ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
গল্প

কালো মেয়ে

আফছানা খানম অথৈ
প্রকাশিত: ১০:০৮, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কালো মেয়ে
শাহানাজ, তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তোমার ভালোবাসার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। চারপাশ নীরব। কবর নীরব। শুধু বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল এক অনুতপ্ত মানুষের কান্না।

শাহানাজ পারভীন বি.এ. পাস করেছে। দেখতে দেখতে বয়সও কম হলো না, অথচ এখনো তার বিয়ে হয়নি। কারণ একটাই—তার গায়ের রং শ্যামলা, যা পাত্রপক্ষের চোখে যেন এক বড় অপরাধ!  দু-একটি বিয়ের প্রস্তাব এলেও পাত্রপক্ষ মেয়েকে দেখার পর কিংবা গায়ের রঙের কথা জানার পর আর কোনো খবর দেয় না। কখনো কখনো তো এমনও হয়েছে, পাত্রপক্ষের কেউ সরাসরি বলে দিয়েছে,

—মেয়ে শিক্ষিত, গুণী—সবই ঠিক আছে। কিন্তু গায়ের রংটা একটু চাপা।
কথাটা শুনে শাহানাজের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠত। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করত,
—আমার অপরাধটা কী? আমি কি মানুষ নই? আমার কি ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নেই? শুধু গায়ের রংটাই কি একজন মানুষের সব পরিচয়?

মা-বাবার দুশ্চিন্তারও শেষ ছিল না। প্রতিদিন কোনো না কোনো আত্মীয়স্বজন এসে বলত,
—মেয়ের বয়স তো হচ্ছে। ভালো কোনো সম্বন্ধ এলে আর দেরি করবেন না।
শাহানাজের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন,
—সম্বন্ধ তো আসে, কিন্তু মেয়ের গায়ের রং শুনেই সবাই পিছিয়ে যায়। মেয়েটা যে কত ভালো, সেটা কেউ দেখতে চায় না।

Advertisement

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। অবশেষে একদিন শাহানাজের বিয়ে হলো জাফর ইকবাল নামের এক চাকরিজীবী যুবকের সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে গিয়ে সে নতুন সংসার শুরু করল। শ্বশুর সাইফুদ্দিন মোল্লা এবং শাশুড়ি প্রথম দেখাতেই তাকে আপন করে নিলেন। কিন্তু স্বামী জাফর ইকবাল যেন তাকে মন থেকেই মেনে নিতে পারল না।

কারণ জাফরের পছন্দ ছিল আধুনিক, সুন্দরী, সাজগোজে অভ্যস্ত নারী। অথচ শাহানাজ ছিল শান্ত, লাজুক, পর্দানশীন এবং ধর্মপরায়ণ। ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ত, কোরআন তিলাওয়াত করত। এরপর ঘরের কাজ শুরু করত। 

সবার জন্য নাশতা তৈরি করত, রান্নাবান্না করত, শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন নিত। কিছুদিনের মধ্যেই সে শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করে নিল।একদিন শাশুড়ি সাইফুদ্দিন সাহেবকে বললেন,
—আল্লাহ আমাদের ঘরে এমন একটা বউ দিয়েছেন, এটা আমাদের সৌভাগ্য। মেয়েটা শুধু দেখতে নয়, মন থেকেও সুন্দর।

সাইফুদ্দিন সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—রং দিয়ে মানুষ বিচার করা যায় না। মানুষের আসল সৌন্দর্য তার চরিত্রে।
কথাটা জাফরের কানে গেলেও তার মন বদলাল না। বরং একদিন শাহানাজকে ব্যঙ্গ করে বলল,
—এ যুগে এসব চলাফেরা কেউ পছন্দ করে না। সবাই মডার্ন মেয়ে চায়। তোমার এই ঘোমটার ভেতরের জীবন আমার একদম ভালো লাগে না।শাহানাজ শান্তভাবে বলল,
—সবাই কী পছন্দ করে, সেটা আমি জানি না। তবে আমি আমার বিশ্বাস অনুযায়ী চলতে চাই। ধর্মীয় বিধান মেনে চলা আমার কাছে সম্মানের বিষয়।জাফর বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুমি তোমার বিধি-বিধান নিয়ে থাকো। এসব আমার ভালো লাগে না।

