ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

পর্যটনে সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ২১:৪০, ৭ অক্টোবর ২০২৬
পর্যটনে সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ
সেন্ট মার্টিন সমুদ্র সৈকত

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, তিনটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, পাহাড়ি ঝরনা, হাওর, চা-বাগান এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—সবকিছু থাকার পরও পর্যটন খাতে প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ।

২০২৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কম। অথচ একই সময়ে নেপালে আন্তর্জাতিক পর্যটক এসেছেন ১১ লাখের বেশি। মালদ্বীপে ২০২৪ সালেই পর্যটক এসেছেন ২০ লাখের বেশি এবং ভারতে প্রায় এক কোটি। পর্যটন খাতে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার পেছনে রয়েছে দুর্বল অবকাঠামো, নিরাপত্তা উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক প্রচারের ঘাটতি, তুলনামূলক বেশি খরচ এবং নীতিগত সমন্বয়হীনতা।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের (বিটিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে দেশে মোট বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ এবং ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন।

সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে ভারতীয় পর্যটকদের আগমনে। ২০২৫ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন মাত্র ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৯ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ১ শতাংশ কম। মোট বিদেশি পর্যটক আগমনে ভারতীয়দের অংশও ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

তবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটক আগমনে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে এসেছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ২৮৮ জন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ১৮২ জন। কিন্তু এসব বাজারে সামান্য বৃদ্ধি সামগ্রিক পতন ঠেকাতে পারেনি।

পর্যটন খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও কমেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) হিসাবে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের কাছাকাছি। বিপরীতে নেপালে এ অবদান ৪ শতাংশের বেশি এবং মালদ্বীপে তা আরও অনেক বেশি।

দেশে পর্যটন কেন্দ্রের সংখ্যারও কমতি নেই। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের আওতায় প্রণীত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, সাজেক, নীলগিরি, কাপ্তাই হ্রদ, জাফলং, রাতারগুল, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও কান্তজিউ মন্দিরসহ শত শত দর্শনীয় স্থান।

তবে এসব পর্যটনকেন্দ্রের বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও কার্যকর প্রচারের অভাবে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।

পর্যটন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, খাতটির অন্যতম প্রধান সমস্যা দুর্বল অবকাঠামো। কক্সবাজারের মতো প্রধান পর্যটন গন্তব্যেও আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, পরিবহন ও বিনোদন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। সুন্দরবনে নৌযান ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে রাস্তাঘাটের অবস্থা দুর্বল এবং বর্ষা মৌসুমে অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৪-এ ১১৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বশেষ।

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন।

এর পাশাপাশি ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, দুর্বল ডিজিটাল প্রচার এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক পর্যটন সম্ভাবনার পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবও রয়েছে। পর্যটন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় যে খরচে তিন তারকা মানের হোটেলে থাকা যায়, বাংলাদেশে একই মানের সেবার জন্য প্রায় দ্বিগুণ খরচ হতে পারে বলে পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি।

বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) এক নেতা বলেন, ‌‘আমরা পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু পর্যটন বন্ধ করে নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রচার ছাড়া বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ সম্ভব নয়।’

আরেক পর্যটন ব্যবসায়ী জানান, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটনের প্রধান মৌসুমে তার কোম্পানির মাধ্যমে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ জন বিদেশি পর্যটক আসবেন বলে তারা আশা করছেন।

পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নাসরীন জাহান বলেন, ‘পর্যটন খাত জিডিপিতে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ অবদান রাখে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে এই খাত অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হতে পারে।’

সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। প্রত্যেক জেলার স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন সুবিধা তৈরি করা হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মূলত অভ্যন্তরীণ পর্যটকরাই দেশের পর্যটন খাতকে সচল রাখছেন। দেশের মোট পর্যটকের প্রায় ৯০ শতাংশই দেশীয়। অথচ বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিপুলসংখ্যায় বিদেশ ভ্রমণ করেন।

ভারতে একসময় ১৭ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি পর্যটক যেতেন। ভারতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে ৪ দশমিক ৭ লাখে নেমেছে। তারপরও প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি বিদেশ ভ্রমণ করেন, ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।

কক্সবাজার ভ্রমণে আসা এক বিদেশি পর্যটক বলেন, ‘সৈকত সুন্দর, কিন্তু পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিয়ে হতাশ হয়েছি। নেপালে একই খরচে অনেক ভালো অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।’

আরেক ইউরোপীয় পর্যটক বলেন, ‘ভিসা ও নিরাপত্তার তথ্য অনলাইনে সহজে পাওয়া যায় না। প্রচারেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে।’

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সরকারকে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গাইড, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং দেশের আঞ্চলিক খাবার ও সংস্কৃতির প্রচারে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ বাড়ানো এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

মালদ্বীপের বিলাসবহুল পর্যটন এবং নেপালের অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের মডেল থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের লক্ষ্য পর্যটন খাতের জিডিপিতে অবদান ৭ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা। তবে বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, সম্ভাবনার তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি এখনও অনেক পিছিয়ে।

অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রচার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নীতিগত সমন্বয় ছাড়া এই ব্যবধান কমানো কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/একেকে
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!