ঢাকা,  বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

ধর্ম- বিরোধের অস্ত্র নয়, মানুষের কল্যাণের শিক্ষা হোক

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৩৬, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ধর্ম- বিরোধের অস্ত্র নয়, মানুষের কল্যাণের শিক্ষা হোক
রাজনৈতিক দল বা মতের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দেওয়ার কথাও আমার মনে পড়ে না। তাঁরা কাউকে অপমান করে কিংবা অন্যের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন না।

আজ একজন শিক্ষার্থী আমাকে একটি প্রশ্ন করেছে। প্রশ্নটি তীক্ষ্ণ, কিন্তু এর মধ্যে সমাজের একটি গভীর অসংগতির অভিযোগ রয়েছে। তার প্রশ্নের সারকথা হলো, যারা সমাজে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের মধ্যে কেউ যদি শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন বা বলাৎকারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তখন তাঁদের অবস্থান কী হবে? 

অপরাধীর পরিচয় কি তখন ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? নাকি ধর্মীয় পরিচয়নির্বিশেষে অপরাধের বিচার চাইতে হবে?

প্রশ্নটি আমাকে ভাবিয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিকে ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা, অভিযোগ ও বিতর্ক লক্ষ করছি। বিশেষ করে শিশু ও শিক্ষার্থীদের চুম্বন করার বিষয়টি গণমাধ্যমে বারবার সামনে আসায় আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, হঠাৎ এমন আচরণ এত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল কেন? 

এটি কি নিছক স্নেহ প্রকাশ, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর আড়ালে অনুপযুক্ত আচরণও রয়েছে? শুধু দৃশ্য দেখে সবকিছুকে এক করে ফেলা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো আচরণকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও বিপজ্জনক।

শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশে আপত্তি নেই। কিন্তু স্নেহেরও সীমা আছে, শিশুর ব্যক্তিগত পরিসর ও নিরাপত্তার অধিকার আছে। কোনো আচরণ অনুপযুক্ত বা নির্যাতনমূলক কি না, তা বিচার করতে হবে তার প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট এবং শিশুর নিরাপত্তা ও সম্মতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে এই বিচারের বাইরে রাখতে পারে না।

আমার নিজের শৈশবের স্মৃতিতে এমন কোনো ঘটনা নেই, যেখানে কোনো শিক্ষক আমাকে চুম্বন করে আদর করেছেন। অন্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এমন কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে শিক্ষকরা মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ প্রকাশ করতেন। 

বাংলাদেশের স্কুলজীবনে মৌলভি শিক্ষকদের কাছ থেকেও এমন আচরণই দেখেছি। তাই আজকের আলোচনাগুলো আমাকে আমার অতীতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আমার স্মৃতিতে দুই আদর্শ আলেম
মনে পড়ছে আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেখা দুজন মানুষের কথা। তাঁরা ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষক, কিন্তু তাঁদের পরিচয় কেবল ধর্মীয় পদবি বা পোশাকে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, কোমল আচরণ, সততা ও ন্যায়বোধের মধ্য দিয়েই তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমি যখন গঙ্গারামপুর প্রশন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়তাম, তখন মৌলানা মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন আমার শিক্ষক। এলাকায় তিনি বড় হুজুর বা পীর সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। আরেকজন ছিলেন মৌলানা শাহ সুফি বজলুর রহমান সাহেব, যাঁকে সবাই ধলা হুজুর বলে চিনতেন।

  • আমাদের পাশের গ্রাম পানিঘাটায় তাঁদের বসবাস ছিল। আশপাশের বিশ-ত্রিশটি গ্রামের মানুষের কাছে দুজনই ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত, শ্রদ্ধেয় ও নির্ভরতার মানুষ। বিপদে-আপদে, অসুখে-বিসুখে মানুষ তাঁদের কাছে ছুটে যেত।

বড় হুজুরের পীর পরিচয় কোনো তথাকথিত পীর বংশের সূত্রে আসেনি। মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ও শ্রদ্ধা করে পীর সাহেব বলে ডাকত। তিনি গঙ্গারামপুর হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। একই সঙ্গে আমাদের এলাকার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন। তাঁর ইমামতিতে নামাজ পড়তে আশপাশের দশ-বিশটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতেন।

ধলা হুজুর ছিলেন নহাটা ফাজিল মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক। তিনিও পানিঘাটার বিশাল ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন।

তাঁদের দুজনকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। কখনো তাঁদের শিশুদের চুম্বন করতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু মানুষের প্রতি তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জনের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। 

তাঁদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। তাঁদের জীবন ও আচরণই ছিল সেই ভালোবাসার ভিত্তি।

