ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

পাকশীর পাইলট ট্রেনের ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৫৫, ১১ মার্চ ২০২৪
পাকশীর পাইলট ট্রেনের ইতিহাস
পাকশীর পাইলট ট্রেন- ছবি: সংগৃহীত

কখনো কি বিনা টিকিটে ট্রেনকে যাত্রী টানতে দেখেছেন? বাংলাদেশের আর কোনো জায়গায় না থাকলেও পাবনার পাকশীতে পাইলট নামক ট্রেনে ছিল সেই ব্যবস্থা। রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াত সুবিধার জন্য পাইলট ট্রেনটি চালু হলেও সাধারণ মানুষের এতে যাওয়ার ওপর কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না। তাই বিনা টিকিটে অনেকেই চড়ার সুযোগ গ্রহণ করতেন পাকশী পাইলট ট্রেনে।

টিকিট না থাকলেও পাইলট কিন্তু তার যাত্রীদের অবহেলা করেনি। টিকিট কেটে গাড়িতে চড়ে আপনি যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না, পাইলট ট্রেনটি সেই সুযোগ দিয়েছে। সেটি হচ্ছে ট্রেনটি আপনাকে আপনার ইচ্ছেমতো জায়গায় নামিয়ে দিতো, এমনকি চলন্ত অবস্থায় আপনার হাতের ইশারায় তার গতি কমিয়ে আপনাকে সযত্নে উঠিয়ে নিতো! এছাড়া বিয়েসহ সামাজিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে পাইলট কিন্তু ‘স্পেশাল সার্ভিস’ দিতো! এতে হয়তো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অলিখিত নির্দেশও ছিলো।

পাকশী থেকে ঈশ্বরদীর দুরত্ব সাড়ে তিন মাইল। পাইলটের গতিপথ ছিল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ছোট-বড় মিলিয়ে ৩-৪টি কোচ, একটি মালগাড়ি, কয়েকটি সেলুন-কার ও একটি কয়লার ইঞ্জিন নিয়েই পাইলট। পাইলটে একজন গার্ড ও তার সাহায্যের জন্য আরো দুজন কর্মচারী, একজন ড্রাইভার ও দুজন ফায়ারম্যান থাকতো। যেহেতু টিকিট ছিল না সুতরাং চেকারও ছিল না।

Advertisement

ঈশ্বরদী থেকে পাকশী আসার সময় প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ইঞ্জিন আগে থাকতো। কিন্তু পাকশী থেকে ঈশ্বরদী যাবার সময় উল্টো। কেননা পাকশীতে ইঞ্জিন আগে লাগানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত পাইলট একনাগাড়ে তার কাজ চালিয়ে যেত। দিন-রাতে ৭-৮ বার এই পথে যাওয়া-আসা করতো। পাইলটের জন্য পাকশীতে পৃথক একটি রেলস্টেশন আছে। নাম তার পাইলট স্টেশন। এই স্টেশনটি পাকশী প্রধান রেলস্টেশন থেকে প্রায় সোয়া মাইল দূরে অফিসার্স কলোনির কাছে অবস্থিত।

বর্বর পাক বাহিনী কর্তৃক হার্ডিঞ্জ রেলব্রিজ ধ্বংস করার ফলে পদ্মার এপার পাকশী থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র বাহন ছিল পাইলট। সে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে বিনা টিকিটে নিয়ে যেত ঈশ্বরদী। সেখান থেকে যে যার গন্তব্যস্থল অনুযায়ী গাড়ি ধরতো। যদিও পাকশী বড় স্টেশন থেকে পার্বতীপুরগামী দুটো গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু তা যাত্রীর তুলনায় মোটেই পর্যাপ্ত ছিল না। তাই পাইলটের লাইনের গুরুত্বও ছিল বেশি। এই লাইনেই যুক্ত হয়েছিল পাকশীর ওয়াগন ফেরি। এ পথেই পদ্মার ওপারে যেত বিভিন্ন কাঁচামাল, পাট ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। আর ওপার থেকে আসত খাদ্যশস্য, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং কয়লা ও তেল। এই কয়লা ও তেল দিয়েই রক্ষা করা হতো উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পাইলট না থাকলে তখন উত্তরবঙ্গের মানুষ যে কী রকম দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হতো, তা সহজেই অনুমান করতে পারেন।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরি হওয়ার আগে থেকেই পাইলট চলাচল করতো। এই পাইলট পথে অপর একটি ছোট স্টেশন আছে। নাম সিভিলহাট জংশন। এখান থেকে পদ্মার তীরবর্তী অপর একটি স্টেশন সাঁড়াঘাট পর্যন্ত রেললাইন ছিল। এ পথে যাত্রী ও মালামাল পারাপারের জন্য আগেও ওয়াগন ফেরির ব্যবস্থা ছিল। ১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরি হওয়ার পর তা তুলে নেয়া হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস করার ফলে আবার সেই ফেরি ব্রিজের নিকটবর্তী স্থানে চালু করা হয়েছিল।

পাকশীতে একটি রেলওয়ে বিভাগীয় কার্যালয় বা ডিআরএম অফিস অবস্থিত। সেজন্যই অন্যান্য জেলা শহর থেকে পাকশীর গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মচারী বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে আসেন। এখান থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট, খুলনা, বাগেরহাট, সিরাজগঞ্জ ঘাট, পার্বতীপুর ও আমনুরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার ব্রডগেজ রেললাইনের কার্য পরিচালনা করা হয়।

পাকশী বিভাগীয় অফিসের পদস্থ কর্মকর্তাদের কার্যপরিচালনার জন্য বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই যেতে হয়। কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়ার জন্য সেলুন-কার ব্যবহৃত হয়। এসব সেলুন পাকশীর পাইলট স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী হয়ে বিভিন্ন ট্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হতো। মূলত এই সেলুনের আনা-নেয়ার জন্যই পাইলটের ব্যবহার অপরিহার্য এবং তাই সে সময় পাইলটের বিকল্প ছিল না।

পাইলট পথেই ঈশ্বরদী হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। কেননা পাকশীর প্রধান স্টেশনটি সমতল ভূমি থেকে ৫০/৬০ ফুট উপরে অবস্থিত। রেললাইনকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সঙ্গে করার উদ্দেশ্যেই স্টেশনটি এত উঁচু করা। সেখানে মেইন লাইন ছাড়া কোনো শাখা লাইন নেই। ফলে সেলুন বা মালগাড়ি নেয়া বা সংযুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই রেল কর্তৃপক্ষ পাইলট নামক ট্রেনটি দিতে বাধ্য হন। পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুযোগ ভোগ করেছেন রেলওয়ের অন্যান্য কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ এবং কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। পাকশীর ছাত্র-ছাত্রীদের ঈশ্বরদী যাওয়া-আসার জন্য তাদের কলেজের সময় অনুযায়ী একটি করে পাইলটের ট্রিপ দেওয়া হয়েছিল! এছাড়া এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রি পরীক্ষার সময় পাইলটের সময়সূচি বিশেষভাবে পরিবর্তন করে ছাত্র-ছাত্রীদের রেল কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!