ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

ভাঙ্গো NGO

চয়ন খায়রুল হাবিব
প্রকাশিত: ১১:৩৯, ৫ অক্টোবর ২০২৬
ভাঙ্গো NGO
বাংলার মানুষ, ইতিহাসের সন্তান, লাখো বছরে হবে না কাহিনীর অবসান। NGO-শৃঙ্খল ভেঙ্গে শুরু নিজেদের গল্প, আমরা অনেক, ভাঙ্গো কুঠিয়াল প্রকল্প

১
বাংলার ঘুমে যখন রাত নামে ধীরে,
সাগর পারায়ে এক ডাক আসে ফিরে,
“জাগো, দেখো, কে আসে তোমার ঘরে,”
স্বপ্নের ছন্দ নামে শহর-বন্দরে।

২
পথে দেখি NGO, মুখে তার হাসি,
পেছনে দাতা-ফাইল, সামনে উদাসী।
মিহি তার বুলি, চোখে অভিনয়ের ছাপ,
সাতটা হিসাবরক্ষক নেয় জমিনের মাপ।

Advertisement

৩
মোটাসোটা পেট ভরা অনুদানের ভাত,
ফাইলে ফাইলে জমে উন্নয়নের বরাত।
এক এক করে, দুই দুই করে,
স্বপ্নের সিল মারে রিপোর্টের ঘরে।

৪
এলো ভণ্ডামি, গায়ে সাদা পোশাক,
চোখে তার পানি, মুখে সুমধুর বাক।
কাঁদে সে খুব, ক্যামেরা যখন জ্বলে,
প্রতিটি অশ্রুপাতে তার বাজেট খোলে।

৫
শিশুরা ভাবে, “ওই কান্না বুঝি মুক্তি,”
হিসাবের খাতায় সেবা-গোলামির চুক্তি।
ছোট্ট হাত বাড়ায়, হতে চায় যোগ্য,
NGO দফাদার বলে, “আগে হও ভোগ্য।”

৬
ধর্মের নাম, মানবতার আলো,
ব্যানারে লেখা, “আমরা খুব ভালো।”
পেছনে ছায়া, সামনে পূর্বপুরষের খুলি,
সেবার পোশাকে ঘোরে নীলকরের ঝুলি।

৭
আরও কত মুখ, কত রঙের সাজ,
কেহ কনসালট্যান্ট, কেহ মানবাধিকার রাজ।
কেহ আইনজীবী, কেউ বিশেষজ্ঞ-দল,
কেহবা এম্পাওয়ারমেন্ট নামে নেয় কন্ট্রোল।

৮
শেষে এলো অরাজকতা, সাদা গাড়ি চড়ে,
লাল ধুলা উড়ে কামরাঙ্গির চরে।
ঠোঁট তার ফ্যাকাশে, চোখে শীতল আগুন,
মৌসুমের বেনামে কে ফোঁটায় প্লাস্টিক-প্রসূন?

৯
মাথায় তার মুকুট, হাতে যাদুর ছড়ি,
কপালে লেখা, “আমি সুব্যবস্থার ঘড়ি।”
কাগজে তার ক্ষমতা, সিল তার আইন,
বেকুব বনে যায়, গুপি গাইন, বাঘা বাইন।

১০
ঢাকার রাস্তা পেরোয় তার বহর,
বিলবোর্ডে কাঁপে নগরের অন্তর।
বলে টিকা কর্মসুচি, শুদ্ধতম পানি,
গার্মেন্টস রক্তের আয় করে রাহাজানি।

১১
চারপাশে বাহিনী ল্যাপটপ হাতে,
পাওয়ার পয়েন্ট ঝলকে ডাকিনের রাতে।
চার্ট, গ্রাফ, ইন্ডিকেটর, অদ্ভুত সব ঢেউ,
চোরের নতুন বেশে বেমালুম ফেউ।

১২
বড় বড় স্ক্রিন, বড় বড় সভা,
সুন্দরবনে কাতর হরিণা সন্তানসম্ভবা।
ডিসলেশনের বদলে সাস্টেইনেবিলিটি,
ধান ক্ষেতে খুটায় বাঁধা প্রকল্প ভিজিবিলিটি।

১৩
উপকূল থেকে পাহাড়, নদী থেকে বন্দর,
প্রকল্পের কাফেলা চলে নিরন্তর।
এক ফাইল নামে, আরেক ফাইল ওঠে,
কির্তনীয়া হারায় যশোর রোডের পথে।

১৪
মেহগনির ডালে ডালে যখন প্রশ্ন জাগে,
“কে নিলো আমাদের টাকা”, উগ্রচন্ড রাগে,
মাইকে তখন বাজে স্বাধীনতার গান,
শিকারির ডেটায় গড়ায় শিকারের প্রাণ।

১৫
তখন আসে ভাড়াটে ভাষার দঙ্গল,
“স্টেকহোল্ডার মিটিং”, সবই সফল।
বলে, “আমরা আছি মানুষের পাশে,”
অথচ মানুষ বেশে কুহক আশেপাশে।

