ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
চরফ্যাশনের চরমানিকা জালাল আহমেদ কলেজ

২৫ বছরেও এমপিও হয়নি কলেজ, নিজের খেয়েই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন শিক্ষকরা

মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন, ‎চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশিত: ১৫:১৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬
২৫ বছরেও এমপিও হয়নি কলেজ, নিজের খেয়েই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন শিক্ষকরা
চরফ্যাশনের চরমানিকা জালাল আহমেদ কলেজ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ভোলার সর্বদক্ষিণে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত উপকূলীয় জনপদ চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চরমানিকা ইউনিয়ন। এ অঞ্চলের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চরমানিকা জালাল আহমেদ কলেজ’। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার আড়াই দশক পার হলেও প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্যে জোটেনি এমপিওভুক্তি। ফলে সরকারি বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই নিজেদের শ্রম, অর্থ ও মেধা দিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীরা।

‎তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা নাজিমউদ্দিন আলমের পিতা জালাল আহমেদের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি একসময় ছিল এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভরসা। এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অনেক শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ বিচার বিভাগে, কেউ শিক্ষকতায়, আবার কেউ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। অথচ যাদের নিরলস প্রচেষ্টায় এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, সেই শিক্ষকরাই আজ দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
‎
‎প্রদীপ যেমন নিজে জ্বলে চারপাশ আলোকিত করে, চরমানিকা জালাল আহমেদ কলেজের শিক্ষকদের জীবন যেন তারই প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন তারা। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে অনেক শিক্ষক নিজেদের সঞ্চয়, ব্যক্তিগত উপার্জন এমনকি সংসারের সীমিত সামর্থ্য থেকেও অর্থ ব্যয় করেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা এবং এলাকার সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ই তাদের এই দীর্ঘ পথচলার প্রেরণা।
‎
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটি বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‎
‎দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষকের জীবনে নেমে এসেছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা। সংসারের ব্যয়ভার বহন, সন্তানদের লেখাপড়া এবং দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের অনেকেই পড়েছেন কঠিন সংকটে। তবুও প্রান্তিক জনপদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তারা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
‎
‎‎কলেজের প্রভাষক ইলিয়াস হোসেন বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে চাকরি করছি। কলেজটির মায়ায় পড়ে অন্য কোথাও যেতে পারিনি। উচ্চশিক্ষা শেষ করে জীবনের মূল্যবান সময় এই কলেজের পেছনে ব্যয় করেছি। বর্তমানে আমাদের আর্থিক সংকট ও অভাবের প্রভাব ব্যক্তিজীবন ও পরিবারেও পড়েছে। খুব দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছি।
‎
‎কলেজের তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হাফেজ আবু তাহের বলেন, নিজের ঘরের খাবার খেয়ে, নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কলেজে আসা-যাওয়া করি।
‎

‎সম্প্রতি ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কলেজটির পাঁচজন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ায় স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ফলাফলের এই হতাশাজনক চিত্র অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। তবে এর পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র। আর্থিক সংকট, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশের অভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতার ঘাটতি,সব মিলিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম।
‎
‎একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে টিকে আছে এবং শিক্ষকেরা কীভাবে নিজেদের শ্রম ও ত্যাগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও সময়ের দাবি।
‎
‎তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার আশার আলো দেখছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যের উদ্যোগে কলেজটির এমপিওভুক্তির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কলেজের জরাজীর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাবনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
‎
‎দীর্ঘ ২৫ বছরের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। শিক্ষক-কর্মচারীরা ফিরে পাবেন তাদের ন্যায্য প্রাপ্য, আর উপকূলীয় জনপদের শিক্ষার্থীরা পাবে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পরিবেশ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ভোলা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!