ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ কৃষি ও প্রকৃতি ]

ভুট্টার হাসিতে হাসুক বাংলাদেশ

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১১:১৯, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ভুট্টার হাসিতে হাসুক বাংলাদেশ
খাদ্য হিসেবে ভুট্টার উপযোগিতা সম্পর্কে প্রচারণা না থাকায় মানুষের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকায় এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি

বর্তমান উৎপাদন ও আবাদ পরিস্থিতি

  • উৎপাদন: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৬৮.৮৪ লক্ষ টন, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল মাত্র ২৭.৫৯ লক্ষ টন।
  • আবাদি জমি: ২০১১-১২ অর্থবছরে ভুট্টার আবাদি জমি ছিল ২.৮৩ লক্ষ হেক্টর, যা বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ৫.৭৮ লক্ষ হেক্টর।
  • বার্ষিক চাহিদা: দেশে বর্তমানে ভুট্টার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লক্ষ টন।
  • শীর্ষ উৎপাদনে জেলা: দিনাজপুরে ২০২৩-২৪ মৌসুমে সর্বোচ্চ প্রায় ৯ লক্ষ ৯০ হাজার টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঝিনাইদহ, জামালপুর ও গাইবান্ধায় ব্যাপকহারে ভুট্টা আবাদ হয়।
  • দেশের উৎপাদিত ভুট্টার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাণিখাদ্য বা ফিডশিল্প।

ভুট্টা উৎপাদনের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের মধ্যে ২য় অবস্থানটি বাংলাদেশের। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে হেক্টরপ্রতি ভুট্টায় গড় উৎপাদন ৫ দশমিক ১২ মেট্রিক টন। বাংলাদেশে এই হার ৬ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন। 

অতএব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে ভুট্টায়। জমির উর্বরা শক্তি, অনুকূল আবহাওয়ায় বাংলাদেশে ভুট্টার আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে। ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। বেশি লাভ ও নিশ্চিত বাজার তৈরি হওয়ায় দেশে ধান ও গমের বদলে ভুট্টার আবাদ বাড়ছে। মূলত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধান ও গম চাষের বদলে কৃষকেরা এখন ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। 

দেশে ধানের চেয়ে দাম বেশি পাওয়ায় ভুট্টা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। ফলে বছর বছর বাড়ছে ভুট্টার উৎপাদন। তাছাড়া ভুট্টা আবাদে পানি ও কীটনাশক লাগে কম। স্বল্প পরিচর্যায় উচ্চ ফলনের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে ভুট্টার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। এতে পশুখাদ্য তৈরির অপরিহার্য এ উপাদানের আমদানিও কমছে। দেশের উৎপাদিত ভুট্টার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাণিখাদ্য বা ফিডশিল্প।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রধান দানা ফসল ভুট্টা মেইজ, কর্ণ ও পপকন নামে পরিচিত। দেশে সবজি বিপ্লবের সাথে যোগ হয়েছে ভুট্টা বিপ্লব। বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান দানাশস্য হিসেবে ভুট্টা গুরুত্বপূর্ণ ফসল হিসেবে অবদান রাখছে। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার বছরে ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। ভুট্টার উৎপাদন ৪০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে শীর্ষে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ।

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বেড়েছে ভুট্টা চাষ

বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। তাদের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬১, ৫ দশমিক ৩৫ ও ৩ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এর উৎপাদনশীলতা ২ দশমিক শূন্য ৬ মেট্রিক টন।  এক দশক আগেও ধান ও গমের চেয়ে অনেক কম চাষাবাদ হতো ভুট্টার। বর্তমানে উৎপাদনে গমকে ছাড়িয়ে গেছে ভুট্টা। 

আগে অনেক এলাকায় আমন চাষের পর জমি পতিত থাকত। এখন সেসব জমিতে ভুট্টা চাষ হচ্ছে। এ কারণে চাষিদের মধ্যে গম ও বোরো ধানের বিকল্প হিসেবে ভুট্টার জনপ্রিয়তা ও চাষের এলাকা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ফিড মিলগুলোতে প্রায় ২৫ লাখ টন ভুট্টার চাহিদা রয়েছে। 

