ঢাকা,  রোববার   ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

বৈষম্যের আগুনে পুড়ছে বেসরকারি খাত, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

বায়েজীদ মুন্সী বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ১৮:৫৩, ৮ নভেম্বর ২০২৬
বৈষম্যের আগুনে পুড়ছে বেসরকারি খাত, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন এক সমীকরণ। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল বেতন দ্বিগুণ হলেও তার বিপরীত চিত্র বিরাজ করছে দেশের বিশাল শ্রমবাজারের আসল চালিকাশক্তি—বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের মাঝে। বাজারে হু হু করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় এবং বেসরকারি খাতে বেতনের সুনির্দিষ্ট কোনো সুরক্ষাকবচ না থাকায় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম নাভিশ্বাস। একই সঙ্গে, এই বৈষম্য এবং বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে গিয়ে এক প্রকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বেকায়দায় পড়েছে সরকারও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতে। অথচ দেশের বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক বেতন সমন্বয় বা সুরক্ষার কোনো কার্যকর নীতিমালা তৈরি হয়নি।

বেসরকারি খাতের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বহুজাতিক ও বড় কিছু কর্পোরেট হাউজ ছাড়া মাঝারি বা নিম্নমানের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান, কারখানা, গণমাধ্যম এবং ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টটুকুরও নিশ্চয়তা থাকে না। অথচ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার পুরো আঘাত গিয়ে পড়ে এই সুরক্ষাহীন জনগোষ্ঠীর ওপর। বিশেষ করে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যে। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার ও পরিবহন খরচ—সবকিছুর দামই এখন লাগামছাড়া ঊর্ধ্বমুখী, যা সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. হাবিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের নানা সুবিধা বা পে-স্কেল কাঠামোর বিষয়টি আলোচনায় এলেই বাজারে আগুন লেগে যায়। আমাদের মতো যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি, তাদের তো আয় এক টাকাও বাড়ে না। উল্টো বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। বাড়িভাড়া ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতি মাসে এখন ধারদেনা করতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা এই সমাজের উপেক্ষিত মানুষ।”

রাজধানীর রামপুরা বাজারের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সাইদুল ইসলাম। হাতে ধরা বাজারের থলেটি অর্ধভরা। চাল, ডাল, তেল ও সবজির দাম শুনে পকেট হাতড়ে কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছেন না। তিনি বলেন, “গত এক বছরে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেই যার দাম বাড়ানো হয়নি। অথচ আমার বেতন বাড়েনি এক টাকাও। বাধ্য হয়ে সংসারের খরচ কমাতে হচ্ছে। আগে মাসে দুই কেজি গরুর মাংস কিনতাম, এখন কোরবানির ঈদ ছাড়া পাতে গোশত ওঠে না। ডালের পরিমাণ কমিয়ে পানিতে ঝোল বাড়াতে হয়। মাছ কেনা তো এখন বিলাসিতা। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে হাত পেতে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতে পারছি না।”

একই চিত্রের কথা মিরপুরের একটি মুদি দোকানে বাজার করতে আসা গৃহিণী সায়েরা খাতুনের মুখেও। তিনি বলেন, “সংসার চালাতে গিয়ে এখন প্রতি মুহূর্তে কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করতে হয়। মাছ-মাংসের দোকানে গেলে দাম শুনেই পিছু হটা ছাড়া উপায় থাকে না। এক হালি ডিম কেনার আগেও দশবার ভাবতে হয়। শুধু চাল আর ডাল কিনে ঘরে ফিরছি অনেক দিন হলো। পরিবারের পুষ্টির কথা তো ভুলেই গেছি।”

এদিকে বেসরকারি খাতের বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার বাইরে রেখে সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। একদিকে পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় বাড়ায় রাজকোষের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি কর্মজীবীদের ক্ষোভ ও বৈষম্য সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। সম্প্রতি দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে আকস্মিক ও নজিরবিহীন অসন্তোষই তার নজির।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০,০০০ টাকা করার দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক। টানা কয়েকদিনের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার জেরে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং শত শত কারখানা সাম্যয়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকরাও বকেয়া বেতন পরিশোধ ও মজুরি পুনর্র্নিধারণের দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। গাজীপুর ও আশুলিয়ার কালিয়াকৈর অঞ্চলের জুতা, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলনে যোগ দেন। 

চাকরি স্থায়ীকরণ, আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল এবং সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন বাড়ানোর দাবিতে চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিং সরকারি কর্মচারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ ও সচিবালয় ঘেরাওসহ প্রধান সড়কগুলোতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অস্থায়ী ও মাস্টাররোল কর্মীরা চাকরি নিয়মিতকরণ ও জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বেতনের দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে কর্মবিরতি পালন করেন। পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীরাও ১০ম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “বর্তমানে যে ক্ষেত্রগুলোতেই বেতন বাড়ানোর দাবি বা আন্দোলন চলে, তার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। কিন্তু বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই হুট করে বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, জোর করে বেতন বাড়াতে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের কর্মজীবীরা দেখছেন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। এখানে সরকারের একটি ভুল সিদ্ধান্ত কাজ করেছে—সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথম বছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন এতটা বাড়িয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। সরকার চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে বেতন না বাড়িয়ে একটি রূপরেখা বা ঘোষণা দিয়ে রাখতে পারত যে, আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “হঠাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়ায় বেসরকারি খাতের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বাড়িভাড়াও বেড়ে যাচ্ছে—কিন্তু বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অথচ এই মুহূর্তে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন বাড়ানোর মতো কোনো আর্থিক সক্ষমতা নেই।”

অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “একটি দেশের অর্থনীতির মোট শ্রমশক্তির একটি ক্ষুদ্র অংশ সরকারি খাতে কাজ করে। সরকারের আয়ের মূল উৎস সাধারণ জনগণের দেওয়া ভ্যাট ও ট্যাক্স। যখন কোনো নীতি কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য সুবিধা আনে এবং বৃহৎ বেসরকারি খাতের জন্য কোনো প্রাইভেট সার্ভিস রুলস বা মনিটরিং থাকে না, তখন বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা দারুণভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।”

শ্রম অধিকার গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, “বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে বেসরকারি খাতের মালিকপক্ষ প্রায়ই কর্মচারীদের ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। পে-স্কেল বা সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের জীবনমান রক্ষায় সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা উচিত। তা না থাকলে সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ভয়ংকরভাবে বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।”

বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের দাম বাড়ানো সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। পাশাপাশি নিম্নমধ্যবিত্ত ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুলভ মূল্যে খাদ্য রেশনিং বা ওএমএস কার্যক্রম বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি।”

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি খাতের স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি সামাল দেওয়া এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরাসরি বেতন বাড়ানোর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করাও সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!