Alexa নদীর গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৬ ১৪২৬,   ২২ সফর ১৪৪১

Akash

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ লেখা

নদীর গল্প

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৪৪ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৩৫ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

ছবি: জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

“অন্য কিছুই চাইনে, এ গাঁয়ের বনঝোপ, নদী, মাঠ বাঁশবনের ছায়ায় অবোধ, উদগ্রীব, স্বপ্নময় আমার সেই যে দশ বছর বয়সের শৈশবটি – তাকে আর একটিবার ফিরিয়ে দেবে দেবী?” – অপরাজিত (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

ছোটবেলায় আমাদের বাড়ি থেকে মাইল খানেক উত্তরে একটা নদী ছিল। আমাদের গ্রামের সামনের প্রান্তর অতিক্রম করে ঝাড়কাটা গ্রাম ঘেষে এই নদী প্রবাহিত হতো। নদীটার নাম ছিলো ঝাড়কাটা নদী। গ্রামের নামে নদীর নাম। আমার জানামতে এই নদীর জন্ম ১৯৪৫ সনের দিকে। প্রমত্ত যমুনার খামখেয়ালির কারণে।
 
ছিল বলছি এ কারণে যে, এখন তাকে আর কোনক্রমেই নদী বলা যায় না। বলা যেতে পারে নদীর শব। অথচ এই নদীরই প্রলয়ঙ্করী রূপ ছিল একদিন! এর জলঘুর্নিতে হাবুডুবু খেতে খেতে আমাদের জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানার অগুনতি গ্রাম বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। 

আমি অবশ্য নদীর এই যৌবনবতী রূপকে দেখিনি। দেখেছি এর পড়ন্ত বেলা। নদীটার নিজের কোন নাম ছিল না। যেমন থাকে সকল নদীর। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলি, ধলেশ্বরী, মাতামুহরি ইত্যাদি। এর আত্ম পরিচয় এতোই ক্ষীণ ছিল যে ঝাড়কাটা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হবার সময়ে গ্রামেরই নামই ধারণ করেছিলো। 

শুধুমাত্র বানের জল এলেই ডানা মেলত এই নদী। আষাঢ় শ্রাবণে বন্যার জল ফুলে ফেঁপে উঠত। শুধুমাত্র তখনই নদীটা বিস্তীর্ণ জমি, নিম্নভুমি, এমনকি ক্ষেতের আইলগুলোকেও নদীর অংশ বানিয়ে ফেলত। অন্য সময়ে এই নদী ছিল আমাদের নিবিড় বন্ধুর মতন। আমরা কখনই একে ভয় পেতাম না। এই নদীতে লাফ-ঝাঁপ দিতে দিতেই আমরা ডাঙর হয়েছিলাম। এর জলে সাঁতার কেটে, শুশুকের মতন ডুবসাঁতার দিয়ে, পায়ের আঙুলে ঘা ধরিয়ে আমি দ্রুত উন্নীত হয়েছিলাম শৈশব থেকে কৈশোরে। 

আমাদের শৈশবকাল। মনে আছে বানের প্রথম ঘোলা জলকে এই নদী থেকে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত আনতে আমরা শিশুরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম। বর্ষাকাল আগমন করলে অবিরল বারিধারা এবং উত্তর থেকে আসা জলের তোড়ে এই নদী ফুলে উঠতো। অতঃপর একদিন সকালে সকল শিশুরা মিলে চলে যেতাম নদীর পাড়ে।

আমাদের প্রতীক্ষার সমান্তরালে নদীর জল ফুলতে থাকতো। দুপুরের সুর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার পূর্বেই ঢুকে পড়ত শুকনো দূর্বাঘাসে ছাওয়া খালের মেঝেতে। এই খাল ঝাড়কাটা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে একটা বিশাল প্রান্তর অতিক্রম করে আমাদের গ্রামের পগারগুলোর সাথে মিলেছিল। অতঃপর আমাদের গ্রাম অতিক্রম করে দক্ষিণের একটা নিম্নভূমিতে যেয়ে শেষ হয়েছিলো। 

