বাংলাদেশের জলবায়ুর ক্ষতপিূরণ কোথায়?
জলবায়ু বা জলবায়ু পরিবর্তন গত কয়েক বছর ধরে আলোচিত বিষয়। নানা প্রান্তে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনছে। বর্তমানে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে পৃথিবীতে ঠিক তেমনি এ শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যেভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে পরিমাণে কি ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি?
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য খুব সামান্য দায়ী। যদি উন্নত রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করি তাহলে সামান্য বলাটাও ভুল হবে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম বারবার সামনে আসে।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ মোট নিঃসরণের ১ শতাংশেরও কম। অথচ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা ও তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
- ২০২৬ সালের শুরুতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) জানিয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়নের বার্ষিক প্রয়োজন ২৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, বিশেষ করে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারও বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় দেশটি জলবায়ু অর্থের মাত্র একটি অংশ পাচ্ছে। প্রশ্ন হলো—এই বিপুল ক্ষতির বিপরীতে বাংলাদেশ আসলে কত টাকা পাচ্ছে?
আর সত্যিকার অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত কি ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে?এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই ‘জলবায়ু অর্থায়ন’ আর ‘ক্ষতিপূরণ’-এর পার্থক্য বুঝতে হবে। আর এই পার্থক্যের দিকে আমাদের নজর আছে কি?
২৬ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন, কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোথায়?:
বাংলাদেশের National Adaptation Plan (NAP) ২০২৩–২০৫০ বাস্তবায়নে মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই পরিকল্পনায় নদীভাঙন, উপকূলীয় ক্ষয়, বন্যা, লবণাক্ততা, জলবায়ু-অভিবাসন, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোসহ বহু খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে যে আর্থিক চাহিদা দাঁড়িয়ে আছে, তা কয়েকটি প্রকল্পের অর্থ দিয়ে পূরণ করার মতো নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রশ্ন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হলো, বাংলাদেশের সরকারি NDC 3.0 নথি অনুযায়ী Green Climate Fund (GCF)-এর আওতায় বাংলাদেশে ৫৮৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুমোদিত অর্থায়ন রয়েছে। অন্যদিকে GCF-এর বর্তমান দেশভিত্তিক পৃষ্ঠায় বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ৪৬৪ মিলিয়ন ডলারের GCF financing এবং ১০টি প্রকল্প দেখানো হচ্ছে।
এই অঙ্কগুলো ‘অনুমোদিত অর্থায়ন’; এগুলোকে সরাসরি বাংলাদেশের উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানেই মূল সমস্যাটি।
একদিকে বাংলাদেশের বার্ষিক জলবায়ু অর্থের প্রয়োজন ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অনুমোদিত অর্থের অঙ্ক কয়েকশ কোটি ডলারে। তার ওপর এই অর্থের বড় অংশ প্রকল্পভিত্তিক—ব্যক্তিগত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নয়।

উপকূলের মানুষ কী হারাচ্ছে?
বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একজন কৃষকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বিমূর্ত শব্দ নয়। তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন মানে লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানক্ষেত।
একজন নদীপাড়ের মানুষের কাছে এটি মানে এক রাতের ভাঙনে বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া। একজন জেলের কাছে এটি জীবিকার অনিশ্চয়তা।
একজন উপকূলীয় নারীর কাছে এটি নিরাপদ পানি সংগ্রহের দীর্ঘ পথ। আর একটি পরিবারের কাছে এটি হতে পারে—একটি ঘর হারানো, এক খন্ড জমি হারানো, একটি গবাদিপশু হারানো কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো। এই হারানোর আর্তনাদ বছরের পর বছর ধরে। সাগরে নিখোঁজ হওয়া জেলে পরিবারের আর্তনাদ আর শোকের মাতম এগুলো নিত্যদিনের।
বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্যেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, তাপমাত্রার চরমতা, খরা এবং জীবিকা ও অবকাঠামোর ক্ষতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও বলছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে পানি ও মাটির লবণাক্ততা বাড়ছে এবং এর প্রভাব লাখ লাখ মানুষের জীবনে পড়ছে।
২৫০টি উপকূলীয় গ্রামের ওপর পরিচালিত জরিপে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর ঘাটতিকে সবচেয়ে জরুরি অপূর্ণ চাহিদাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নদীভাঙনের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
