তাড়াশে গুদামে হাজার বস্তা সার, কৃষকের কাছে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে রোপা আমন মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারদের বিরুদ্ধে। সরকারি নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে কৃষকেরা যখন বিপাকে, তখন বেশি দাম দিলেই ডিলারদের গুদাম থেকে সার মিলছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, কয়েকজন ডিলার পরস্পর যোগসাজশে বাজারে সারের সংকট তৈরি করেছেন। এরপর সেই সুযোগে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর রোপা আমন, বোরো ও সরিষা মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলেও অভিযোগ কৃষকদের।
বারুহাস ইউনিয়নের পেঙ্গুয়ারি গ্রামের কৃষক বেলাত মণ্ডল এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, সরকারি দামে কোনো সার পাননি। বাধ্য হয়ে টিএসপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৮৮০ টাকা, ইউরিয়া ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং পটাশ ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। এতে সাধারণ কৃষকের বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে।
.png)
আসানবাড়ি গ্রামের কৃষক মো. মাসুদ মণ্ডল বলেন, ৪০ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। কিন্তু সারের সংকট ও বাড়তি দামের কারণে এখনো কোনো জমিতে সার দিতে পারেননি।
একই গ্রামের কৃষক ছানা উল্লাহ ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা টিএসপি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। সার কোথা থেকে কিনেছেন এবং ডিলারের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাম প্রকাশ করলে পরবর্তী সময়ে বাড়তি দামেও সার দেওয়া হবে না বলে আশঙ্কা করছেন।
খানপাড়া এলাকার কৃষক আবু তালেব খান বলেন, ১০০ বিঘার বেশি জমিতে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে ডিলারদের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন তিনি।
গুদামে প্রায় হাজার বস্তা সার
সার সংকটের অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে উপজেলার বিনসাড়া বাজারে গিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অনুমোদিত ডিলার মেসার্স তানভীর এন্টারপ্রাইজের গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুত দেখা যায়। সেখানে প্রায় এক হাজার বস্তা সার ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে বাড়তি দামে সার বিক্রির কারণ জানতে চাইলে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুল ওয়াহাবের ছেলে জাহিদ হাসান।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তাড়াশে ১ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং পটাশ ১ হাজার টাকায় বিক্রি করার কথা।
তাড়াশ উপজেলায় বিসিআইসির ১২ জন, বিএডিপির ১৭ জন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৭২ জন সাব-ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহের নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া খোলাবাজারে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) তাড়াশ উপজেলা শাখার সভাপতি মো. আমিরুজ্জামান বলেন, কোনো ডিলারের গুদামে সার থাকলে তা সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে হবে। সংকট দেখিয়ে সার গুদামজাত করা এবং বাড়তি দামে বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক রাজু বলেন, অবৈধভাবে সার মজুত করা গুদামে দ্রুত অভিযান চালানো প্রয়োজন। মজুত সার উদ্ধার করে ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের পাশাপাশি জড়িত ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, অবৈধভাবে সার মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) ও তাড়াশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সরেজমিন তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।