভাব পরে অন্যান্য প্রায় জগত এবং পক্ষীকুলের উপরেও । সমগ্র জীব জগতের উপর শব্দ দূষণ আরও প্রভাব ফেলে বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায়, চারণের ক্ষেত্রে, মানসিক অবসাদের ক্ষেত্রেও । মোটকথা শব্দ দূষণ পক্ষী এবং অন্যান্য প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার ক্ষমতার গোড়ায় কুঠারাঘাত করছে ।
সমস্ত জীব জগতের উপর মনুষ্য কর্তৃক উচ্চ শব্দগ্রামের জন্য প্রভাব পড়ে বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায়, চারণের ক্ষেত্রে এবং মানসিক চাপের ক্ষেত্রে । প্রচণ্ড উচ্চগ্রামের আওয়াজের কুপ্রভাবে সমস্ত প্রাণী জগৎ চলে যেতে পারে বধিরতার অন্ধকারে । ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণা বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছে এই সমস্ত প্রভাবের উপর ।
আমরা সাধারণত শব্দদূষণকে কেবল মানুষের মাথাব্যথা বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবেই দেখি। ট্রাফিকের হর্ন, জাহাজের ইঞ্জিন কিংবা কলকারখানার বিকট শব্দ মানুষের ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, এটাই আমাদের চেনা ধারণা। কিন্তু মানুষের তৈরি এই কোলাহল বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পক্ষীকুল তাদের নিজেদের সঠিক বাসস্থান এবং সঙ্গীর খোঁজে শব্দের উপর নির্ভর করে থাকে । তারা শব্দের উপর নির্ভর করে শিকারিদের বোকা বানায়, সন্তানদের রক্ষা করে এবং নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত রাখে । কিন্তু মানুষের তৈরি শব্দ দূষণ তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগকে ব্যাহত করে এবং খুব দরকারি কাজগুলিকে সমস্যায় ফেলে । পরীক্ষায় এই তথ্যা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত ।
সম্প্রতি Science সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শব্দদূষণ বন্য প্রাণীদের শারীরিক গঠন, আচরণ, প্রজনন এবং খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

গবেষণার পেছনের কথা
যুক্তরাজ্যের কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের গবেষক হ্যান্সইয়র্গ পি. কুঙ্ক ও রুভেন শ্মিট বিশ্বের ছয় মহাদেশের স্থলজ ও জলজ পরিবেশের ১৭৭টি প্রাণীপ্রজাতির ওপর চালানো ২১৪টি পরীক্ষামূলক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁরা প্রাণীদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, বিকাশ, আচরণ, প্রজনন এবং শিকারি ও শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
প্রাণীদের জীবনে শব্দদূষণের বহুমুখী প্রভাব
শারীরিক ও জৈবিক পরিবর্তন: গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্ভুক্ত প্রজাতিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশেরই কোনও না কোনও শারীরিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে কোষীয় স্তরে চাপের লক্ষণ (স্ট্রেস), হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি এবং শারীরিক বিকাশে অনিয়ম দেখা দিচ্ছে।
আত্মরক্ষা ও আশ্রয় গ্রহণে জটিলতা:
স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, শিকারির উপস্থিতি টের পেলে ছোট প্রাণীরা লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষের তৈরি অতিরিক্ত শব্দের কারণে অনেক সময় বদ্ধ স্থানে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়, যা প্রাণীদের ভুল দিকে পরিচালিত করে। ফলে তারা আত্মরক্ষার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বাইরে চলে আসে এবং সহজে শিকারির শিকারে পরিণত হয়।

শিকারি প্রাণীদের চ্যালেঞ্জ:
শব্দদূষণ শুধু শিকার হওয়া প্রাণীদেরই নয়, শিকারিদেরও বিপাকে ফেলে। অতিরিক্ত কোলাহলে শিকারের অবস্থান ও গতিবিধি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, শান্ত পরিবেশের তুলনায় শব্দপূর্ণ পরিবেশে শিকার ধরতে শিকারি প্রাণীদের প্রায় আড়াই গুণ বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হয়, অথচ তাদের সাফল্যের হার কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ।
খাদ্যজালের ভারসাম্য নষ্ট:
শব্দদূষণের প্রভাব সব প্রজাতির ওপর সমান নয়। কোনও প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য কোনও প্রজাতি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। যেমন—কোনও শিকারি প্রাণী যখন ব্যর্থ হয়, তখন অন্য কোনও প্রাণী সহজেই সেই বিভ্রান্ত শিকারকে কাবু করতে পারে। এই বিশৃঙ্খলা প্রকৃতি ও খাদ্যজালের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে দেয়।
শব্দপূর্ণ পরিবেশে কমে যাচ্ছে প্রাণীর সংখ্যা
শব্দদূষণ শুধু প্রাণীদের ব্যক্তিগত আচরণ বা দৈনন্দিন জীবনকেই প্রভাবিত করছে না, তাদের সামগ্রিক উপস্থিতি ও সংখ্যাও কমিয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শান্ত পরিবেশের তুলনায় শব্দদূষণযুক্ত এলাকায় প্রাণীর উপস্থিতি বা ঘনত্ব প্রায় ৩৭ শতাংশ কম থাকে। অর্থাৎ, শান্ত এলাকায় যদি ১০০টি প্রাণী থাকে, তবে তুলনামূলক শব্দপূর্ণ এলাকায় তা নেমে আসে প্রায় ৬৩টিতে।

সুরক্ষায় করণীয়
গবেষকদের মতে, বন্য প্রাণীদের টিকে থাকার লড়াইয়ে শব্দদূষণ এখন অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু বন, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করলেই চলবে না, রক্ষা করতে হবে সেখানকার স্বাভাবিক শব্দপরিবেশ বা অ্যাকুস্টিক এনভায়রনমেন্ট।
এর জন্যে সংবেদনশীল প্রাকৃতিক এলাকায় কম শব্দের অঞ্চল তৈরি, জাহাজ ও শিল্পকারখানার শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণীদের জন্যে শব্দমুক্ত নিরাপদ আশ্রয় বা ‘অ্যাকুস্টিক রিফিউজ’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
এই গবেষণা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির অসংখ্য প্রাণী তাদের বেঁচে থাকা, যোগাযোগ ও প্রজননের জন্য সম্পূর্ণভাবে নীরব ও স্বাভাবিক শব্দের ওপর নির্ভরশীল। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক : মুস্তাকিম গিয়াস, বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ও গবেষক
Journal Reference: Hansjoerg P. Kunc et al.
Echoes of the Anthropocene: Noise pollution as a global threat.
Science (2026).