ঢাকা,  সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

ই-বর্জ্যে মৃত্যুর ফাঁদ

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৬:০০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ই-বর্জ্যে মৃত্যুর ফাঁদ
অপরিকল্পিতভাবে রিসাইক্লিং করা হচ্ছে ই-বর্জ্য

দেশের মাটি, পানি ও মানুষের শরীরে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে ই-বর্জ্যের বিষাক্ত উপাদান। ইলেকট্রনিক বা ই-বর্জ্য এখন আর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র অকেজো হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সোলার প্যানেল এবং লিথিয়াম-আয়ন ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্য।

ই-বর্জ্যে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম, টিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার না করা হলে এসব উপাদান মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে খাদ্যশৃঙ্খল, দূষিত পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও সূত্র অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে ই-বর্জ্য বাড়ছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে বছরে ই-বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৬ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। বিভিন্ন হিসাবে বর্তমানে শুধু ঘরোয়া ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার টন এবং জাহাজভাঙা শিল্পসহ মোট প্রায় ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর প্রায় ৯৭ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, শহরতলির স্ক্র্যাপ মার্কেট ও অস্থায়ী কারখানায় খোলা জায়গায় ই-বর্জ্য পোড়ানো, অ্যাসিড দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা কিংবা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মূল্যবান ধাতু আলাদা করার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে শ্রমিকরা সরাসরি বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে আসেন। একই সঙ্গে মাটি ও পানিতে ভারী ধাতু মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সোলার প্যানেল ও বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির বর্জ্যও এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। গত এক দশকে দেশে সোলার হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারিচালিত শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। এসব যন্ত্রের আয়ুষ্কাল শেষ হলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, স্থাপিত সোলার পিভি সিস্টেম থেকে ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। যথাযথ পুনর্ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেখান থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

কিন্তু কার্যকর পুনর্ব্যবহারব্যবস্থা না থাকলে এসব বর্জ্যের মূল্যবান উপাদান যেমন নষ্ট হয়, তেমনি বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অটোরিকশায় ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন এবং লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ব্যবহৃত ব্যাটারি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা কিংবা অনিরাপদভাবে গলানোর ফলে পরিবেশ ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য দুটিই ঝুঁকিতে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-বর্জ্যের বিষাক্ত উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। এর প্রভাবে শ্বাসযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মূত্রতন্ত্র ও প্রজনন ব্যবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

গবেষণায় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের রক্তে সিসার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় ই-বর্জ্য কর্মীদের রক্তে সিসার গড় মাত্রা প্রায় ১১ দশমিক ৮৯ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার পাওয়া গেছে, যা অনাবৃত কর্মীদের তুলনায় বেশি।

ই-বর্জ্যের সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, শ্বাসনালির প্রদাহ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস, ত্বকের সমস্যা, রক্তাল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি ও যকৃতের ক্ষতির মতো স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমাত্রার সংস্পর্শে কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিভিন্ন এলাকায় শিশুরাও ই-বর্জ্য ভাঙা ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত রয়েছে। যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া এ ধরনের কাজ তাদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ই-বর্জ্য থেকে নির্গত সিসা ও ক্যাডমিয়াম শ্রমিকদের রক্তে মিশে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং শ্বাসকষ্ট বাড়াচ্ছে। আমরা দেখছি অনেক রোগীর ফুসফুসের শীর্ষ প্রবাহ হার কমে যাচ্ছে। গর্ভবতীদের মধ্যে এটি নবজাতকের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার কিডনি ও যকৃতেও স্থায়ী ক্ষতি করে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালমা আক্তার বলেন, পারদ ও সিসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্মৃতিশক্তি ও মোটর দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। কিডনি ও যকৃতের কার্যক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। অনেক রোগীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তাল্পতাও দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. রওশন মমতাজ বলেন, দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার নেই। অনানুষ্ঠানিক খাতে ৯৭ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় বিষাক্ত ধাতু মাটি ও পানিতে মিশে যাচ্ছে। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির বর্জ্য আগামী দুই দশকে বড় সংকট তৈরি করবে, যদি এখনই পরিকল্পনা না নেওয়া হয়। আমরা গণনা করে দেখেছি ২০৩৫ সালে মোট ই-বর্জ্য ৪৬ লাখ টনে পৌঁছাবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন এসডিওর পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “শিশু শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অনেক এলাকায় শিশুরা খালি হাতে ই-বর্জ্য ভাঙছে। এতে তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারকে অবিলম্বে আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষক ও পরিবেশবিদ মো. শাহজাহান আলী বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ থাকা সত্ত্বেও উৎপাদক ও আমদানিকারকদের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে। বছরে কয়েক কোটি টাকার মূল্যবান ধাতু নষ্ট হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতিও। নিবন্ধন ও সংগ্রহ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাযথ নীতিমালার বাস্তবায়নের ঘাটতি, আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং সুবিধার অপ্রতুলতা, উৎপাদক ও আমদানিকারকদের বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব বা এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাব।

অনেক ক্ষেত্রেই ই-বর্জ্য সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে এটি সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করার সময় বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে অনিরাপদভাবে বর্জ্য ভাঙা, পোড়ানো বা রাসায়নিক দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার কারণে শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকদের দায়িত্ব, পৃথক সংগ্রহব্যবস্থা এবং আধুনিক পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জাপানে হোম অ্যাপ্লায়েন্স রিসাইক্লিং আইনের আওতায় নির্দিষ্ট ধরনের পুরোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতাদের পুরোনো যন্ত্র ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্বের আওতায় উৎপাদকদের পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্জ্য বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা WEEE-সংক্রান্ত নীতিমালার আওতায় পৃথক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কাঠামো গড়ে উঠেছে।

এসব ব্যবস্থায় ই-বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্য থেকে আলাদা করে সংগ্রহ, নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত এবং মূল্যবান ধাতু ও অন্যান্য উপাদান পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার জানান, ই-বর্জ্য বর্তমানে আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না; সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গেই তা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রিসোর্স রিকভারি সেন্টার তৈরির চুক্তি করেছে। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্লাস্টিক থেকে তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের অবকাঠামো গড়ে তোলা, উৎপাদক ও আমদানিকারকদের ইপিআর বাস্তবায়ন, অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ই-বর্জ্য এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারব্যবস্থা, আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কেন্দ্র, কার্যকর ইপিআর, শ্রমিক সুরক্ষা, শিশুশ্রম বন্ধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ//একেকে
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!