ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যা, তদন্তে উঠে আসছে নতুন তথ্য

কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৫৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬
স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যা, তদন্তে উঠে আসছে নতুন তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। কক্সবাজারে অবস্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় এবং বাড়ি ফেরার পথের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে ‘রাজুর স্ত্রী তানজু আক্তার’ পরিচয়ে উঠেছিল তাজমিন। হোটেলের রেজিস্টারে তার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়। সেখানে এক রাত অবস্থানের পর বাড়ি ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড থেকে অটোরিকশায় ওঠে সে। পরে চালক সুমনের বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে।

হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে কলাতলীর একটি তিনতলা আবাসিক হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেয় তাজমিন। হোটেলের নথিতে রাজুর ঠিকানা বান্দরবানের লামা এবং বাবার নাম মনির আহমদ উল্লেখ করা হয়। হোটেলের এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, রেজিস্টারে রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা ছিল। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান এবং রিলসের মাধ্যমে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়েছিল ১৭ দিন আগে। তবে অন্য একটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিচয়ের সময়কাল প্রায় পাঁচ মাস।

রাজু প্রায় তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগের পর তার জন্য ৯০০ টাকা দিয়ে বাসের টিকিট কেটে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের খবর জানার পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বর্তমানে তিনি হোটেল থেকে ছুটি নিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

বাসা ছাড়ার পর কক্সবাজারে

তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর সে বাসা ছেড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায়। সেখান থেকে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠানো হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরের কাউন্টার প্রতিনিধি আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের টিকিট সংগ্রহ করে। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।

রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, কুমিল্লায় ফেরার পর অটোরিকশায় থাকা অবস্থায়ও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। কথোপকথনে চালকের বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে তিনি জানান। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যার অভিযোগ

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। পরে শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সুমন মিয়ার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে সে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন তাকে গন্তব্যে না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মেয়ের খোঁজে উদ্বিগ্ন ছিলেন মা

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে শুধু এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানায়। মা তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও সে কার কাছে আছে, তা স্পষ্ট করেনি।

তাজমিনের গৃহশিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। রাগারাগি হলে প্রায়ই একা বাসা থেকে বেরিয়ে যেত। তবে মা অসুস্থ থাকলে যমজ দুই ছোট ভাইয়ের যত্ন নিত সে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অধিকতর তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: কুমিল্লা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!