ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

ভাটা পড়েছে কারিগরি শিক্ষায়

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৪:০১, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ভাটা পড়েছে কারিগরি শিক্ষায়
ভাটা পড়েছে কারিগরি শিক্ষায়

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও প্রবাসে দক্ষ শ্রমশক্তির বৈশ্বিক চাহিদার মুখে দেশে যখন কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা, ঠিক তখনই এ খাতে দেখা দিয়েছে গভীর বিপর্যয় ও চরম অস্থিরতা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার-প্রচারণার বিশাল ফিরিস্তি সত্ত্বেও বাস্তবে শিক্ষার্থী সংকটে বেহাল দশায় পড়ে বন্ধের মুখে দেশের অর্ধেকেরও বেশি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে এবং মাইকিং করেও মেলানো যাচ্ছে না শিক্ষার্থী। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শূন্য শিক্ষার্থী, আবার কোথাও নামমাত্র কয়েকজন ভর্তি হলেও বছর না ঘুরতেই কমে যাচ্ছে উপস্থিতি। টানা তিন বছর ধরে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি করতে না পেরে চূড়ান্ত অনুমোদন বাতিলের ঝুঁকিতে পড়েছে শতাধিক ডিপ্লোমা ও এইচএসসি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে তদারকিহীন অনুমোদন-বাণিজ্য, নিম্নমানের শিক্ষক, অপর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি এবং পাস করার পরও চাকরি না পাওয়ার মতো পুঞ্জীভূত সংকটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, শিক্ষার্থী সংকটে বাতিল হতে যাচ্ছে শতাধিক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন। দেশে গত তিন বছর ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারেনি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল এবং ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার শিক্ষাক্রম পরিচালনাকারী ৮৬টি প্রতিষ্ঠান। শর্ত অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান টানা তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা না করলে তার পাঠদানের অনুমোদন বাতিলযোগ্য। বর্তমানে সারা দেশে শতাধিক বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী সংকটে বেহাল দশায় রয়েছে। মাইকিং করেও প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী জোগাড় করতে পারছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, টানা তিন বছর ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের ৮৬টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন কেন বাতিল বা প্রত্যাহার করা হবে না, তা জানতে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে। এর আগে গত জুলাইয়ে টানা তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা না করায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দেশের ২৬টি কারিগরি এইচএসসি (বিএমটি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছিল। সব মিলিয়ে ১১২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না দিলে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে বলে শোকজের চিঠিতে বলা হয়েছে।

এই সংকট শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সারা দেশের কারিগরি শিক্ষার কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৯৩২টি (২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব)। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৭-৮ শতাংশের কাছাকাছি, বাকি প্রায় ৯২-৯৩ শতাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। ডিপ্লোমা পর্যায়ের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা সরকারি প্রায় ৫০-৫৬টি এবং বেসরকারি প্রায় ৪৬৭ থেকে ৬১২টির মধ্যে। শুধু ঢাকাতেই বেসরকারি পলিটেকনিকের সংখ্যা প্রায় ৭০টি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই শিক্ষার্থী নেই। ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে মোট আসনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার আসন। কিন্তু ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে মোট ভর্তি হয়েছে মাত্র প্রায় ৬৮-৬৯ হাজার শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ আসন ফাঁকা থেকে গেছে। বেসরকারি পলিটেকনিকে এই হার আরও ভয়াবহ—প্রায় ১ লাখ আসন খালি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সামগ্রিকভাবে কারিগরি শিক্ষায় মোট আসন প্রায় ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি হলেও ভর্তি হয়েছে মাত্র প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী।