বাংলাদেশের জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনায় নদীভাঙনকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ নদীভাঙনের শিকার একজন মানুষ শুধু একটি ঘর হারান না। তিনি হারাতে পারেন বসতভিটা, কৃষিজমি, গাছপালা, পুকুর, দোকান, গবাদিপশু এবং সামাজিকভাবে পরিচিত একটি ভূখণ্ড।
National Adaptation Plan-এ নদী ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রয়োজন স্বীকার করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, নদীতীর স্থিতিশীলকরণে ৫৮৭ বিলিয়ন টাকা এবং উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় ৭৫৫ বিলিয়ন টাকার মতো ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের টাকা আর নদীতে জমি হারানো কৃষকের ক্ষতিপূরণের টাকা এক জিনিস নয়। যে ক্ষতি হয় তা ক্ষতিপূরণ দিয়ে পোষানো সম্ভব নয়। যা হারায় তা আর ফেরত আসে না। অনেক ক্ষতি যা কখনোই পুরন হবার নয়।
একটি বাঁধ তৈরি হতে পারে, কিন্তু যে পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়েছে, তার জমির মূল্য, ঘরবাড়ি, জীবিকা ও সামাজিক ক্ষতির হিসাব কে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোতে যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্রও ছোট নয়:
শুধু ২০২৪ সালের আগস্টের বন্যার উদাহরণ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বিশ্বব্যাংকের GRADE মূল্যায়ন অনুযায়ী ওই বন্যায় বাংলাদেশের সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যম হিসাব ছিল প্রায় ১.৬৭৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে অবকাঠামোতে ৬৪০ মিলিয়ন ডলার, কৃষিতে ৪৬৮ মিলিয়ন ডলার এবং আবাসিক ভবন ও সম্পদে ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি অনুমান করা হয়েছে। এটি শুধু একটি বড় বন্যার হিসাব।
এর সঙ্গে যদি বছরের পর বছর নদীভাঙন, উপকূলীয় ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, জীবিকা হারানো, সাগরে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো এবং মানুষের স্থানান্তরের অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি যোগ করা হয়, তাহলে ক্ষতির চিত্র আরও বড় হয়।
বাংলাদেশের NAP-ভিত্তিক বিশ্লেষণে ২০১৬–২০২১ সময়ে জলবায়ু-সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতির বার্ষিক গড় প্রায় ৩৩.৩ বিলিয়ন টাকা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষতি হচ্ছে প্রতিবছর। কিন্তু ক্ষতিপূরণের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখনো সেই বাস্তবতার সমান গতিতে এগোয়নি।
ক্ষয়ক্ষতি তহবিল—আশার জায়গা, কিন্তু পথ এখনো দীর্ঘ:
জলবায়ু ন্যায়বিচারের আন্দোলনের একটি বড় অর্জন হলো Fund for Responding to Loss and Damage (FRLD) প্রতিষ্ঠা। এই তহবিলের উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা করা।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তহবিলটির জন্য বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮১৭ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে তহবিলটি ২০২৫–২০২৬ সময়ের প্রাথমিক কার্যক্রমের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করে। শুনতে বড় অঙ্ক মনে হলেও পৃথিবীর জলবায়ুজনিত ক্ষতির তুলনায় এটি খুবই সীমিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের জন্য নয়; এটি বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের জন্য তহবিলের প্রাথমিক অর্থায়ন কাঠামো। সুতরাং বাংলাদেশের উপকূলের নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে এই তহবিল থেকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে—এমন কোনো তথ্য নেই। এখানেই বাংলাদেশের জন্য 'ক্ষয়ক্ষতি তহবিল' ‘Loss and Damage’ নিয়ে পরবর্তী লড়াইয়ের গুরুত্ব।

জলবায়ু ঋণ আর ক্ষতিপূরণ এক হতে পারে না:
আরেকটি বিষয় নিয়ে জনপরিসরে স্পষ্ট আলোচনা দরকার। বাংলাদেশ জলবায়ু মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ঋণ ও উন্নয়ন অর্থায়ন পাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে; এর সঙ্গে আরও সহ-অর্থায়ন ছিল।
বিশ্বব্যাংকও দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে বড় অঙ্কের অর্থায়ন করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন বাংলাদেশে আশ্রয়কেন্দ্র, সড়ক, বাঁধ, সুরক্ষা অবকাঠামো ও বনায়নের মাধ্যমে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষের সহনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। এসব অর্থ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণ’ বলা ঠিক হবে না।
কারণ ঋণ একসময় পরিশোধ করতে হয়। আর ক্ষতিপূরণ হলো ক্ষতির ন্যায্য স্বীকৃতি ও প্রতিকার—বিশেষ করে যখন ক্ষতির জন্য দায় ও ক্ষতির বোঝা সমানভাবে বণ্টিত নয়।
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ক্ষতির হিসাব হওয়া দরকার:
