প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়?
দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। যোগাযোগ থেকে শুরু করে অফিসের কাজ কিংবা বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে।
অনেক পুরুষ দিনের বেশির ভাগ সময় মোবাইল ফোন প্যান্টের সামনের পকেটে রাখেন। তবে দীর্ঘ সময় এভাবে ফোন বহন করলে শুক্রাণুর গুণমান বা পুরুষের প্রজননক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হলেও বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। কিছু গবেষণায় মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গ ও তাপের সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আবার অন্য গবেষণায় শুক্রাণুর ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
মোবাইল ফোন কি শুক্রাণুর ক্ষতি করে?
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত, যার শক্তি এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের তুলনায় অনেক কম।
গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা করছেন, এসব তরঙ্গ শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন, জীবিত থাকার হার ও চলাচলের সক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৩৯টি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কমার সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০২৪ সালের আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে অনিশ্চিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সামনের পকেটে ফোন রাখলে ঝুঁকি কতটা?
প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি থাকে। ফলে ফোনের বেতার তরঙ্গ ও উৎপন্ন তাপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে।
তবে ফোন শরীরের কাছাকাছি থাকলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে ফোনের নির্গত শক্তি, ব্যবহারের সময়, সংস্পর্শের মাত্রা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর।
২০২৪ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় সামনের পকেটে ফোন রাখার সঙ্গে শুক্রাণুর সংখ্যা, ঘনত্ব, গঠন, চলাচলের ক্ষমতা কিংবা গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের সম্পর্ক নিয়ে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, পকেটে মোবাইল রাখাকে সরাসরি পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
ফোনের তাপে কি শুক্রাণুর সমস্যা হয়?
স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ও গুণমান প্রভাবিত হতে পারে।
তবে পকেটে রাখা মোবাইল ফোনের তাপে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা এতটা বেড়ে যায় যে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে না রেখে ঠান্ডা হতে দেওয়া ভালো। একই সঙ্গে প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তানির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
শুক্রাণুর গুণমান কমার কারণ কী?
শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, চলাচলের ক্ষমতা হ্রাস কিংবা গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। তবে বীর্য পরীক্ষার একটি ফল অস্বাভাবিক হলেই কাউকে বন্ধ্যা বলা যায় না।
পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় হলো—
-
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
-
অতিরিক্ত মদ্যপান
-
স্থূলতা ও বিপাকীয় সমস্যা
-
হরমোনজনিত জটিলতা ও নির্দিষ্ট সংক্রমণ
-
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
-
অণ্ডকোষের রোগ ও দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ
এ ছাড়া বয়স, বংশগত কারণ এবং জীবনযাপনের বিভিন্ন অভ্যাসও প্রজননক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে করণীয়
প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
ফোন কিছুটা দূরে রাখুন: প্রয়োজন না হলে দীর্ঘ সময় পকেটে ফোন না রেখে ব্যাগে রাখতে পারেন। তবে এতে শুক্রাণুর গুণমান বাড়বে, এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অতিরিক্ত গরম ফোন এড়িয়ে চলুন: চার্জ দেওয়ার সময় কিংবা ভারী কাজের কারণে ফোন গরম হয়ে গেলে শরীরের সঙ্গে চেপে রাখা থেকে বিরত থাকুন।
ধূমপান ছাড়ুন: ধূমপান শুক্রাণুর গুণমান ও প্রজননস্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। তাই ধূমপান ত্যাগ করা উপকারী।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন: সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট নয়: শুক্রাণু বাড়ানোর নামে বাজারে পাওয়া বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাই নিজে থেকে এসব পণ্য গ্রহণ করা উচিত নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর গর্ভধারণ না হলে দম্পতির উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টার পর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পুরুষের ক্ষেত্রে সিমেন অ্যানালাইসিস বা বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন ও চলাচলের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে চিকিৎসক অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে শুধু পকেটে মোবাইল ফোন রাখার কারণে বীর্য পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই।
গবেষণা কী বলছে?
এখন পর্যন্ত পাওয়া বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে শুক্রাণুর ক্ষতি হয় বা বন্ধ্যত্ব দেখা দেয়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য ক্ষতির ইঙ্গিত থাকলেও মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল একরকম নয়। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান পরিহার এবং প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।