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে জানা যায়, ফিড মিলের প্রধান উপাদান ভুট্টা। আগে এর পুরোটাই আমদানিনির্ভর থাকলেও এখন স্থানীয়ভাবেই চাহিদা মিটছে। এতে কম দামে পশু, মাছ ও মুরগির খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। 

ভুট্টা উৎপাদনে এ অগ্রসর অবস্থান অর্জনের পেছনে কৃষক ছাড়াও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ কাজ করেছে। বীজ, সারসহ অন্যান্য উপকরণপ্রাপ্তিতে কৃষকদের সহায়তা দান, বাস্তবমুখী নীতিমালা প্রণয়ন ও সেগুলোকে কৃষক পর্যায়ে দ্রæত বাস্তবায়ন ও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে সামনের দিনগুলোয় ভুট্টা উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের। 

ভুট্টা চাষ সম্পর্কে কৃষি বিজ্ঞানী ডক্টর আখতারুজ্জামান জানান, ভুট্টা চাষের বড় সুবিধা হলো রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম ঘটে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ভুট্টা চাষে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসছে কৃষকদের। আবাদ ও উৎপাদনে নেই কোন ঝুঁকি। ফলনে গমের চেয়ে প্রায় ৪গুণ বেশী। দেখা গেছে চরাঞ্চলে যেখানে অন্যান্য ফসল চাষাবাদ হয় না,  সেখানে ভুট্টা উৎপাদনে কৃষকরা বিরাট লাভবান হচ্ছেন। 

প্রচলিত আছে ডিপোজিট পেনশন স্কীম (ডিপিএস) চালু করা অনেক কৃষকের ভাগ্যে জোটে না। তাই কৃষকরা ভুট্টাকে ডিপিএস আবাদ বলে থাকেন। কারণ গমের মার আছে, আবহাওয়া খারাপ হলে দানা মরা হয় ও ক্ষতিরও আশংকা থাকে। আর ভুট্টায় তা হয় না। কোনরকমে আবাদ করলেই ফল পাওয়া যায অন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলনামূলক বেশী। তাছাড়া পরিচর্যাসহ আবাদ খরচ খুবই কম। 

ব্যবহার বাড়ছে খাদ্যপণ্যে
Benefits Of Eating Corn: ভুট্টার প্রতিটি দানা ওষুধের চেয়ে কম নয়, কী ভাবে  খেলে বেশি উপকার পাবেন, করিনার পুষ্টিবিদের থেকে জেনে নিন... - corn is a  superfood learn the ...

মাছ বা অন্য প্রাণীজ খাদ্যের পাশাপাশি ভুট্টা খাবারের টেবিলেও জায়গা করে নিচ্ছে। বহুবিধ ব্যবহার বাড়ছে দানাদার এ শস্যের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনও বেড়েছে।

ভুট্টার কোন অংশই ফেলে দিতে হয় না। উপরের পাতা গো-খাদ্য, ডালপালা জ্বালানী, মাড়াই করে ভুসি পোলট্রি খাবার ও আটা-ময়দা তৈরী হয়। ভুট্টা থেকে শিশু খাদ্য, গ্লুকোজ, বার্লি, এ্যারারুট ও তেল হয়। ভুট্টার আটা-ময়দায় বিস্কুট ও পাউরুটি হয় সুস্বাদু। কাঁচা ভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। তৈরী হয় খৈ। ভুট্টার পপকর্ণ শহরাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। মানুষের জন্য নানা রকমের খাবার  তৈরি করা যায় ভুট্টা থেকে। রুটি, আটা বা গোলআলুর সাথে  মিশিয়ে রুটি, পুরি, ভুট্টার প্যানকেক, ভুট্টার বিস্কুট, ভুট্টা খিচুরি, ভুট্টা-চাল খিচুরি, ভুট্টা পোলাও, সবুজ ভুট্টার দানা, সেদ্ধ বা পুড়িয়ে অনেকভাবেই ভুট্টাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। 

