প্লাস্টিকের দাপট কমাতে পারছেনা সরকার
পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ, পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তা সত্ত্বেও প্লাস্টিক মোড়ক এবং কৃত্রিম তন্তুর বিস্তার ঠেকাতে কয়েক দশক ধরেই লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশেকে। পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সিন্ডিকেটের কাছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবান্ধব পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় হলেও, ক্ষতিকর প্লাস্টিক বস্তার আগ্রাসন ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে প্রায় ৫,০০০টি অটো চালকল এবং কয়েক হাজার আংশিক স্বয়ংক্রিয় চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা/মিল রয়েছে, যার বেশিরভাগই পলিথিনের বস্তা ব্যবহার করে।
একটি ৫০ কেজি (১১০ পাউন্ড) ধারণক্ষমতার কৃত্রিম বা প্লাস্টিকের ব্যাগের দাম ২০ টাকা (১৬ সেন্ট), যেখানে একটি পাটের বস্তার দাম পড়ে ৮০ টাকা (৬৫ সেন্ট)। এই ব্যাগ একবারের বেশি ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে একটি পাটের বস্তা আমরা ধান বা চাল বহনের কাজে অন্তত ৩ বার ব্যবহার করতে পারি। এরপর ছিঁড়ে গেলে তা সেলাই করে চালের কুঁড়া বহনের কাজে আরও ৩ বার ব্যবহার করা যায় ।
পাট খাতকে সুরক্ষা দিতে চাল, গম ও সারসহ ১৯টি নিত্য পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে পাটের বস্তা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে, ১৬ বছর আগে একটি আইন প্রণয়ন করে সরকার।
কিন্তু সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে পণ্যের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিক ও কৃত্রিম তন্তুর দাপট কমেনি, অন্যদিকে এসব পলিথিন বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক পরিবেশগত সংকট।
পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০ অনুযায়ী, ১৯টি নিত্য পণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহনে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তবে আইনটির প্রয়োগ না থাকায় পাট শিল্পকে সুরক্ষা দিতে পারছেনা এটি।
ভোক্তাদের দোরগোড়ায় সহজে সস্তা প্লাস্টিকের বস্তা পৌঁছে দেয় ব্যবসায়ীরা। অথচ ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে সরকার । পাটের বস্তা ও ব্যাগ তৈরি হতো এসব কলে।
সরকার বাজারে পাটের ব্যাগের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না, অথচ পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। জরিমানাও করছে আমাদের। এটি কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়।
পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০ অনুযায়ী, ১৯টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এই তালিকায় রয়েছে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, আলু, আটা-ময়দা, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, ডাল, চালের কুঁড়া, ভুসি, পোল্ট্রি ফিড এবং ফিশ ফিড।
পাট অধিদপ্তর-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮০ লাখ বেলের (১৪ লাখ ৪০ হাজার টন) বেশি পাট উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭৫ লাখ বেলেরও (১৩ লাখ ৫০ হাজার টন) বেশি। আর ওই অর্থবছরে দেশে পাটের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫৪ লাখ বেল (৯ লাখ ৭২ হাজার টন)।
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ কৃষক পরিবার পাট চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পাট অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ৮২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে বাংলাদেশ।