জলবায়ু ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু ‘বাংলাদেশ কত টাকা পেল’—এই হিসাব যথেষ্ট নয়।
জানতে হবে—কত টাকা অনুদান? কত টাকা ঋণ?কত টাকা অভিযোজনের জন্য? কত টাকা ক্ষয়ক্ষতির জন্য? কত টাকা জাতীয় পর্যায়ের অবকাঠামোতে? আর কত টাকা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে পৌঁছেছে? এই শেষ প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ঢাকার কোনো প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও যদি নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো পরিবার তার হারানো সম্পদের ন্যায্য প্রতিকার না পায়, তাহলে জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ তার কাছে কাগজের হিসাব হয়েই থাকে।
বাংলাদেশের প্রথম National Climate Finance Strategy তৈরির উদ্যোগ এখন তাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে UNDP জানিয়েছে, বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজন ও প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে ব্যবধান কমাতে এই কৌশল তৈরি করছে এবং সরকার দ্রুত দুর্যোগ-পরবর্তী অর্থ ছাড় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থ পৌঁছানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ মানে শুধু টাকা নয়:
জলবায়ু ক্ষতির সবকিছুর মূল্য টাকা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। একটি পরিবার যখন পৈতৃক ভিটা হারায়, একটি গ্রাম যখন বারবার ভাঙনের মুখে পড়ে, কোনো কৃষক যখন লবণাক্ততার কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্মের জমিতে আর ফসল ফলাতে পারেন না, কিংবা কোনো পরিবার যখন জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির কারণে শহরের বস্তিতে চলে যায়—এসবের কিছু অর্থনৈতিক, কিছু সামাজিক, কিছু সাংস্কৃতিক এবং কিছু অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি।
তাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি শুধু ‘বিদেশ থেকে টাকা আনতে হবে’—এখানে থেমে থাকতে পারে না। দাবি হওয়া উচিত—ক্ষতির বৈজ্ঞানিক হিসাব করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার শনাক্ত করতে হবে। নদীভাঙন ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণ কাঠামো করতে হবে।
লবণাক্ততায় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষকের ক্ষতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। জীবিকার জন্য সাগরে গিয়ে উপকূলে নিখোঁজ জেলেদের স্বীকৃতি এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা,জলবায়ু অর্থের কত শতাংশ সরাসরি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে ঋণের পরিবর্তে অনুদান ভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে। এবং সর্বোপরি— জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে বেশি অবদান রাখা দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আরও পর্যাপ্ত, পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থ নিশ্চিত করতে হবে।

দাবি আদায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি:
২০২৩ সালে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জলবায়ু ন্যায্যতা সম্মেলন শুরু হয়। এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো করা।
- জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
- এসব ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড (Loss and Damage Fund) বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা প্রদান করা।
প্রতি বছর বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত জলবায়ু ন্যায্যতা সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
এই সম্মেলন জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে দাবি আদায় হবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু সংকট সৃষ্টি করেনি—কিন্তু সংকটের মূল্য দিচ্ছে। উপকূলের মানুষ জমি হারাচ্ছে। নদীপাড়ের মানুষ ঘর হারাচ্ছে। কৃষক ফসল হারাচ্ছে। লবণাক্ততা মিঠা পানি ও কৃষিকে সংকটে ফেলছে। দুর্যোগে অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামোতে বাংলাদেশের জন্য কয়েকশ কোটি ডলারের প্রকল্প অনুমোদিত হলেও, সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সরাসরি ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বার্ষিক জলবায়ু অর্থের প্রয়োজন যেখানে ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি, সেখানে প্রয়োজন ও প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত একটি সহজ প্রশ্ন: যে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তার ঘর যখন নদীতে যায়—তার ক্ষতির দায় কে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণায় নয়; উত্তরটি পৌঁছাতে হবে উপকূলের সেই পরিবারটির দরজায়, যে আজও নিজের হারিয়ে যাওয়া জমির দিকে তাকিয়ে আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
লেখক : শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও গবেষক