শাহানাজ আর কোনো কথা বলল না। দিনের পর দিন জাফর তাকে গায়ের রং নিয়ে অপমান করতে লাগল।
—তোমাকে দেখলে আমার নিজেরই লজ্জা লাগে। তোমার মতো কালো মেয়েকে বিয়ে করে আমি ভুল করেছি। সুন্দরী একটা মেয়েকে বিয়ে করলে জীবনটা অন্যরকম হতো।

এমনকি রাগের মাথায় একদিন বলে ফেলল,
—তোমাকে আমি আর রাখতে চাই না। সুযোগ পেলেই তোমাকে ছেড়ে দেব।

প্রতিটি কথা শাহানাজের হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধত। কিন্তু সে প্রতিবাদ করত না। নীরবে চোখের জল ফেলত।
শ্বশুর-শাশুড়ি সবই বুঝতেন। কিন্তু ছেলের সংসার ভেঙে যাবে ভেবে তারা অনেক সময় চুপ করে থাকতেন। এর মধ্যেই শাহানাজ অন্তঃসত্ত্বা হলো।কিছুদিন পর তার কোলজুড়ে এলো ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান। 

সন্তানকে ঘিরে তার জীবনে যেন নতুন আলো ফুটল। সে ভাবল, হয়তো সন্তানকে দেখে জাফরের মন বদলাবে। কিন্তু মানুষের মন যদি অহংকারে অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ভালোবাসার আলোও সেখানে পৌঁছাতে পারে না।

জাফর ধীরে ধীরে অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। সেই নারীকে সে নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিল। মেয়েটিও তার কথায় বিশ্বাস করল। একসময় তাদের সম্পর্ক গভীর হলো এবং তারা বিয়েও করল।নতুন স্ত্রী দেখতে সুন্দরী ছিল, আধুনিক ছিল; কিন্তু তার ভালোবাসার পেছনে ছিল জাফরের টাকা, চাকরি ও সামাজিক অবস্থানের হিসাব। 

জাফর অবশ্য তা বুঝতে পারল না। সে নতুন স্ত্রীকে খুশি করতে গিয়ে একের পর এক দামি জিনিস কিনে দিতে লাগল। স্ত্রী যা চাইত, তাই দিত।
কিন্তু সে জানত না—যে ভালোবাসাকে সে সত্যি মনে করছে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে স্বার্থ। ধীরে ধীরে নতুন স্ত্রী তার টাকা-পয়সা আত্মসাৎ করতে শুরু করল।

অন্যদিকে শাহানাজ দিনের পর দিন স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল। একদিন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় দুপুরবেলা হঠাৎ মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেল সে।দাদি শাশুড়ি চিৎকার করে উঠলেন,
—বউমা! শাহানাজ! চোখ খোলো মা!
কোনো সাড়া নেই। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সাইফুদ্দিন সাহেবকে ডেকে বললেন,
—রোগী আপনার কী হয়?
—আমার পুত্রবধূ, ডাক্তার সাহেব।
—তার স্বামী কোথায়?
—শহরে চাকরি করে।

ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো সমস্যা আছে?
সাইফুদ্দিন সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
—জি, আছে। আমার ছেলে ওকে গায়ের রং নিয়ে অপছন্দ করে। অনেকদিন ধরে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে।

ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যা পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

—ডাক্তার সাহেব, এখন কী হবে?
—রোগীকে শুধু ওষুধ দিয়ে সুস্থ করা যাবে না। তার মানসিক শান্তি দরকার। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করুন। তাকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে হবে।

—আমার ছেলে যদি না আসে?
ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বললেন,
—তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আপনার ছেলেকে বোঝান—মানুষকে অবহেলা করে কেউ সুখী হতে পারে না।

