ঢাকা,  বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মস্তিষ্ক আঘাত পেতে জানে, বিশ্বাস করতেও শেখে

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১০:৪৮, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
মস্তিষ্ক আঘাত পেতে জানে, বিশ্বাস করতেও শেখে
বিশ্বাস ভাঙলে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, কারণ মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। তবে সেই কষ্ট কতদিন থাকবে, তা অনেকটাই আমাদের সচেতন চেষ্টার ওপর নির্ভর করে

মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ অন্যের ওপর ভরসার ওপর নির্ভর করে। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীকে বিশ্বাস করলে মস্তিষ্ক তাঁদের নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করে। তাঁদের সঙ্গে থাকলে স্ট্রেসও কম থাকে। তাই বিশ্বাস শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি টিকে থাকার একটি জৈবিক কৌশলও।

প্রিয় কারও কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা পেলে বুকে চাপ, হাত-পা কাঁপা বা ঘুম না আসার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক এটিকে শুধু একটি চিন্তা হিসেবে নেয় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক আঘাতের সময় আমাদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স বা ACC সক্রিয় হয়। শারীরিক ব্যথা পেলেও এই অংশটিই সক্রিয় হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক বিশ্বাস ভাঙাকে সত্যিকারের আঘাত হিসেবেই প্রক্রিয়া করে।

দুটি মানসিক পক্ষপাত এই কষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
প্রথমটি নেগেটিভিটি বায়াস। এতে মস্তিষ্ক সবকিছু নেতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করে। একটি খারাপ ঘটনাকেই তখন পুরো সম্পর্ক বা ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনার প্রমাণ মনে হয়।

দ্বিতীয়টি কনফার্মেশন বায়াস। আমরা অজান্তেই এমন স্মৃতি ও প্রমাণ খুঁজতে থাকি, যা দেখায় যে ক্ষতিটা আরও বড় ছিল। সঙ্গে চলে রুমিনেশন, অর্থাৎ একই ঘটনা বারবার ভাবা। শান্ত হতে চাইলেও মস্তিষ্ক পুরোনো স্মৃতি সামনে এনে কষ্টকে দীর্ঘায়িত করে।

মস্তিষ্ক বনাম কম্পিউটার

হরমোন ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পরিবর্তন
এই অভিজ্ঞতা শুধু চিন্তায় সীমাবদ্ধ থাকে না, শরীরের রসায়নেও পরিবর্তন আনে।

• স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেড়ে যায়। ফলে অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা ও মনোযোগের অভাব দেখা দেয়।

• ডোপামিন পাথওয়ের কার্যক্রম কমে যায়। এটি সাধারণত আনন্দ ও প্রেরণার অনুভূতি দেয়। তাই যাঁর সঙ্গে আগে ভালো লাগত, তাঁর স্মৃতিও আর আনন্দ দেয় না।

• অ্যামিগডালা অতি সক্রিয় হয়। এটি বিপদ শনাক্ত করে, তাই পরিচিত মানুষের স্মৃতিকেও মস্তিষ্ক বিপদ সংকেত হিসেবে দেখে।

• প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, অর্থাৎ মস্তিষ্কের যুক্তিবাদী অংশ, আবেগের চাপে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
এর ফলে কখনো রাগ, কখনো অতিরিক্ত উদ্বেগ, আবার কখনো ভেঙে পড়ার অনুভূতি তৈরি হয়।

Brain Development Food: কম্পিউটারের চেয়েও 'ফাস্ট' কাজ করবে ব্রেন! রোজ পাতে  রাখুন 'এই' খাবার, সন্তানের রেজাল্ট হবে তুখোড় Brain Development Foods for  Memory power expert brain ...

ঘুরে দাঁড়ানোর উপায়গুলো: 

ভালো খবর হলো, মস্তিষ্ক নমনীয়। এই বৈশিষ্ট্যের নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি। এর মানে, মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং নতুন করে শিখতে পারে। সুস্থ হওয়ার মূল ভিত্তি এটিই।

ঘটনাটিকে নতুনভাবে দেখা। নিজেকে সচেতনভাবে বলা যায়, "এটি একটি ঘটনা, পুরো পৃথিবী নয়।" মনোবিজ্ঞানে একে রিফ্রেমিং বলে। এটি প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করে। তখন আবেগের তীব্রতা কমে এবং পরিস্থিতিকে যুক্তি দিয়ে দেখা সহজ হয়।

বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো। কাছের ও নির্ভরযোগ্য মানুষের সঙ্গে থাকলে অক্সিটোসিন, অর্থাৎ বন্ধন তৈরির হরমোন, আবার বাড়ে। এটি নিরাপত্তা ও সংযোগের অনুভূতি ফিরিয়ে আনে।

শুধু ব্রাহ্মীশাক নয়, স্মৃতিশক্তি থেকে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এই ৪  খাবার | What are the best brain boosting foods, check details | TV9 Bangla  News

শরীরের যত্ন নেওয়া। নিয়মিত ঘুম, হাঁটা ও গভীর শ্বাসের অনুশীলন কর্টিসল কমাতে সাহায্য করে।

বিশ্বাস ভাঙার পর কষ্ট কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস থাকতে পারে, ঘটনার গুরুত্ব ও মানুষভেদে এটি আলাদা হয়। তবে ঘুম, খাওয়া, কাজ বা পড়াশোনা ব্যাহত হলে, সারাক্ষণ একই চিন্তা ঘুরপাক খেলে, কিংবা কোনো কিছুতেই আগ্রহ না থাকলে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা ভালো।

থেরাপির মাধ্যমে রুমিনেশন কমানো এবং চিন্তার ধরন বদলানো শেখা যায়। নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে অবিলম্বে কাছের কাউকে বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, এটি সুস্থ থাকার একটি কার্যকর পদক্ষেপ।

বিশ্বাস ভাঙলে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, কারণ মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। তবে সেই কষ্ট কতদিন থাকবে, তা অনেকটাই আমাদের সচেতন চেষ্টার ওপর নির্ভর করে। মস্তিষ্ক যেমন আঘাত পেতে জানে, তেমনি আবার বিশ্বাস করতেও শেখে। নিজেকে সময় দিন এবং ধৈর্যের সঙ্গে যত্ন নিন। মানসিক স্থিতি ধীরে ধীরে ফিরে আসে।

লেখক : আল মামুন রিটন, তথ্যউৎস: বায়োজন, মেডিয়াম

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!