বাংলাদেশে মূলত হাঁস-মুরগির ও গোখাদ্য হিসেবে ভুট্টার দানা ব্যবহার করা হয়। মৎস্য খাদ্যেরও একটি অন্যতম উপকরণ হলো ভুট্টা দানার গুঁড়া। চিকিৎসকদের মতে, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশী। ভুট্টা শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। ভুট্টায় বিদ্যমান ভিটামিন-এ এবং সি ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে। ভুট্টা শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, এতে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে।এটি ডায়বেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ভুট্টাতে থাকা বিটা ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টি বাড়াতে সাহায্য করে। 

সুত্র জানায়,ভুট্টার বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ১০/১২ ভাগ। ভুট্টার তেল ভোজ্যতেল হিসেবে উত্তম। শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও দুগ্ধপানকারী মায়ের জন্য ভুট্টার তেল উত্তম। তাছাড়া ভুট্টাতে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম এবং সালফার এসব গৌণ খনিজ উপাদান বেশ ভালোই রয়েছে।

নতুন জাত 
দিনাজপুরের ১৩ উপজেলায় ভুট্টা চাষিদের মহোৎসব | জাতীয় | বাংলাদেশ সংবাদ  সংস্থা (বাসস)

মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে ভুট্টার দুই হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জাত দু’টির নাম রাখা হয়েছে-সাউ (এসএইউ) হাইব্রিড ভুট্টা-১ ও সাউ হাইব্রিড ভুট্টা-২। হাইব্রিড এ জাত দু’টি পুরো দেশেই চাষ করা যাবে বলে জানিয়েছেন উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল্লাহেল বাকী। তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি (কৃষিতত্ত¡) বিভাগের অধ্যাপক। উদ্ভাবিত জাত দু’টি রবি (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ও খরিপ-১ (মার্চ-মে) মৌসুমে চাষ করা যাবে। দেশীয় জাতের চেয়ে উদ্ভাবিত জাত দু’টি তুলনামূলক খাটো প্রকৃতির। তাই ঝড়ে বা প্রবল বাতাসে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম। ড. মো. আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, জাত দুটির মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদ (ট্রায়াল) করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর ও পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জে। জাত দু’টির রবি মৌসুমে বিঘাপ্রতি গড় ফলন ৪৫ থেকে ৫০ মণ ও খরিপ-১ মৌসুমে বিঘাপ্রতি গড় ফলন ২৫ থেকে ৩৩ মণ পাওয়া যাবে। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত বেশ কিছু উন্নত জাত ও হাইব্রিড ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হচ্ছে- শুভ্র, বর্ণালী, মোহর, খই ভুট্টা, বারি ভুট্টা-৫ থেকে বারি ভুট্টা-৭, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৩, বারি টপক্রস হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩। 

চাষে শীর্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলা

ভুট্টা বদলেছে চরবাসীর ভাগ্য | The Business Standard
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, যশোর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, দিনাজপুর, নাটোর, রাজশাহী, চাপাঁই নবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, কুমিলা, চট্রগ্রাম ও বান্দরবন ভোলা, পটুয়াখালী ও বরিশাল জেলাসহ দেশের সবখানেই কমবেশী ভুট্টা আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষও বাড়ছে। রবি ও খরিপ দু’মৌসুমেই ভুট্টার চাষ হয়ে থাকে। পোলট্রি শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভুট্টার চাহিদা বেড়েই চলেছে। 

আবহাওয়া অনুকূলে থাকালে চুয়াডাঙ্গায় ভুট্টা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বহুমুখী ব্যবহার ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিক লাভজনক হওয়ায় ভুট্টা এখন এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় ভুট্টার আবাদ বাড়ছে। চাষিরা অর্থকরী এ ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবার রেকর্ড চাষাবাদ হয়েছে। 

তথ্যানুযায়ী দেশের সবগুলোর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা আবাদ হয় এ জেলায়। দেশে প্রতিনিয়ত ভুট্টার চাষ বাড়ছে। গত কয়েক বছরে ধানের দাম কম থাকায় ভুট্টা চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকের। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় হাসি ফুটছে কৃষকের মুখেও। 

