ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

আগামী গ্রীষ্মের আগেই গ্রিডে যুক্ত হবে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৪৮, ৩ নভেম্বর ২০২৬
আগামী গ্রীষ্মের আগেই গ্রিডে যুক্ত হবে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান/ছবি: সংগৃহীত

আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এ সোলার এক্সপোর আয়োজন করা হয়েছে। নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সোলার এক্সপোতে দেশের বিভিন্ন এলাকার উদ্যোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব, এ আয়োজন তার প্রমাণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা। এ খাতে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে কয়েকজন পুরস্কৃত হয়েছেন। প্রতিযোগিতায় অন্তত ৩০০ তরুণ-তরুণী নতুন ধারণা তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশে জ্ঞানের পাশাপাশি উদ্ভাবনী ধারণার প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। একটি নতুন ধারণাই দেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। অর্থের অভাবে যেন তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী উদ্যোগ হারিয়ে না যায়, সে জন্য চলতি বাজেটে স্টার্টআপ খাতে বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর করে ফেলার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

তিনি জানান, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরেও প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজেলের মজুত বাড়ানো হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এরই মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় না দিয়ে আগামী দিনের চাহিদা পূরণ এবং বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকার একযোগে কাজ করছে।

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিনবে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায়

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিসহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী জানান, নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে তা কিনবে।

তিনি বলেন, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে এরই মধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানানোর আগে নিজেও বাসায় সৌরপ্যানেল স্থাপন করেছেন। বাসায় ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতেও সক্ষম হয়েছেন।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি যন্ত্রপাতির দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, জনগণের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।

৮ হাজারের বেশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান

সৌরবিদ্যুৎ খাতে যুক্ত ৮ হাজারের বেশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সৌরবিদ্যুতে চলবে কৃষকের সেচপাম্প

কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পকে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব। অন্যদিকে বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্ব। দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার এবং বাসা, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি।

উন্নয়ন সহযোগী ও প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজ করা উন্নয়ন সহযোগীদের স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের সহজ সুযোগ তৈরির কথাও বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সোলার এক্সপো যেন শুধু দুই দিনের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এ আয়োজন থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে না।

সবাইকে সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

পরে প্রধানমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!