ডাক্তারের কথা শুনে সাইফুদ্দিন সাহেব সোজা ছেলের কাছে ছুটে গেলেন।কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে তার বুক ভেঙে গেল।তার ছেলে অন্য এক নারীকে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেছে!তবুও তিনি ছেলের সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
—জাফর, তুই আমার সঙ্গে চল। তোর বউ  হাসপাতালে। খুব অসুস্থ।
জাফর বিরক্ত হয়ে বলল,
—বাবা, আমি যেতে পারব না। আমার অফিস আছে।
—অফিসের কাজ পরে হবে। মানুষের জীবন আগে।
—আমি বলেছি, আমি যাব না।

সাইফুদ্দিন সাহেব ছেলের হাত ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
—বাবা, এমন নির্দয় হোস না। শাহানাজ খুব ভালো মেয়ে। তোর বাবা-মায়ের সেবা করেছে, তোর সংসার আগলে রেখেছে। তার কী অপরাধ?
জাফর মুখ ফিরিয়ে বলল,
—বাবা, এসব কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে না।
—তুই কি শুধু তার গায়ের রংটাই দেখেছিস? তার চরিত্র দেখিসনি? তার ভালোবাসা দেখিসনি?
জাফর কঠিন স্বরে বলল,
—আমি আমার জীবন নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।
সাইফুদ্দিন সাহেব চোখ মুছে বললেন,
—জীবন নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার তোর আছে। কিন্তু অন্য একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট করার অধিকার তোর নেই।

জাফর চুপ করে রইল। বাবা আবার বললেন,
—শেষবার বলছি, তুই বউমার কাছে ফিরে চল। মেয়েটা তোকে এখনো স্বামী হিসেবেই ভালোবাসে।
জাফর বিরক্ত হয়ে বলল,
—বাবা, আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাই না। তুমি এখান থেকে চলে যাও।
সাইফুদ্দিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—একটা কথা মনে রাখিস, বাবা। আজ যে মানুষটার চোখের জল তুই দেখছিস না, কাল সেই চোখের জলই হয়তো তোকে সারাজীবন তাড়া করবে।

জাফর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
—সে যদি মরে যায়, তাতেই আমার মুক্তি।
বাবা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
—মনে রাখিস, একদিন এমন সময় আসতে পারে, যখন অনুশোচনা করারও সময় পাবি না। তখন চোখের জল ছাড়া তোর আর কিছুই থাকবে না।

এই কথা বলে তিনি ফিরে এলেন। বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে দেখেই শাহানাজের শাশুড়ি প্রশ্ন করলেন,
—জাফর আসেনি?
—না।
—বউমার অসুখের কথা বলনি?
—বলেছি। তবুও আসেনি।
—কেন?
সাইফুদ্দিন সাহেব আর কথাটা বলতে চাইছিলেন না।শাহানাজ পাশের ঘর থেকে সব শুনছিল। সে বলল,
—বাবা, থামলেন কেন? কী হয়েছে জাফরের?

সাইফুদ্দিন সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
—সে... সে অন্য একজনকে বিয়ে করেছে।
—কী বললেন?
শাহানাজের চোখ স্থির হয়ে গেল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ মা সত্যি।
শাহানাজ আর কোনো কথা বলল না। কয়েক সেকেন্ড পর ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তার ছোট্ট ছেলে মাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় দেখে কান্না শুরু করল।

—মা... মা...!
শিশুটির কান্না শুনে দাদি ছুটে এলেন।
—বউমা! শাহানাজ!
কোনো সাড়া নেই। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছুক্ষণ পর বললেন,
—দুঃখিত। হাসপাতালে আনার আগেই রোগীর স্ট্রোক হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
কথাটা শুনে শাহানাজের শ্বশুর-শাশুড়ি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।সাইফুদ্দিন সাহেব বুক চাপড়ে বলতে লাগলেন,
—বউমা, আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না মা! আমি আমার ছেলেকে বোঝাতে পারলাম না!