পরীক্ষায় পাসের হারও নিম্নমুখী। ২০২৫ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ১ লাখ ৩৮ হাজার ২০৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৯৪৮ জন। কিন্তু ২০২৬ সালে এই হার নেমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে। ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন। জিপিএ-৫ পায় ৩ হাজার ৯৫১ জন। এইচএসসি (ভোকেশনাল/বিএম/ডিপ্লোমা ইন কমার্স) পরীক্ষায় ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশে। ১ লাখ ৫ হাজার ৬১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৬৬ হাজার ১৮৫ জন। ছাত্রীদের পাসের হার (৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ) ছাত্রদের (৫৮ দশমিক ৪১ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশজুড়ে অযোগ্য ও মানহীন বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছড়াছড়ি। সারা দেশে বেসরকারি পলিটেকনিকের মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৭০টি রয়েছে, যার অধিকাংশই মানহীন। আর ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। এসব প্রতিষ্ঠানে যাঁরা পড়ান, তাঁদের যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানের শুধু ব্যবসার দিকেই নজর থাকলেও মানের দিকে নজর নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের সঙ্গে বোর্ড কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া শিক্ষা বোর্ডের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেসরকারি পলিটেকনিক থেকে প্রতি মাসে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য একটি নীতিমালা রয়েছে। ২০০৯ সালে প্রণীত ওই নীতিমালা ২০১২ সালে সংশোধন হয় এবং পরে ২০২০ সালের নীতিমালাও রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালার কী কী শর্ত বাস্তবায়ন করছে, তা বোর্ড কর্মকর্তারা জানেন না। বরং অভিযোগ রয়েছে, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে। এমনকি নীতিমালার ৫০-৬০ শতাংশ মানলেই প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীশূন্য পঞ্চগড় সদরের নতুন বস্তি এলাকায় অবস্থিত মিনাল বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫ জন শিক্ষক থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো প্রশিক্ষকই প্রতিষ্ঠানে আসেন না। মাঝেমধ্যে প্রতিষ্ঠানে আসেন অধ্যক্ষ। গত পাঁচ বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। যদিও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ডিপ্লোমা পর্যায়ের বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদান ও স্বীকৃতি প্রদান-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২০-এর বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ফলাফল, অবকাঠামো, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরি এবং পাঠদানের অনুমোদনের সময় আরোপিত অন্যান্য শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সরকারের অনুমোদনক্রমে বোর্ড পাঠদানের অনুমতি বাতিল করতে পারে। বর্তমানে তিন বছর ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি না করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ২০২৭-২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করার বিষয়ে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জামিনুল ইসলাম জানান, করোনার পর থেকেই কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া শুরু হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ায় গত চার বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষায় সরকারের সুনজর জরুরি।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ হলো পরিকল্পনাহীন অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, “সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার্থী বাড়ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাব নেই, যোগ্য শিক্ষক নেই, শিল্পের সঙ্গে সংযোগ নেই। ফলে পাস করেও চাকরি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। বেতন কম, সামাজিক মর্যাদা কম—এই ধারণা পরিবর্তন না হলে সংকট কাটবে না।” একজন শিক্ষার্থী, যিনি সম্প্রতি একটি সরকারি পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা শেষ করেছেন, বলেন, “আমরা ব্যবহারিক শিক্ষা পাই কম। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ সীমিত। অনেক সময় মনে হয় জেনারেল শিক্ষাই ভালো ছিল। কারণ সেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি।” আরেকজন শিক্ষক, যিনি একটি বেসরকারি পলিটেকনিকে কর্মরত, বলেন, “আমরা বেতন পাই না সময়মতো। শিক্ষার্থী না থাকায় প্রতিষ্ঠানও টিকতে পারছে না। বোর্ডের নজরদারি বাড়াতে হবে, কিন্তু অযথা হয়রানি নয়।”

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিভিন্ন সময় পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার সময় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য এবং কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নীতিমালা অনুসরণের কথা বললেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অনুমোদন বাতিল করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন গুণগত মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামো উন্নত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়া এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা সংকটকে আরও গভীর করেছে।

সারা দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীর অভাব, পাসের হারের পতন এবং মানহীনতা মিলে এক ভয়াবহ চিত্র তৈরি করেছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও মূল সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অন্যথায় কারিগরি শিক্ষার ভাটা শুধু অব্যাহতই থাকবে না, দেশের দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!