অদি  ও অন্ত
ভুট্টার ইতিহাস আসলেই খুব আশ্চর্যজনক কেননা আজ আমরা যাকে কর্ন হিসেবে জানি তা অতীতে কর্ন হিসেবে পিরিচিত ছিল না। পৃথিবী পরিবর্তনের সাথে সাথে এর পরিচিতি পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ভুট্টা। ভুট্টার ইংরেজি  ঈড়ৎহ শব্দটি এসেছে পুরানো জার্মান ও ফ্রেঞ্চ শব্দ থেকে। ১৬ শতাব্দির আগে প্রধান শষ্য হিসেবে জার্মানিতে চাষ করা হতো। 

আবার ইংল্যান্ডে, স্কটল্যান্ডে ও আয়ারল্যান্ডে একে ড়ধঃং হিসেবে চাষাবাদ করা হতো। জানা যায় কলম্বাস যখন আটলান্টিক থেকে ইউরোপ পর্যন্ত  ভুট্টাকে(তবধ সধুং) প্রধান ফসল হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেন তখন এদিকে রেড ইন্ডিয়ার প্রধান ফসলি দানা শষ্য ছিলো এটি। তার পর থেকেই একে ইন্ডিয়ান কর্ন বলা শুরু হয়। 

রফতানির লক্ষ্যে ‘ভুট্টা হাব’
দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখায় অবদান রাখছে ভুট্টা। কৃষি খাতের জিডিপি গণনায় বিবেচিত ১২৮টি ফসলের মধ্যে আগে প্রধান শস্য হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হতো গম, পাট, আলু, আউশ, আমন ও বোরো ধানকে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুট্টা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত এক দশকে দেশে ভুট্টার আবাদি এলাকা, উৎপাদন ও হেক্টরপ্রতি ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দানাদার খাদ্যশস্যের মধ্যে হেক্টরপ্রতি ফলনের দিক থেকে ভুট্টার স্থান প্রথম সারিতেই। যদিও আবাদি এলাকা ও মোট উৎপাদনের দিক থেকে এটি এখনও ধান এবং গমের পরে রয়েছে। রফতানির জন্য ভুট্টা চাষকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। 

আর উত্তরবঙ্গকেই এ ফসল আবাদের আদর্শ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কুড়িগ্রাম জেলাকে ভুট্টা চাষের একটি ‘হাব’ (কেন্দ্রস্থল) হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পর্যায়ক্রমে তা রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলায়ও সম্প্রসারণ করা হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। দ্রæতই এ বিষয়ে পরিকল্পনা ঠিক করতে পরিকল্পনা কমিশনের একটি প্রতিনিধি দলের কুড়িগ্রাম সফরের কথা রয়েছে। 

ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন প্রচারনা

সুপারফুড ভুট্টা মস্তিষ্কে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে
ধানের আবাদের চেয়ে ভুট্টার আবাদ অনেক লাভজনক হওয়ায় অনেকেই এ ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হলেও ৩৫ থেকে ৪০ মণ পর্যন্ত ভুট্টা উৎপাদন সম্ভব। ভুট্টার শুকনো গাছ ও ভুট্টা মাড়াইয়ের পর তা জ্বালানি হিসেবে বাজারে বিক্রি করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়।  তবে খাদ্য হিসেবে ভুট্টার উপযোগিতা সম্পর্কে প্রচারণা না থাকায় মানুষের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকায় এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি। ভুট্টা পুড়িয়ে খই ছাড়া এর ব্যবহার তেমন নেই। যদিও দেশে উৎপাদিত অধিকাংশ ভুট্টা পোল্টি ও গোখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

এ বিষয়ে কৃষিবিদ উর্মি আহসান বলেন, ‘ভুট্টা থেকে তৈরি হতে পারে রুটি, খিচুড়ি, ফিরনি ও নাড়সহ নানা পুষ্টিকর খাবার। মজাদার চাইনিজ খাবার তৈরিতে অপরিহার্য যে কর্নফ্লাওয়ার ব্যবহৃত হয় তা ভুট্টারই অবদান। কচি অবস্থায় ভুট্টা সুপেও ব্যবহার করা যায়। তবে এর জনপ্রিয়তায় ব্যাপক প্রচারনা প্রয়োজন আছে’। আমরাও মনে করি এখন এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণসহ বিদেশে রফতানীর  ক্ষেত্র তৈরী করতে হবে। 


======

জীবন ধারাই বদলে দিয়েছে হাইব্রিড ভুট্টার চাষ 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া | বিশ্ববিদ্যালয় নিউজ

