যমুনার চরে সবুজের সমারোহ, ঘাস বিক্রিতে চলছে হাজারো পরিবারের সংসার
যমুনা নদীর পানি কমে যাওয়ায় সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। বিস্তীর্ণ বালুচরে এখন চোখে পড়ে সবুজ ঘাস ও কাইশার সমারোহ। আর এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরেই জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন চরাঞ্চলের হাজারো দরিদ্র মানুষ।
কাজিপুর উপজেলার মাইজবাড়ী, খাসরাজবাড়ী, শুভগাছা, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুর নগর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘাস ও কাইশা সংগ্রহ এবং বেচাকেনার এমন চিত্র দেখা গেছে।
চরাঞ্চলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই গো-খাদ্যের সংকট থাকে। বর্ষায় যমুনার পানি বেড়ে নিচু এলাকার জমি ও বাড়ির আঙিনা তলিয়ে গেলে সংকট আরও তীব্র হয়। এ সময় গবাদিপশুর খাবারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চর থেকে সংগ্রহ করা ঘাস ও কাইশার বাজারও জমে ওঠে।
সরেজমিনে মেঘাই, ঢেকুরিয়া, কুমারিয়াবাড়ী, জর্জিরা, পানাগাড়ী, রঘুনাথপুর, গুলমোড় ও শুভগাছা এলাকায় দেখা গেছে, সকাল-বিকেল বসছে বিভিন্ন জাতের ঘাসের হাট। আশপাশের এলাকার ক্রেতারা এসব বাজারে এসে গরু-ছাগলের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস কিনছেন। নেপিয়ার, দুর্বাঘাস, গর্বাঘাস, কাঁঠালপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের গো-খাদ্য বিক্রি হচ্ছে এসব হাটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যমুনার তীরের এসব জায়গা একসময় টাটকা মাছের বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। নদীর চর জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেক বাজারই ঘাসের হাট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বাজারে প্রতি আঁটি ঘাসের দাম নির্ধারিত হচ্ছে ধরন ও মানভেদে। এক আঁটি কাঁঠালপাতা ২০ থেকে ৩০ টাকা, দুর্বাঘাস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, গর্বাঘাস ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং নেপিয়ার ঘাস ৩০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা দরদাম করে প্রয়োজন অনুযায়ী ঘাস কিনছেন।
যমুনার তীরের ঢেকুরিয়া হাটে ঘাস ও কাইশা বিক্রি করতে আসা নতুন মাইজবাড়ী চর এলাকার আজিবার হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে ঘাস বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। শরৎকালে চরাঞ্চলে কাজের সুযোগ কম থাকে। তাই এ সময়ে ঘাস বিক্রি করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। এই আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালান।
মেঘাই বাজারের ঘাস বিক্রেতা আনিছুর রহমান বলেন, তারা দরিদ্র মানুষ। কাজ না থাকায় ঘাস ও মাছ বিক্রির আয়েই সংসার চলে। একই অর্থে সন্তানদের পড়াশোনার খরচও চালাতে হয়। সকালে বাজারে এসে ঘাস বিক্রি করতে পারলে নৌকার খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়।
ঘাসের ক্রেতা আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় কয়েকজন জানান, তাদের প্রত্যেকের চার থেকে সাতটি পর্যন্ত গবাদিপশু রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে গো-খাদ্যের সংকট বেশি থাকায় চরাঞ্চলের ঘাসই তাদের অন্যতম ভরসা। এ কারণে তারা নিয়মিত এসব বাজার থেকে ঘাস কিনে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যমুনার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন বেশ কষ্টের। নদীতীরবর্তী এলাকার গবাদিপশুর খাবারের চাহিদা মেটাতেই মূলত এসব ঘাসের বাজার গড়ে উঠেছে। বাজারগুলোকে ঘিরে চরাঞ্চলের অনেক পরিবার জীবিকার সুযোগ পেয়েছে।
কাজিপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দিদারুল আহসান বলেন, চরাঞ্চলের অনেক পরিবার চর থেকে বিভিন্ন জাতের কাঁচা ঘাস ও কাইশা সংগ্রহ করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করেন। এতে তাদের সংসার চলে এবং গবাদিপশুর খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হয়। পাশাপাশি প্রায় শতাধিক খামারি বাণিজ্যিকভাবে ঘাস চাষ করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত ঘাস বিক্রি করছেন।
ক্যাপশন: যমুনার চর থেকে ঘাস সংগ্রহ করে কাজিপুরের বিভিন্ন হাটে বিক্রি করছেন স্থানীয়রা।