একটি গ্রামের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ যেভাবে থেমে গিয়েছিল
ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় ঢাল-শড়কি নিয়ে দলবদ্ধ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। একবার মাঠের দুই পাশে শত শত মানুষ ঢাল, শড়কি, রামদা, বল্লম ও তীর-ধনুক নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। উত্তেজনা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে আশপাশের গ্রামের মুরুব্বিরা অনেক চেষ্টা করেও পরিস্থিতি শান্ত করতে পারছিলেন না।

মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে একটি রক্তক্ষয়ী গ্রামীণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ঠিক সেই সময় মাঠের পাশে এসে থামল একটি গরুর গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলেন বড় হুজুর, মৌলানা মহিউদ্দিন পীর সাহেব।

  • তাঁকে দেখেই মানুষ থমকে দাঁড়াল। তিনি সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর কথায় উত্তেজিত মানুষগুলো ফিরে যেতে শুরু করল। যে সংঘর্ষকে কেউ থামাতে পারছিল না, তা থেমে গেল তাঁর উপস্থিতি ও কথার প্রভাবে।

একটি গ্রাম রক্ষা পেল সম্ভাব্য রক্তপাত থেকে। আজ এত বছর পর ঘটনাটি মনে করলে আমি ভাবি, একজন মানুষের মধ্যে এমন কী শক্তি ছিল, যার সামনে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো মানুষও থেমে যেতে বাধ্য হয়েছিল?

সেটি কি ভয় ছিল? আমার স্মৃতি বলে, সেটি ছিল শ্রদ্ধা। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করত। জানত, তিনি কারও শত্রু নন, কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য আসেননি। তিনি এসেছিলেন মানুষকে রক্ষা করতে।

এই বিশ্বাস কোনো এক দিনের অর্জন ছিল না। দীর্ঘদিনের সততা, সংযম, মানবিকতা ও নিরপেক্ষ আচরণের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয়ে সেই স্থান তৈরি করেছিলেন।

ধর্মীয় সভা, কিন্তু বিদ্বেষের ভাষা নয়
তখন আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে নহাটা মাদ্রাসায় বার্ষিক ইসলামী ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হতো। বড় হুজুর ও ধলা হুজুর যখন ওয়াজ করতেন, হাজার হাজার মানুষ নীরবে তাঁদের কথা শুনতেন।

আমার স্মৃতিতে তাঁদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য, নৈতিকতা, আমল, আকিদা, হাদিস ও কোরআনের ব্যাখ্যা। তাঁরা মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব, সততা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা জাগিয়ে তুলতেন। তাঁদের কথা বলার ভঙ্গি ছিল কোমল, মৃদু ও আন্তরিক।

তাঁদের বক্তব্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা আমি দেখিনি। রাজনৈতিক দল বা মতের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দেওয়ার কথাও আমার মনে পড়ে না। তাঁরা কাউকে অপমান করে কিংবা অন্যের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন না।

তাঁদের আচরণ ছিল অমায়িক। মানুষ কিংবা পালিত পশুপাখির সঙ্গে তাঁরা উচ্চস্বরে বা কটু ভাষায় কথা বলতেন, এমন দৃশ্য আমার মনে পড়ে না। তাঁরা ছিলেন এমন মানুষ, যাঁদের কাছে গেলে মানুষ সান্ত্বনা ও ভরসা পেত।

আমার স্মৃতিতে তাঁদের ওয়াজের সঙ্গে অর্থ সংগ্রহের কোনো বিষয়ও জড়িত নেই। ওয়াজ করার জন্য তাঁরা পারিশ্রমিক নিতেন না, আর প্রতিষ্ঠানের জন্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলেও আমার মনে পড়ে না।

আমি তাঁদের জীবনকে আদর্শ বলে মনে করি। কারণ, তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় মানুষের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধকে কখনো আড়াল করেনি। বরং সেই পরিচয় তাঁদের আরও সংযত, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছিল।

আজকের বিতর্ক আমাকে যে প্রশ্নগুলো করতে বাধ্য করছে
আজ বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিকে ঘিরে যখন অনৈতিক আচরণের অভিযোগ, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা ধর্মীয় বক্তব্যের নামে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ সামনে আসে, তখন বড় হুজুর ও ধলা হুজুরের কথা আরও বেশি মনে পড়ে।

আমি সব আলেম বা মৌলভিকে এক পাল্লায় মাপতে চাই না। আজও নিশ্চয়ই অনেক ধর্মীয় শিক্ষক সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অবদানকে অস্বীকার করা অন্যায় হবে।

কিন্তু কিছু মানুষের আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার হওয়া জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না, আবার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়াও চলবে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে পরিচয়, পদবি, জনপ্রিয়তা কিংবা ধর্মীয় প্রভাবনির্বিশেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কখনো কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় দেখে পক্ষ বেছে নেয়। নিজের পক্ষের মানুষ অন্যায় করলে নীরব থাকা, আর প্রতিপক্ষের মানুষ একই কাজ করলে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া ন্যায়বিচার নয়। এটি দ্বিচারিতা।

যাঁরা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, তাঁদের কাছেও আমার প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের নীতি কি সবার জন্য সমান হবে? ধর্মীয় পরিচয়ধারী কেউ অন্যায় করলে তাঁর বিচারও কি একই নীতিতে হবে? আইন ও নৈতিকতার দাবি কি কেবল অন্যের জন্য, নাকি নিজের পক্ষের মানুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য?

  • ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে ধর্মের নামে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ আরও কমে আসার কথা। কারণ, কোনো ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে অন্যায়ের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
  • কেউ অপরাধ করার পর শয়তানের প্ররোচনার কথা বলতে পারেন। কিন্তু এমন ব্যাখ্যা অপরাধের দায় মুছে দেয় না। অনুশোচনা ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে ন্যায়বিচার, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা শুধু ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে নয়। সেই শিক্ষা নিজের জীবনে পালন করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নিজের ঘনিষ্ঠজন অন্যায় করলেও ন্যায়ের পক্ষে থাকা, এসবের মধ্য দিয়েই একজন মানুষের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়।

সমাজের দরকার ভয় নয়, বিশ্বাস

  • একজন ধর্মীয় শিক্ষক যখন মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়ান, অন্যের প্রতি সহিংসতার আহ্বান জানান কিংবা অন্যায়কারীর পরিচয় দেখে তাঁর পক্ষ নেন, তখন তিনি শুধু নিজের মর্যাদাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেন না। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসও দুর্বল করে দেন।

অন্যদিকে, একজন সত্যিকারের ধর্মীয় শিক্ষক মানুষকে সংযম শেখান, অন্যায় থেকে বিরত রাখেন, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ান এবং বিরোধের সময় শান্তির পথ দেখান।

বড় হুজুর ও ধলা হুজুরের মধ্যে আমি সেই শিক্ষাই দেখেছিলাম। তাঁদের প্রভাবের ভিত্তি ছিল না চিৎকার, হুমকি কিংবা বিদ্বেষ। ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, চরিত্রের দৃঢ়তা ও দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাস।

  • আজ তাঁদের কথা মনে পড়লে শুধু অতীতের স্মৃতিতে আবেগাপ্লুত হই না। বর্তমানের জন্যও একটি শিক্ষা খুঁজে পাই। সমাজকে শান্ত রাখতে হলে এমন মানুষ দরকার, যাঁদের কথা মানুষ বিশ্বাস করবে। 

যাঁরা বিরোধকে সংঘর্ষে পরিণত হতে দেবেন না। যাঁরা ধর্মের শিক্ষা দিয়ে মানুষের মধ্যে নৈতিকতা জাগিয়ে তুলবেন, কাউকে ঘৃণা করতে শেখাবেন না।

আমাদের দরকার এমন ধর্মীয় নেতৃত্ব, যাঁরা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে পারবেন, অন্যায়ের বিচার চাইতে পারবেন এবং নিজের পক্ষের মানুষ অপরাধ করলেও ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করবেন না।

শেষ কথা
আজ এত বছর পরও বড় হুজুর ও ধলা হুজুরকে মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তাঁরা হয়তো কোনো বড় পদে ছিলেন না, আধুনিক গণমাধ্যমে তাঁদের পরিচিতিও ছিল না। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তাঁরা যে স্থান করে নিয়েছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের প্রকৃত অর্জন।

আমি তাঁদের কাছ থেকে শিখেছি, ধর্মীয় মানুষের মর্যাদা শুধু তাঁর জ্ঞান, পোশাক, পদবি কিংবা বক্তৃতার জোরে নির্ধারিত হয় না। তাঁর ব্যবহার, সততা, সহনশীলতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই সেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের বিতর্কের মধ্যে তাই আমার প্রশ্ন কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও নয়। আমার প্রশ্ন সেই আচরণের বিরুদ্ধে, যা মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, অন্যায়কে আড়াল করে এবং ধর্মের নামে বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয়।

  • ধর্মীয় শিক্ষক হোন কিংবা সাধারণ মানুষ, অন্যায় করলে জবাবদিহি করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে। আর মতভেদ থাকলেও মানুষে মানুষে সম্মান ও শান্তি বজায় রাখতে হবে।

আমার শৈশবের সেই দুই আলেম আজও আমাকে মনে করিয়ে দেন, মানুষের হৃদয় জয় করতে ঘৃণার প্রয়োজন হয় না। অস্ত্রধারী মানুষের হাত থামাতেও সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি সৎ চরিত্র, একটি বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠ এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই যথেষ্ট।

আজ আমাদের সমাজে এমন মানুষই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যাঁরা ধর্মকে বিরোধের অস্ত্র নয়, মানুষের কল্যাণের শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরবেন। যাঁরা মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বিশ্বাস তৈরি করবেন। যাঁদের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও মানুষের নিরাপত্তা।

লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!