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

দেশের ভুট্টা চাষের ইতিহাসটাই যেন পাল্টে যাচ্ছে দিন দিন। মাঠে ভুট্টা গাছ আর এর দানাসমৃদ্ধ হলদে মোচার দাপট দেখলে কে বলবে যে, সুদূর মেক্সিকোতে এর জন্মস্থান। এ দেশের জল-হাওয়া-মৃত্তিকায় চমৎকার মানিয়ে নিয়েছে ভুট্টা। গত এক দশকে হাইব্রিড ভুট্টার আবাদি এলাকা, উৎপাদন ও হেক্টর প্রতি ফলন উল্লেখযোগ্য রকমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হেক্টর প্রতি ফলনের দিক থেকে ভুট্টার স্থান দানাশস্যগুলোর মধ্যে প্রথম, কিন্তু আবাদি এলাকা ও মোট উৎপাদনের দিক থেকে এটি ধান ও গমের পর এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছে।  

ভুট্টা হলো আমাদের দেশের একমাত্র ফসল যার প্রতিটি জাতই এখন হাইব্রিড। অর্থাৎ এ দেশের মাঠে ভুট্টার এখন শতকরা একশত ভাগই হাইব্রিড ভুট্টা জাতের আবাদ করা হচ্ছে। হাইব্রিড ফসল নিয়ে নাক সিটকানোর দিন শেষ হয়েছে। ভুট্টা ছাড়াও বহু সবজি ফসলে এখন হাইব্রিড জাতের বীজই উৎপাদনের অন্যতম ভরসা। ভুট্টার ক্ষেত্রে হাইব্রিড জাতগুলো এতটাই সফল যে, দেশের কোন কোন এলাকার মানুষের কাছে হাইব্রিড ভুট্টা মহা আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকার মানুষের জীবন ধারাই বদলে দিয়েছে হাইব্রিড ভুট্টার চাষ।

 চরের ধূ ধূ বালুতে হাইব্রিড ভুট্টা কতটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। ভুট্টার চাষ এসব এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে এসেছে। এর ফলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ভুট্টার দানা ভুট্টার প্রধান আকর্ষণ বটে তবে পাশপাশি ভুট্টা থেকে আলাদা করা মোচা ও ভুট্টার গাছ চাষিরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন। 

নারী শ্রমিকেরাও এখানে ভুট্টা সংগ্রহ, মাড়াই, বাছাই ও শুকানোসহ নানা রকম কাজের সাথে জড়িত হয়েছে। ফলে নারীদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।  

হাইব্রিড ভুট্টার আবাদ যুক্তরাষ্ট্রে এক নবযুগের সূচনা করেছে। আমাদের ভুট্টা গবেষণা ভালোই এগিয়েছে। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করা হাইব্রিড জাতগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আমাদের গবেষণার কৌশল খানিকটা পাল্টাতে হবে। 

আমাদের বিজ্ঞানীদের সৃষ্ট হাইব্রিড ভুট্টা বীজ ব্যবহার বাড়লে ভুট্টা ফসল উৎপাদনের খরচও খানিকটা হ্রাস পাবে বলে হাইব্রিড ভুট্টা চাষ আরো লাভজনক হয়ে উঠবে। 
 
ক্যানসার প্রতিরোধক ‘লাল ভুট্টা’ উদ্ভাবন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর

সাধারণ ভুট্টার সঙ্গে জিনগত পরিবর্তন করে বিভিন্ন রং তৈরি করে এর জেনিটিক্যালি মডিফাইড করে ‘রঙিন ভুট্টা’ উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশি জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী।

ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টায় পুষ্টিমাণ অনেক বেশি। ভুট্টায় ক্যারোটিন থাকার কারণে মূলত এর রং হলুদ হয়। তাই আমি রঙিন ভুট্টার ক্লোন উদ্ভাবন করেছি। তাৎপর্যের বিষয় হলো, এই ভুট্টা ক্যানসার প্রতিরোধক।

বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন। এই গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি দেশে বরাবর আবাদ হয়ে আসা ভুট্টার জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে রঙিন ভুট্টার প্রজাতি উদ্ভাবন করেছেন। 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!