আজাদ-নাগিবদের খুন করলে কার ক্ষতি?
মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে খুন হওয়ার তালিকা অনেক লম্বা। এসব খুনের কারণে মুসলিমরা ব্যাপকভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মুসলিম মৌলবাদীদের হঠকারীতায় ইসলামি স্বর্ণযুগের মৃত্যু হয়। জ্ঞান চর্চার পথ থেকে অন্য কেউ এসে তাদের থামিয়ে দেয়নি।
আমরা দেখেছি আলেকজান্দ্রিয়ায় ইহুদি হাইপেশিয়াকে হত্যা করে খ্রিস্টান মৌলবাদীরা এবং তারা প্রথম বারের মতো আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি জ্বালিয়ে দেয়। মুসলিমদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। তাদের মধ্য থেকে উত্থাপিত মৌলবাদই মুসলিমদের হত্যা করে এবং জ্ঞানার্জনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়।
ইরানে দীর্ঘকালই জ্ঞানচর্চা হচ্ছিল। ইরানের অন্যতম জ্ঞানি ছিলেন আলি দস্তি। তাঁকে হত্যা করে ইরানি বিপ্লবের শাসকগোষ্ঠী। কয়েক বছর আগে দেখলাম প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক দারিউস মেহেরজুইকে সস্ত্রীক হত্যা করতে। আলি দস্তি এবং দারিউসকে মৌলবাদী গুপ্ত ঘাতকরাই হত্যা করে। তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা শাসকদের ইচ্ছাতেই খুনের শিকার হয়েছেন।
ইরানি চলচ্চিত্রে বহু বিখ্যাত পরিচালক এসেছেন। সাম্প্রতিক শাসকদের চাপে সেই ধারাটাও সচল ছিল না। 'দ্য কাউ' চলচ্চিত্রের নির্মাতা ছিলেন ইরানি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের নির্মাতাদের শেষদের একজন। এরপরে আস্তে আস্তে এই স্বর্ণযুগটিও শেষ হয়ে গেল।
পাকিস্তানে মৌলবাদীরা খড়গহস্ত হয়ে উঠেছিল পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামের উপর। তিনি কাদিয়ানী মুসলিম ছিলেন সেটাই ছিল তাঁর অপরাধ। তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। মৃত্যুর শিকার না হওয়ায় তিনি পদার্থবিদ্যায় অমূল্য অবদান রাখতে সক্ষম হন এবং নোবেল বিজয় লাভ করেন। এই নোবেল বিজয় মৌলবাদী পাকিস্তানিদের মধ্যে কোন আনন্দ উচ্ছ্বাস বয়ে আনেনি।
জ্ঞানের জগতে কারো উত্থান ঘটলেই মৌলবাদ ও রাষ্ট্রশক্তি একসাথেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে এদেশের মৌলবাদীরা ড. হুমায়ুন আজাদসহ বেশ কয়েকজন প্রাজ্ঞ-পণ্ডিতকে হত্যা করেছেন। ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যে হুমায়ুন আজাদ নিরলস কাজ করে যাচ্ছিলেন।
সমাজ প্রগতিতে তিনি বিপুল অবদান রাখছিলেন। মানুষ অনন্য এই বুদ্ধিজীবীর লেখার দিকে চেয়ে থাকতো। বিজ্ঞানমনষ্ক সমাজ গঠনে তারা কাজ করছিলেন। তাঁকে যারা হত্যা করলেন, তারাও মুসলিম। বুকারর্স অব বুকার বিজয়ী সালমান রুশদিকে বহুবারই হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। ভারত ছেড়েছেন এবং ইসলামও ছেড়েছেন শেষ পর্যন্ত। তাঁর মিডনাইট চিলড্রেন নিয়ে মুসলিমরা অহঙ্কারই করতে পারতো। তার উপর নিপীড়ন করে মুসলিমদের কোন লাভই হয়নি। তাঁর 'স্যাটানিক ভার্সেস' কোনো জঙ্গির পক্ষেই পড়ে বোঝা সম্ভব নয়৷
মিশরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজ লিখেছেন ৩০টি উপন্যাস ও শতাধিক ছোটগল্প। এরমধ্যে কায়রো ট্রিলজি তাকে লেখক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয় এবং এ উপন্যাসের জন্যই তিনি ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তবে তিনি আলোচিত হন ‘চিল্ড্রেন অব গেবেলাই‘ এর জন্য।
এ উপন্যাসটি তাঁকে মৃত্যু ঝুঁকিতেও নিয়ে আসে। মিশরের একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি ছাপা হচ্ছিল। কয়েক পর্ব প্রকাশিত হলেই আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শায়খ এর তীব্র বিরোধীতা করে। তারা নাগিবকে নাস্তিক ঘোষণা দেয় এবং কাফেরসহ নানা অপবাদ দেয়।
