ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

২৫ বছরেও অক্ষত কুষ্টিয়ার নুরুজ্জামানের লাশ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:০২, ২৭ জুলাই ২০২০
২৫ বছরেও অক্ষত কুষ্টিয়ার নুরুজ্জামানের লাশ
ছবি: নুরুজ্জামানের অক্ষত মৃতদেহ

মানুষ মরে গেলে পচে যায়—সমাজে প্রচলিত এ কথা বিজ্ঞানীরাও মানেন। তবে সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় এক ঘটনা ঘটেছে যা জানলে আপনার চোখ কপালে উঠবে! ২৫ বছর পর এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; তাও আবার অক্ষত। পচন ধরেনি মরদেহে, ঠিক যেন সদ্য কবর দেয়া হয়েছে! এমনই এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হলো এলাকাবাসী।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়নের বহলবাড়িয়ায় ঘটনাটি ঘটেছে। গত শুক্রবার বাড়ি করার জন্য মাটি কাটতে গিয়ে কবরস্থ লাশটি বেরিয়ে আসে। জানা যায়, ২৫ বছর আগে স্থানটিতে কবর দেয়া হয়।

জানা যায়, ২৫ বছর আগে মারা যায় মনোহর মিস্ত্রির ছেলে নুরুজ্জামান। তারই অক্ষত মৃতদেহ তুলে পুনরায় কবরস্থ করা হলো। দুই যুগেরও বেশি সময় পুরোনো মৃতদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা ওই এলাকায় ভিড় জমায়।

কবর খুঁড়ে লাশ বের করা হয়মৃত নুরুজ্জামান ছিলেন সাত ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। তার বয়স ছিল তখন ২৩ বা ২৪ এর কোঠায়। এই মিরাকল ঘটনার পর নুরুজ্জামানের ছোট ভাই শাহনুর ডেইলি বাংলাদেশকে জানান এই ঘটনার পেছনের রহস্য। নুরুজ্জামান কীভাবে মারা যায় এবং এতো বছর পর তার লাশ উদ্ধারের আদ্যেপান্ত জানিয়েছেন তিনি।

নুরুজ্জামান মারা যাওয়ার বিষয়ে তার ভাই জানান, দীর্ঘ ২৫ বছর আগে তিনি দুই বছর পর ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। ঢাকায় গার্মেন্টসকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার কারণে তিনি এলাকার বদলে যাওয়া রাস্তাঘাট দেখে বেশ অবাক হয়ে যান। কুমারখালী দিয়ে বয়ে যাওয়া গড়াই নদী পাড় হয়েই তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। 

এরপর নুরুজ্জামান নদীর ঘাট পাড় হয়ে ভ্যানে চড়েন। তবে তার চেনা পরিচিত মাটির রাস্তায় তখন ঢেলে বসানো হয়েছিল ইট। রাস্তা দেখে অবাক হয়েই নুরুজ্জামান ভ্যানচালককে বলেন, বাহ এলাকার তো বেশ পরিবর্তন হয়েছে! আর তখনই ভ্যানচালক জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি এলাকায় নতুন এসেছেন? তখন নুরুজ্জামান জানান, দীর্ঘ দুই বছর পর তিনি নিজ বাড়িতে ফিরছেন। 

মৃতের ছোট ভাইতখনো সবকিছু ঠিক ছিল। ভ্যান চলছে। নিজ গ্রামে ফেরার আনন্দে আত্মহারা নুরুজ্জামানের সঙ্গে ছিল তখন ১০ হাজার টাকা ও মায়ের জন্য কেনা একটি সোনার চেইন। যদুবয়রা ইউনিয়নের কাছে এসেই হঠাৎ ভ্যানের চেইন ঠিক করার জন্য ভ্যানচালক থেমে যান। আর তখনই পেছন থেকে কয়েকজন এগিয়ে এসে নুরুজ্জামানের মুখ আটকে পাশের পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যায়। 

