সুন্দরী নারীর ছবি দিয়ে ফাঁদ, ৩৪ লাখ টাকা খোয়ালেন অব. কর্মকর্তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি, প্রেমের সম্পর্ক ও লোভনীয় প্রস্তাবের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক একটি সাইবার প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের দাবি, কম্বোডিয়াভিত্তিক এই চক্র রাজধানীর এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ (২৭), আবুল হাসান ওরফে নাসিম (২৪) ও সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা (২৪)। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
.png)
পিবিআই জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চক্রটির মূল নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া প্রোফাইল খুলে পুরুষদের কাছে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানো হতো। অনুরোধ গ্রহণের পর নির্দিষ্ট চ্যাটিং স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে কয়েক দিন ধরে কথোপকথনের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা হতো।
সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ, ফোনকল এবং প্রয়োজনে ভিডিও কলে নারীদের উপস্থিত করা হতো। এরপর অনলাইনে লাভজনক ব্যবসা বা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো বলে পিবিআই জানিয়েছে।
যেভাবে ফাঁদে পড়েন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এন সায়েম উদ্দিন আহমেদ (৬২) এই প্রতারণার শিকার হন বলে পিবিআই জানায়। চক্রটি নিজেদের ‘AIRPAZ WORKING GROUP’-এর প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে তাঁকে কম দামে বিমানের টিকিট কিনে অনলাইনে স্টার রেটিং দেওয়ার পর বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে লাভের প্রস্তাব দেয়।
শুরুতে ভুয়া লাভ দেখিয়ে তাঁর বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে টাকা তুলতে গেলে সিকিউরিটি মানি, ভিআইপি চ্যানেল ফি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কেওয়াইসি (KYC) ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে বিভিন্ন ধাপে অর্থ দাবি করা হয়। একপর্যায়ে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে মোট ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
কমিশনভিত্তিক নেটওয়ার্ক
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মেহেদী হাসান সোহাগ আগে কম্বোডিয়ায় ছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে বাংলাদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেশে থাকা সহযোগীদের নির্দিষ্ট টার্গেট দেওয়া হতো এবং মাসিক বেতন নির্ধারণ করা থাকত। টার্গেট পূরণ না হলে বেতন কেটে নেওয়া হতো। আবার বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতে পারলে দেওয়া হতো অতিরিক্ত কমিশন।
পিবিআই জানায়, কম্বোডিয়ায় থাকা অবস্থায় সোহাগের সঙ্গে সুমাইয়া খাতুনের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে সুমাইয়ার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতারণার অর্থ লেনদেন ও নগদায়ন করা হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাহমুদুল হাসান জানান, প্রযুক্তির আড়ালে থাকা চক্রটির নির্দিষ্ট কোনো মোবাইল নম্বর ছিল না। প্রায় তিন মাস তদন্তের পর সুমাইয়ার সূত্র ধরে খুলনার সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, আড়ংঘাটা ও হরিণটানা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই সোহাগ ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে আসামিদের কাছ থেকে ব্যাংকের ডেবিট কার্ড, লেনদেনের হিসাবপত্র, ভুয়া টেলিগ্রাম গ্রুপের স্ক্রিনশট, পাসপোর্ট এবং মোবাইল ফোনের কথোপকথনের অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই জানিয়েছে, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে অনলাইনে পরিচিত কারও দেওয়া বিনিয়োগ, ব্যবসা বা দ্রুত লাভের প্রস্তাবে অর্থ পাঠানোর আগে যথাযথভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।