বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশের মাটিতে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে কষ্টের রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। কিন্তু সেই প্রবাসীদের মধ্যে কেউ বিদেশের মাটিতে মারা গেলে, তখন সেই লাশ বিদেশের কোনো না কোনো হাসপাতালের মর্গে অবহেলায় দিনের পর দিন ও মাসের পর মাস পড়ে থাকে। যেন বিদেশে মরেও শান্তি নেই প্রবাসীদের! মারা যাওয়ার পর প্রবাসীর লাশ হয়ে ওঠে ভোগান্তির অপর নাম, পরিবারের কাছে উৎকণ্ঠা আর আহাজারি।
বিদেশের মাটিতে একজন প্রবাসীর লাশ দেশে ফেরত আনতে ফ্লাইট খরচের টাকা জোগাড়, নিজের দেশ ও দূতাবাসের কাগজপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়া এবং এক গাদা নিয়মকানুন শেষ করে লাশ দেশে আসতে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময়। নিজ দেশের পরিবার–পরিজনের কাছে ততক্ষণে ঐ মৃত্যু সংবাদ হয়তো অনুভূতিশূন্য হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় প্রবাসীদের মৃত্যু সংবাদ সাত–আট দিন এমনকি মাসখানেক পরও এসে পৌঁছায় পরিজনের কাছে। আবার কখনো কখনো বিদেশের মাটিতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে যায় হতভাগ্য প্রবাসীর লাশ।
.png)

জীবিত অবস্থায় কোনো সরকারি সহযোগিতা পায় না, আবার বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হলে সেই লাশটিকেও নিয়ে পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। প্রবাসীদের চাঁদার টাকা ও দেশে থেকে স্বজনদের পাঠানো টাকা না হলে সেসব লাশের ভাগ্যে দেশের মাটি জোটে না। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তায় লাশ ফেলে রেখে স্থানীয় বিদেশিদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে দেশে পাঠানোর বিমান খরচ বহন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন অনেক প্রবাসী।
প্রবাসী কর্মীরা আরো জানান, বিদেশে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর হার এত বেশি কেন তা কখনো খতিয়ে দেখা হয়নি। আবার এত বেশি কর্মী স্ট্রোক অথবা হার্ট অ্যাটাকে কেন মারা যাচ্ছেন তার সঠিক কারণ জানতেও অনুসন্ধান করা হয়নি। তাদের মৃত্যুর কারণে যা লেখা হয় তাও পুনরায় খতিয়ে দেখারও কোনো নজির নেই।
কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ এড়াতেও স্ট্রোকে কিংবা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর কথা ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয় বলেও জানান তারা।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে গত ৩১ বছরে ৫২ হাজার ৩৭১ প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে। এই ৩২ বছরের তথ্যই বোর্ডের কাছে আছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিবছরই লাশের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

২০০৫ সালের পর থেকে দেশে প্রবাসীদের লাশ আসার সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৫ সালে লাশ এসেছে ১ হাজার ২৪৮ জনের, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৪০২, ২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৭৩, ২০০৮ সালে ২ হাজার ৯৮, ২০০৯ সালে ২ হাজার ৩১৫, ২০১০ সালে ২ হাজার ৫৬০, ২০১১ সালে ২ হাজার ৫৮৫, ২০১২ সালে ২ হাজার ৮৭৮, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭৬, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩৩৫, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩০৭, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮১, ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৭৯৩, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৪০ জন, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ জন, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫৫২টি লাশ এসেছে দেশে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ৬৬২টি লাশ এসেছে দেশে।
সবচেয়ে বেশি লাশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে শুধু মাত্র সৌদি আরব থেকেই এসেছে ২৪৬টি লাশ।

কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এর বাইরে অনেক লাশ বিদেশের মাটিতেই দাফন করা হয়। অনেক পরিবার লাশ দেশে আনতে চান না। যার ফলে পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশেই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস। করোনা মহামারির সময়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি ছিল বলেও জানান তারা।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, কোনো রোগে মারা গেলে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে প্রবাসীদের অন্যতম মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দুর্ঘটনা। প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ জানতে সরকারিভাবে কোনো গবেষণা করা হয়নি। তবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত বা ব্রেইনস্ট্রোকের কারণে।
এছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা।
এসব মৃত্যু পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগই মারা গেছেন ৩৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, লাশ দেশে এলে বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে দাফন ও লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় বোর্ডের পক্ষ থেকে।
প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে কাজ করাটা বেশ কঠিন। কারণ যেসব লাশ আসে, সেগুলোর ময়নাতদন্ত হয় ঐ দেশেই। ঐসব দেশের নীতির কারণেই এটা হয়। আর দেশে আসার পর পরিবার আর ময়নাতদন্ত করাতে চায় না। ফলে অজানাই থেকে যাচ্ছে এসব মৃত্যুর সঠিক কারণ।
এ বিষয়ে বিমানবন্দরের অবস্থিত প্রবাসীকল্যাণ ডেক্সের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, প্রবাসীদের মরদেহ নিয়ে ময়নাতদন্ত কেন করা হয় না এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আর প্রবাসীকল্যাণ ডেক্সের কাজ হলো কোনো মরদহ দেশে এলে বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে দাফন ও লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় বোর্ডের পক্ষ থেকে। আমরা তা সঠিকভাবেই পালন করে যাচ্ছি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য মূলত মরু আবহাওয়ার দেশ। প্রচণ্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে অদক্ষ এই বাংলাদেশিরা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, আরেকদিকে অমানুষিক পরিশ্রম, ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণেই সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরোগের মতো ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফেয়ারস্কয়ারের তথ্য মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে মারা যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের ৫০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করা হয় না। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কঠোর পরিশ্রম ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতি, শোষণ, চাপ এবং হিটস্ট্রোকের কারণেও মৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, স্পনসরশিপ ব্যবস্থার কারণে সৌদিতে অভিবাসী কর্মীদের প্রতি নৃশংস আচরণ করা হয়। ফলে প্রবাসী কর্মীরা শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। কখনো কখনো তাদের জোর করে অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হয় কিংবা দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমরা সবসময় বলি প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে। কারণ, আমরা যদি কিছু লাশ স্যাম্পল ধরে গবেষণা করি, তাতে বোঝা যায় যে কী কারণে মারা গেল। আমরা দেখেছি যে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব কর্মী মারা যান, তার বড় কারণ আমাদের কর্মীরা স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন না। ১৮-২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন। আর অবৈধভাবে যাওয়ার ফলে অনেকে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না।
তিনি বলেন, সৌদিতে এখনই বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল সৌদিতে হলে সেখানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এরপর এটা আশঙ্কাজনক হারে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট করা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরই বাংলাদেশি কর্মীরা সেদেশে যেতে পারেন। তাহলে বাংলাদেশি কর্মীরা সেখানে গিয়ে উদ্বেগজনক হারে কেন মারা যাচ্ছেন?