শাহানাজের নিষ্পাপ সন্তান তখনও মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল। ছহিহ্ সালামতে শাহানাজকে দাফন করা হলো।একজন ভালো স্ত্রী, একজন ভালো মা এবং একজন ভালো মানুষ নীরবে চলে গেল পৃথিবী থেকে।

এরপর সময় বদলে গেল। জাফর তার নতুন স্ত্রীকে খুশি করতে গিয়ে ধার-দেনায় ডুবে গেল। সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে অফিসের টাকা আত্মসাৎ করল।অবশেষে বিষয়টি ধরা পড়ল। তার বিরুদ্ধে মামলা হলো। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল।জাফর ভেবেছিল, তার স্ত্রী নিশ্চয়ই তার জন্য ছুটে আসবে। কিন্তু যাকে সে ভালোবাসা ভেবেছিল, সে ভালোবাসা ছিল অভিনয়। জাফর কারাগারে যাওয়ার পর তার স্ত্রী অন্য এক পুরুষের হাত ধরে পালিয়ে গেল। 

খবরটি জাফরের কানে পৌঁছালে সে যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে গেল।সে নিজের মনেই বলতে লাগল,
—যার জন্য আমি আমার সংসার ধ্বংস করলাম, সেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল!

তিন মাস পর জামিনে মুক্তি পেল জাফর। জেল থেকে বের হয়েই সে সোজা গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেল। কিন্তু এবার তার সামনে ছিল শুধু শূন্যতা।শাহানাজ নেই। তার ভালোবাসা নেই। তার যত্ন নেই।শুধু একটি কবর আছে।

জাফর কবরের পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
—শাহানাজ, আমি ভুল করেছি। ভয়াবহ ভুল করেছি।
—আমি হীরা পেয়েও কাঁচকে মূল্যবান ভেবেছিলাম। তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে, অথচ আমি তোমার ভালোবাসার মূল্য বুঝিনি।তোমার গায়ের রং নিয়ে তোমাকে অপমান করেছি। তোমাকে অবহেলা করেছি। তোমার চোখের জল দেখেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। সে কবরের মাটি আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আজ বুঝেছি, মানুষের সৌন্দর্য মুখে নয়, চরিত্রে। তোমার গায়ের রং নিয়ে আমি অহংকারের চোখে বিচার করেছিলাম। অথচ তুমি ছিলে একজন সৎ, গুণবতী ও দায়িত্বশীল মানুষ।

—আমি তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি, তুমি কতটা মূল্যবান ছিলে।শাহানাজ, আমাকে ক্ষমা করো। একবার শুধু ফিরে এসো। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চাই

কিন্তু কবর নীরব।জাফরের কান্নার কোনো উত্তর নেই।
ঠিক তখনই তার বাবা সাইফুদ্দিন সাহেব ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
—এখন কেঁদে কী লাভ, বাবা?
জাফর ফুঁপিয়ে বলল,
—বাবা, আমাকে আর কষ্ট দিও না। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি।
সাইফুদ্দিন সাহেব বললেন,
—আমি তোকে সেদিন বলেছিলাম, একদিন তোর চোখের জলই হবে তোর একমাত্র সম্বল। মনে আছে?

জাফর মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
—হ্যাঁ বাবা। তোমার প্রতিটি কথা আজ সত্যি হয়ে গেছে।
—তুই তখন বলেছিলি, শাহানাজ মরলে তুই বাঁচবি। বলেছিলি, তার মৃত্যুতে তোর মুক্তি হবে। আজ বল তো, সে নেই—তুই কি সত্যিই সুখী?

জাফর কোনো উত্তর দিতে পারল না।তার চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরতে লাগল।সাইফুদ্দিন সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,
—আসল মানুষকে হারিয়ে নকল ভালোবাসার পেছনে ছুটেছিলি। এখন বুঝলি তো, জীবনে কাকে হারিয়েছিস?

জাফর কবরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—বাবা, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটাকেই হারিয়েছি।
তারপর কবরের মাটিতে মাথা রেখে শেষবারের মতো বলল,
—শাহানাজ, তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তোমার ভালোবাসার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

চারপাশ নীরব। কবর নীরব। শুধু বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল এক অনুতপ্ত মানুষের কান্না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!