১৯৬৬ সালে উপন্যাসটি লেবাননে প্রকাশিত হলেও মিশরে প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। বইটির কয়েকটি চরিত্র নিয়ে শায়খগণ আপত্তি করে প্রচারণা চালায়। শায়খগণ দাবী করেন লেখক উপন্যাসের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসুলগণকে হেয় করেছেন। তারা লেখককে হত্যা করা ওয়াজিব বলে ঘোষণা দেন।
স্বাভাবিকভাবেই নাগীব নিজেই শায়খদের ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেন। সাহিত্য-সমালোকগণও শায়খদের উপলব্ধিকে ভুল আখ্যা দেন। তারা মনে করেন শায়খগণ উপন্যাসটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। বইটির অন্তর্নিহিত মর্ম উপলব্ধি না করেই লেখককে নাস্তিক ও কাফের আখ্যা দেয়া হয়েছে। শায়খদের আহবানে সাড়া দিয়ে দুজন যুবক নাগিব মাহফুজকে হত্যার জন্য তার ঘাড়ে ছুড়ি চালায়।
তিনি তাৎক্ষণিক প্রাণে বেঁচে যান। পুলিশ সেই যুবকদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায় যে, তারা বইটির একটি অক্ষরও পড়েনি। লেখকের নিকট ওই দুই যুবককে আনা হলে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের শাস্তির আওতায় না আনার আহবান জানান। কিন্তু এই আঘাতের পরিণতি হয় মারাত্মক। তাঁর ঘাড়ের কয়েকটি রগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাঁর লেখালেখি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
তিনি বেশ কিছুদিন অসুস্থ্য থেকে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। হুমায়ুন আজাদও এমন এক হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন। চিকিৎসার পরে তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য জার্মাণিতে যান এবং সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
দুটি মৃত্যুই হয়েছে মৌলবাদদের আঘাতের ফলে। বিস্ময়কর যে, হুমায়ুন আজাদের খুনিরাও তাঁর বই পড়েনি। শায়খ আব্দুর রহমান নির্দেশেই তাঁকে হত্যা করা হয়। সংসদে দাঁড়িয়ে আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী হুমায়ুন আজাদকেও হত্যার আহ্বান জানান৷
বাংলাদেশে শামসুর রাহমানকেও থাকতে হয়েছে হত্যার হুমকির মধ্যে।
জাহানারা ইমাম ও তসলিমা নাসরিনের মতো মহীয়সী নারীর প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের আচরণ বাংলাদেশে নারী জাগরণকে বাধাগ্রস্থ করেছে। যদি মুক্তভাবে চিন্তা করা না যায়, স্বাধীনভাবে লেখা না যায় তবে সে জাতির মধ্যে কোন লেখক ও চিন্তাশীল মানুষের উদ্ভব ঘটবে না।
মুসলিমদের পক্ষে চিন্তা করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একেকজন চিন্তাশীল মানুষকে বলে দিচ্ছে, কিভাবে চিন্তা করতে হবে। সম্প্রতি পাকিস্তানে প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক শের আলিকে ধরে এনে ক্ষমা চাওয়ানো হল। তাঁকে দিয়ে বলানো হল, বিবর্তনবাদ ভুল, নারীরা পুরুষের তুলনায় কম মেধাবী। এটা চারশ বছর আগের সেই গ্যালিলিওর ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়।
খ্রিস্টান মৌলবাদীরাও এমনিভাবে অপদস্ত করেছিল গ্যালিলিওকে। এরপরই মৌলবাদ বিরোধী একটি জাগরণ দেখি এবং তাতে মৌলবাদ ধ্বসে পড়ে। মুসলিম মৌলবাদীরা বিস্ময়করভাবেই মুসলিম জ্ঞানীদের প্রতি নিদারুণভাবে খড়গহস্ত। একের পর এক খুন করছে শ্রেষ্ঠ মুসলিম গবেষক ও সাহিত্যিকদের।
যে মৌলবাদের উত্থানে ইসলামি স্বর্ণযুদের পতন ঘটেছিল সেই ধারাকে আমরা ৮শ বছরেও থামিয়ে দিতে পারিনি। মৌলবাদ মুসলিমদের জাতিগতভাবেই হত্যা করেছে, জ্ঞানচর্চার উপর আঘাত হেনে। আজ তাদের পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে অন্যদের উপর। আজাদ, নাগিব, দারিউসদের হত্যা মুসলিমদের জন্য বয়ে এনেছে মারাত্মক ক্ষতি।
তাদের শত শত বছর পিছিয়ে দিয়েছে কট্টর মৌলবাদ। এই ধারা বদলাতেই হবে। মুসলিমরাও যদি মৌলবাদ বিরোধী জাগরণ না ঘটাতে পারে তবে তারা কেবল পিছিয়ে পড়তেই থাকবে। সচেতন মুসলিমদের দায়িত্ব রয়েছে, মৌলবাদকে থামানোর৷
লেখক : মুজিব রহমান, সমাজ চিন্তক ও কলামিস্ট
বি:দ্র: লেখায় উপস্থাপিত মতামত, তথ্য, যুক্তি লেখকের নিজস্ব। সম্পাদক দায়ী নন।