ঢাকা,  বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মানুষ ক্ষমতালোভী ও সামাজিক প্রাণী!

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:২২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষ ক্ষমতালোভী ও সামাজিক প্রাণী!
AMERICAN র‍্যাপার ফিফটি সেন্টের জীবনের উদাহরণ দিয়ে গ্রিন বোঝান, ৯টি গুলির আঘাত সহ্য করে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে উঠে আসার পেছনে ছিল তাঁর এই আমূল বাস্তববাদ। জীবনের সবচেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক অনুভূতি হলো চরম অসহায়ত্ব বা শক্তিহীনতা (Powerlessness)। ক্ষমতার আসল উদ্দেশ্য

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ইয়েল ইউনিভার্সিটির মিলনায়তনে যখন বিশ্বখ্যাত লেখক রবার্ট গ্রিন ডায়াসে দাঁড়ালেন, তখন তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো গতানুগতিক মিষ্টি আশ্বাসের বাণী শোনাননি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আর ভালো ফলাফলের অহংকারে বুঁদ হয়ে থাকা মেধাবী তরুণদের তিনি শোনালেন এক নির্মম বৈজ্ঞানিক সত্য, মানুষ কোনো নিষ্পাপ দেবদূত নয়, বরং ৪ কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া এক ক্ষমতালোভী ও সামাজিক প্রাণী! এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করাই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রতিভাবান মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, গভীর মানসিক হতাশা ও আকস্মিক পতনের কারণ।

রবার্ট গ্রিন আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের বরাত দিয়ে ম্যাকিয়াভেলিয়ান বুদ্ধিমত্তা (Machiavellian Intelligence) এবং থিওরি অব মাইন্ড-এর বিস্ময়কর তত্ত্ব তুলে ধরেন। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর তুলনায় মানুষের মস্তিষ্ক কেন এত দ্রুত ও বিশাল আকারে বিবর্তিত হলো? 

Advertisement

কারণ আমাদের আদি পূর্বপুরুষ প্রাইমেটদের স্রেফ বন্য প্রকৃতির সাথে লড়াই করলেই চলত না টিকে থাকার জন্য তাদের পরিচালনা করতে হতো জটিল সামাজিক রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বৈরথ, গোপন মিত্রতা এবং ছদ্মবেশ। 

ধর্মদর্শন (Philosophy of Religion) - খণ্ড ৩: ধর্মমনস্তত্ত্ব, ধর্মীয়  অভিজ্ঞতা, আত্মা, পরকাল ও বিশ্বধর্ম | সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন

মানুষের মস্তিষ্কের মিরর নিউরন একদিকে যেমন গভীর সহমর্মিতা ও সহযোগিতার জন্ম দেয়, অন্যদিকে তা প্রতিপক্ষের চাল আগেভাগে আঁচ করে চতুর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরির সুযোগ করে দেয়। আমরা প্রাকৃতিকভাবেই এক সহজাত রাজনৈতিক ও সামাজিক জীব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে তরুণরা যখন বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নামে, তখন তারা এই সত্য অস্বীকার করে মারাত্মক হোঁচট খায়। রবার্ট গ্রিন নিজের জীবনের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। 

  • ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনি একটি নামী মিডিয়া হাউজে কাজ করতেন, যেখানে তিনি নিজের অসাধারণ মেধার জোরে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি চমৎকার গল্প ও প্রজেক্ট জমা দিচ্ছিলেন। 
  • তিনি ভেবেছিলেন একনিষ্ঠ ভালো কাজ করাই হয়তো সফলতার একমাত্র মাপকাঠি। কিন্তু তাঁর এই অতিরিক্ত দক্ষতা ও সাফল্য তাঁর নারী বসের ভেতরের গভীর নিরাপত্তাহীনতাকে তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলে। 

তাঁর প্রতিভাবান উপস্থিতি বসকে নিজের পদ হারানোর আতঙ্কে ফেলে দেয়। বস তাঁর ওপর অযথা খড়্গহস্ত হন, তাঁকে অ্যাটিটিউড প্রবলেম-এর মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেন।

পরবর্তীতে গ্রিন উপলব্ধি করেন, বই লেখার ১২ বছর আগেই তিনি দ্য ৪৮ লজ অব পাওয়ার-এর ১ নম্বর আইনটি মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছিলেন, কখনো বসের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হতে যেও না (Never Outshine the Master)। সেদিন থেকেই রবার্ট গ্রিন একটি জীবনদর্শন গ্রহণ করেন, ইটস অল ম্যাটেরিয়াল (Its all material)। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দর্শন (Philosophy of Artificial Intelligence) - খণ্ড  ১: বুদ্ধিমত্তা, মন, এজেন্সি ও কৃত্রিম চেতনা | সংশয় - চিন্তার মুক্তির  আন্দোলন

অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি আঘাত, বঞ্চনা ও সংকট হলো মানব মনস্তত্ত্বের গভীর রহস্য শেখার এক অমূল্য কাঁচামাল। তিনি আবেগের বশে ভেঙে না পড়ে একজন নির্মোহ বিজ্ঞানীর মতো চারপাশের ক্ষমতার খেলা দূর থেকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।

রবার্ট গ্রিনের মতে, বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমাজে মূলত তিন ধরণের মানুষ দেখা যায়:
১. ডিনায়ার (Deniers): যারা বাস্তবতা অস্বীকার করে ভাবে দুনিয়া কেবল সততা ও নীতিতে চলে এরা কর্মক্ষেত্রে বা রাজনীতিতে দ্রুত কোণঠাসা ও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

২. অন্ধ সুবিধাবাদী (Manipulators): যারা স্রেফ ধূর্ততা দিয়ে অন্যকে ঠকাতে চায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সহমর্মিতা ও আস্থার অভাবে একসময় নিজের তৈরি ফাঁদেই ধ্বংস হয়।

৩. র‍্যাডিক্যাল রিয়্যালিস্ট (Radical Realists): যারা মানব চরিত্রের আলো-আঁধারিকে কোনো অন্ধ ক্ষোভ বা নৈতিক বিচার ছাড়াই শান্তভাবে গ্রহণ করে এবং বাস্তবতাকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করে এক অপরাজেয় অবস্থান গড়ে তোলে।

তরুণ পেশাজীবীদের জন্য গ্রিনের পরামর্শ হলো, কর্মজীবনের শুরুতে অপরিণত আবেগ বা অন্ধ বিদ্রোহ না করে প্রতিষ্ঠানে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং সেটিকে মানব চরিত্র শেখার শিক্ষানবিশি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ হিসেবে দেখতে হবে। 

এখানে ব্রিটিশ রাজনীতিক ডিজরেইলির কৌশলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক নারী বলেছিলেন, গ্ল্যাডস্টোনের পাশে বসলে মনে হতো তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি, কিন্তু ডিজরেইলির পাশে বসলে মনে হতো আমি নিজেই দুনিয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমতী নারী! 

বাস্তব ক্ষমতায় কাউকে নিজের জ্ঞানে দাবিয়ে রাখা নয়, বরং অপরকে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত অনুভব করানোই হলো আসল সামাজিক চার্ম।

গ্রিন জানান, বড় বড় করপোরেট সিইও এবং ধনকুবেররা প্রায়ই তাঁর কাছে পরামর্শের জন্য আসেন। তারা ব্যবসায় বা প্রযুক্তির কারিগরি দিক নিখুঁতভাবে বুঝলেও মানুষের অবচেতন অহংকার, ঈর্ষা ও রাজনৈতিক খেলা বুঝতে পারেন না যার ফলে তারা প্রায়ই নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষের কাছে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। 

তাছাড়া আধুনিক যুগে কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান আপনাকে আজীবন নিরাপত্তা দেবে না ১৯৫০-এর দশকের আজীবন চাকরির দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। আজকের এই অত্যন্ত অস্থির ও পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় নিজের অনন্য প্রতিভাকে শাণিত করা এবং খাঁটি আত্মনির্ভরশীলতাই হলো আজীবন টিকে থাকার একমাত্র রক্ষাকবচ।

AMERICAN র‍্যাপার ফিফটি সেন্টের জীবনের উদাহরণ দিয়ে গ্রিন বোঝান, ৯টি গুলির আঘাত সহ্য করে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে উঠে আসার পেছনে ছিল তাঁর এই আমূল বাস্তববাদ। জীবনের সবচেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক অনুভূতি হলো চরম অসহায়ত্ব বা শক্তিহীনতা (Powerlessness)। ক্ষমতার আসল উদ্দেশ্য অন্যকে পদদলিত করা নয়, বরং নিজের জীবনে পূর্ণ স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জন করা। 

মানুষ যখন বাস্তবতাকে তার নগ্ন রূপে মেনে নিয়ে নিজের মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতাকে শাণিত করে, তখনই সে জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে সত্যিকারের মুক্তি, সার্বভৌমত্ব ও অজেয় ক্ষমতার পরম অধিকারী হয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!