১৬
কেউ বলে, “আমাদের ফান্ডিং শুকায়,
মেকাপের কৌটায়, “ গ্রান্টের ঝাল্মুড়ি ঝাঁকায়।”
খালি পকেট, ঠান্ডা কনফারেন্স রুম,
দাও নতুন বাজেট, দাও ভুয়া সাউন্ড-বুম।

১৭
তারপর সবাই আকাশে তাকায়ে কয়,
“উন্নয়ন, উন্নয়ন, খেলা ছাড়া কিছু নয়!”
কিন্তু মাটিতে যে মানুষ, তার কথা কে শোনে?
তার নামটা শুধু থাকে পরিসংখ্যানের কোণে।

১৮
অরাজকতা হাসে, হাসিটা বড় জ্ঞানী,
যেন তার পিএইচডি জমজমের পানি।
তার থিসিস, তার ঠান্ডা মাথার প্ল্যান,
বাংলাদেশীদের বানায়েছে ক্ষুদ্রঋণ-ম্যান।

১৯
সে জানে শহরের বড় বড় দালান,
কার নামে গ্রান্ট, কার হাতে কামান।
মুকুটে ঠিকরায় বরাদ্দের আলো,
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, লামা রিসোর্ট জমকালো।

২০
হঠাৎ ছুটে এলো এক মেয়ে, নাম আশা,
চোখে তার আগুন, মুখে বাংলা ভাষা।
দেখতে সে ক্লান্ত, প্রায় যেন হতাশ,
বুকের ভেতর তাবৎ NGO ভাঙ্গার বিশ্বাস।

২১
বলে, “আমার মা “সময়”, এক দম বুড়া,
যত বছর লাগুক, NGO করবো গুড়া।
নতুন দিনের আশায় দাঁড়ায়ে আছে চুপ,
হাতে তার কাঁপে বাংলার মানচিত্রের রূপ”

২২
সে বসে পড়ে রাস্তার মাঝখানে,
গাড়ির শব্দ বাজে কানে কানে।
ভাবলো, এইবার বুঝি সব শেষ,
একের পর এক মুখে জাগে বাংলাদেশ।

২৩
ঠিক তখনই তার সামনে আলো,
প্রথমে ক্ষীণ, তারপর জোরালো।
কুয়াশার মতো, নদীর ধারে ঘর,
দূর থেকে আসে নতুন এক স্বর।

২৪
মেঘ যেমন জমে আকাশের গায়ে,
তেমন সে বাড়ে বেঙ্গল টাইগারের হায়ে।
বজ্রের মতো প্রশ্ন ওঠে হঠাৎ,
“দেশ কি প্রকল্প, নাকি প্রাণের জলপ্রপাত?”

২৫
আজব এক অবয়ব, আলোতে ঢাকা,
চঞ্চল হলেও, চিন্তা তার পাকা।
ডানায় তার বৃষ্টির মুশল জ্যোতি,
চোখে তার দাবি “আমার হাতে গতি।”

২৬
মাথার উপরে ভোরের তারা,
অন্ধকার ভেদ করে বাজায় দোতারা।
লাল নয় রক্ত, নীল নতুন ঘোর,
ঘুমন্ত বিবেক জাগে, খোলে তিথিডোর।

২৭
বাতাসে এলানো নরম তার পা,
NGOদের পরায় মুক্তিযুদ্ধ্বের আংরাখা।।
কেউ তাকে ধরে না, কেউ তাকে দেখে না,
তার ছোঁয়ায় সহসা উথাল সব নদীর আয়না।

২৮
যেমন বৃষ্টিতে মাটি ভিজে উঠে,
যেমন রাতে তারা আকাশে ফুঁটে,
তেমন তার পদচিহ্ন যেখানে পড়ে,
নতুন শব্দ জন্ম নেয় বাঙালির ধড়ে।

২৯
রক্তমাখা রাস্তায় জনতা চেয়ে রয়,
আশা হাঁটে শান্ত, চোখে নাহি ভয়।
মৃত্যুর ঘোড়া ছুটে যায় দূর,
পেছনে পড়ে থাকে পুরোনো সুর।

৩০
বাংলার মানুষ, ইতিহাসের সন্তান,
লাখো বছরে হবে না কাহিনীর অবসান।
NGO-শৃঙ্খল ভেঙ্গে শুরু নিজেদের গল্প,
আমরা অনেক, ভাঙ্গো কুঠিয়াল প্রকল্প।

লেখক : চয়ন খায়রুল হাবিব, ৪/১০/২৬, ব্রিটানি, ফ্রান্স

প্রথম প্রকাশ : Julekha Syrup Metaverse.

Inspired by Percy Bysshe Shelley's poem "The Masque of Anarchy" written in 1819.
Photo : The Demolishers, Lithography by Paul Signac. 1896.

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!