ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা

আকাশ আহমেদ
প্রকাশিত: ১০:১৭, ২ নভেম্বর ২০২৬
শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা
সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে হত্যা করে কেউ ধনী হতে পারে না। শিল্প বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে, শ্রমিক বাঁচলে পরিবার বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে

গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন কি শুধুই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কলকাঠি নাড়ছে?

শ্রমিকের ন্যায্য দাবি অবশ্যই আদায় হতে হবে। কিন্তু সেই দাবির আড়ালে যদি সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এসবের পেছনে কারা?
কিছু বিষয় আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

১. শ্রমিকের অধিকার বনাম নৈরাজ্য
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু দাবি আদায়ের নামে রাস্তা অবরোধ, কারখানা ভাঙচুর, আগুন দেওয়া কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২. আগুন ও ধ্বংসের রাজনীতি কার স্বার্থে?
মেট্রোরেলে আগুন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারা এসব ঘটাচ্ছে, কারা উসকানি দিচ্ছে এবং কারা এর সুবিধা নিচ্ছে—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা জাতির সামনে প্রকাশ করা জরুরি।
কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অপরাধী বানানো নয়, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

৩. অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে
দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা দেখেছি, অনেক ঘটনায় রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে, এক পক্ষের ওপর দায় চাপানো হয়েছে। আজ সময় এসেছে সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। কোনো ঘটনা ঘটলেই বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া নয়। প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

৪. শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে শ্রমিকের লাভ কী?
একটি গার্মেন্টস কারখানা শুধু একজন মালিকের সম্পদ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা, তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের খাবার এবং দেশের অর্থনীতি।
একটি শতকোটি টাকার কারখানা ভেঙে ফেললে পরদিন সেই শ্রমিকদের বেতন দেবে কে? যাঁরা উসকানি দেন, তাঁরা কি সেই শ্রমিকদের পরিবারের দায়িত্ব নেবেন?
মনে রাখতে হবে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে মালিকের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিকরাই।

৫. শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘশ্বাসও শুনতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করা একজন তরুণকে ১৫-২০ হাজার টাকার একটি চাকরির জন্য কত জোড়া জুতা ক্ষয় করতে হয়, তা আমরা জানি। সেখানে একটি চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট করা কতটা আত্মঘাতী, একবার ভেবে দেখুন।

যে শিল্প আমাদের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে—সেই শিল্পকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

৬. আলোচনার টেবিলই হোক দাবি আদায়ের পথ
শ্রমিকদের দাবি থাকতেই পারে, মালিকপক্ষের সমস্যাও থাকতে পারে। নিম্নতম মজুরি বোর্ড, শ্রম মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
সরকারেরও উচিত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নতুন সরকারকে কাজ করার জন্য যৌক্তিক সময় দিতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে। আন্দোলনের নামে সহিংসতা যেমন চলতে পারে না, তেমনি শ্রমিকের ন্যায্য দাবিও উপেক্ষা করা যায় না।

৭. রাজনীতির নামে নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করবেন না
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, আন্দোলন হবে, দাবি আদায় হবে। কিন্তু দেশকে অস্থিতিশীল করে, নিজের কর্মস্থলে আগুন দিয়ে, নিজের জীবিকার উৎস ধ্বংস করে কারও প্রকৃত কল্যাণ হয় না।

যাঁরা অতীতের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিচারের দায়িত্ব আইনের। কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতিতে দেশে নতুন করে অরাজকতা সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই—
সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে হত্যা করে কেউ ধনী হতে পারে না। শিল্প বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে, শ্রমিক বাঁচলে পরিবার বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে দাবি আদায়ের নামে আগুন জ্বলবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাবেন, মালিক নিরাপদে শিল্প পরিচালনা করবেন, তরুণেরা কর্মসংস্থান পাবেন এবং সাধারণ মানুষ শান্তিতে জীবনযাপন করবেন।

দেশটি কোনো রাজনৈতিক দলের একার সম্পত্তি নয়। দেশটি ১৮ কোটি মানুষের।

মনে রাখবেন, দেশ ধ্বংস হলে কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো মালিক কিংবা কোনো শ্রমিক আলাদাভাবে নিরাপদ থাকবে না।
আসুন, ধ্বংসের রাজনীতি নয়—উৎপাদনের রাজনীতি করি। প্রতিহিংসা নয়—ন্যায়বিচার চাই। অরাজকতা নয়—শৃঙ্খলা চাই।
দেশপ্রেম শুধু স্লোগানে নয়, দেশের সম্পদ রক্ষা করার মধ্যেও প্রকাশ পায়।

লেখক : আকাশ আহমেদ, প্রাবন্ধিক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!