নুরুজ্জামানকে জোর করে খাওয়ানো হয় বিষাক্ত (রঙের সঙ্গে মেশানো হয়) কেমিকেল। অত্যন্ত বিষাক্তকর এই কেমিক্যাল খাওয়ানোর পর ছিনতাইকারী ভ্যানচালকের দল নুরুজ্জামানের কাছে থাকা টাকা ও গয়না নিয়ে পালিয়ে যায়। নুরুজ্জামানের নিথর দেহ পরদিন সকালে আবিষ্কার করে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে তার পরিবারের লোকজন উদ্ধার করে নুরুজ্জামানকে।  

তাৎক্ষণিক তাকে কুমারখালী উপজেলা কমপ্লেক্স হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে। তখনো মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন নুরুজ্জামান। এরপর সেখান থেকে রাজশাহী হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য নুরুজ্জামানকে পাঠানো হয়। তবুও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নুরুজ্জামানের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে পঁচিয়ে ফেলেছিল।

এই কবরেই দীর্ঘ ২৫ বছর শুয়ে ছিলেন মৃত নুরুজ্জামানদীর্ঘ তিন মাস নুরুজ্জামানকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু লড়াই করে বাঁচতে পারেননি তিনি। মৃত্যুবরণ করেন নুরুজ্জামান। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন করা হয়। পুলিশ এই ঘটনার তদন্তের পর গ্রেফতার করে অপরাধীদের। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর।

কবর সরানোর পরিকল্পনা ও মিরাকল  

নুরুজ্জামানের বড় ভাইয়েরা দীর্ঘ ছয় মাস ধরে পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের ভাইয়ের কবরটি সরানোর জন্য। কারণ নুরুজ্জামানের কবরের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছিল একটি গরুর খামার। আর তার পাশেই আরেকটি বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এসব দেখে নুরুজ্জামানের ভাইয়েরা ভাবেন, নুরুজ্জামানের লাশটি তুলে অন্য জায়গায় কবর দেবেন। এজন্যই শুক্রবার তারা এই কাজটি করার উদ্দেশ্যে কবর খুঁড়তে থাকেন। আর তখনই বেরিয়ে আসে নুরুজ্জামানের অক্ষত লাশ।

নুরুজ্জামানের ভাই শাহনুর ইসলাম আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, আমি ছোট থাকতেই ভাই মারা গিয়েছেন। নিজের হাতে ভাইয়ের অক্ষত শরীর আমি কবর থেকে তুলেছি। এলাকার হুজুরের নিষেধে মুখটা খুলে দেখতে পারিনি। আমি এবং আমার ভাইয়েরা মিলে মরদেহ উপরে তুলেছি। স্বাভাবিক মানুষের মতোই ওজন ছিল। কোনো কটূ গন্ধ পাইনি আমরা। সবাই দেখে বলেছেন, মরদেহটি এখনো ভালো রয়েছে, পচেনি। এরপর মরদেহটি উঠিয়ে পুনরায় খাটিয়ায় তুলে ভালো কাপড়ে ঢেকে ভাইকে কবরস্থানে রেখে এসেছি। 

নতুন কাফনের কাপড়ে ঢেকে আবারো কবর দেয়া হয় লাশকেদীর্ঘ ২৫ বছর নুরুজ্জামানের পরিবার তাকে ভুলেই গিয়েছিল। তবে গর্ভধারিনী মায়ের অশ্রু এখনো থামেনি। ২৫ বছর আগে থেকে নুরুজ্জামানের মা শোকাগ্রস্থ হয়ে পাগলপ্রায়। এই ঘটনার পর নিজের ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন মমতাময়ী মা। তবে তা আর সম্ভব হয়নি। সবাই তাকে আশ্বস্ত করেছেন, তার ছেলে পরকালে সুখেই আছেন।   

প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার সত্যতা যাচাই করে জানান, সত্যিই এক ভিন্নধর্মী ঘটনা এটি। যা সচরাচর দেখা যায় না। উদ্ধারের পর লাশটিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় বহলবাড়িয়া কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

চৌরঙ্গী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক রাকিব হাসান ঘটনার সত্যতা যাচাই করেন। তিনি জানান, ২৫ বছরের পুরোনো নুরুজ্জামান নামের এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুনরায় দাফন করেছে স্থানীয়রা। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!