বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ৬২ লাখ নারী-পুরুষ
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৬২ লাখ নারী-পুরুষকে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে চলতি বছর ভাতার পরিমাণও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।
তিনি বলেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো কিছু যোগ্য প্রবীণ বয়স্ক ভাতার আওতার বাইরে রয়েছেন। ভবিষ্যতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লে যোগ্য সব প্রবীণকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, প্রতি বছর ধীরে ধীরে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। একসময় ৬০ লাখ প্রবীণ এ সুবিধা পেতেন। পরে উপকারভোগীর সংখ্যা ৬১ লাখে উন্নীত করা হয়। চলতি বছর আরও এক লাখ মানুষকে যুক্ত করায় বর্তমানে মোট ৬২ লাখ প্রবীণ বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়স হলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার জন্য আবেদন করা যায়। তবে নির্ধারিত বয়সসীমা পূরণ করলেই সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ সুবিধা পান না। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার বিষয় রয়েছে। আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
সচিব বলেন, বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে বয়স্ক ভাতার জন্য কিছু আবেদন রয়েছে, যেগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে বাজেট সক্ষমতা বাড়লে পর্যায়ক্রমে সব যোগ্য ব্যক্তিকে কর্মসূচির আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠী দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান। কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ সমাজে একজন মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে এ ভাতা সহায়তা করছে। একই সঙ্গে পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং তাদের আত্মমর্যাদা বজায় রাখতেও এ কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে।
প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়বে। তাই তাদের সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রবীণদের যাতায়াতের সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, রেল, মেট্রোরেলসহ কিছু গণপরিবহন ব্যবস্থায় তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রবীণদের জন্য ২৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
সচিব বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রবীণদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, নিরাপদ আবাসন, বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা পরিবার ও সমাজে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের কল্যাণে সরকারের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোয় প্রবীণদের সম্মান ও দেখাশোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এ মূল্যবোধ ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
অনেক প্রবীণ এখনো শারীরিকভাবে সক্ষম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে প্রবীণরা যেমন সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারবেন, তেমনি নবীন প্রজন্মও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।
বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়ে সচিব বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, বয়স্ক ভাতার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারভোগীদের ভাতার পরিমাণও পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। চলতি বছর উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ভাতার আওতাও আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, বাজেট বাড়লে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য সব ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
সরকারের এ উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে শুধু ভাতা নয়, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহনে বিশেষ সুবিধা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগসহ সমন্বিত প্রবীণবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।