নদীর জল ইঞ্চি ইঞ্চি করে দূর্বা ঘাসের নিচ দিয়ে এগিয়ে আসতে থাকতো আমাদের গ্রামের দিকে। জলের এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে আমরাও নদীর দিকে মুখ রেখেই পিছাতে থাকতাম। অবশেষে গোধূলির কনে দেখা আলোতে স্বাগত জানাতাম নদীকে আমাদের বাড়ির উত্তরদিকের বাঁশবনের নিবিড় ছায়ায়। এক সময়ে এই জল বাড়তে বাড়তে আমাদের বাড়ির উঠোনের ওপরে চলে আসতো। সামনের জলজ প্রান্তরের ভেতর থেকে তখন আমাদের গ্রামটাকে মনে হতো দ্বীপ। অন্য কোন পৃথিবীর অংশ। 

ছোটবেলায় একবার আমি আর দাদা নৌকায় করে নদীর পাড়ে গিয়েছি জমির ফসল দেখতে। দাদা আমাকে নৌকার ভেতরে বসিয়ে রেখে জমিতে নেমেছেন। এমন সময়ে এক ঝাঁক রুপালী মাছ লাফিয়ে ডিঙি নৌকার ভেতরে উঠল। আমি কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরি! এক সময়ে আমার সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে সবগুলো মাছই লাফিয়ে পুনরায় নদীতে ফিরে গেল। জীবনের স্বপ্নগুলোর মতো। হাতের নাগালের ভেতরে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। 

বর্ষাকালে ছইয়ের নৌকায় করে পুরো পরিবার নানা বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। কখনো বৈঠা বেয়ে। কখনো লগি দিয়ে ঠেলে। কখনো পাল তুলে। কখনো বা জলের ভেতরে গ্রামের লম্বা রাস্তা দিয়ে গুন টেনে। নদীর পাশের গ্রামের দৃশ্যাবলী তখন আমাদের চোখে মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দিত। ঘুঘুমারী, মহিষবাথান, মাথাভাঙা, আম্লিতলা, গুনারীতলা, জোরখালী, তাত্তাপাড়া হয়ে খরকা বিলে পেরিয়ে সুখনগরী। নিবিড় সব গ্রাম। সবগুলোকে দেখতে দ্বীপের মতো লাগতো। 

নদীর বিস্তার তখন বিশাল। যমুনার মতোই। দিগন্তের কাছে জলের ভেতর থেকে শুশুকেরা একটু পর পর ডিগবাজী দিত। শুধুমাত্রই আমরা যারা শিশু তাদেরকে আনন্দ দেবার জন্য। নৌকার চারপাশে ভাসত নানা বর্ণের বাদাম তোলা নৌকা। পানসি নৌকা, ডিঙি নৌকা, গয়না নৌকা। দেখে মনে হত নদীতে রঙের মেলা বসেছে। 

নদীটা আসলেই আমার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু প্রিয়, শান্তসমাহিত নদীকে আমরা নিজেরাই হত্যা করেছি। নদীর উজানের দিকে প্রস্থ বরাবর বাঁধ দিয়ে। নদীর স্থানে স্থানে বেদখল নিয়ে ঘরবাড়ি বানিয়ে বা মাছের ঘের বানিয়ে। এর নাব্যতা নষ্ট করে। আমাদের বাড়ির সামনে যে খালটাও এখন অস্তিত্ব বিহীন। কখন- কোন সময়ে যে তা ফসলের মাঠে রূপান্তরিত হয়ে গেছে আমরা নিজেরাই জানি না। 

আমাদের ভাটি এলাকায় এখন আর বানের জল আসে না। নদীতে এখন আর শুশুক ভাসে না। রূপালী মাছেরা লাফিয়ে লাফিয়ে নৌকোর ভেতরে উঠে না। শরৎকালে এই নদীতে এখন আর গাঙ কলা জন্মায় না। রঙ-বেরঙের পাল তোলা নৌকা চলে না। শিশুরা নদী থেকে বানের জলকে গ্রামে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে না।

নৌকা থেকে লাফিয়ে চলে যাওয়া রূপালি মাছের মত আমাদের নদীর স্বপ্নও হারিয়ে গেছে চিরতরে!

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