ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

মোবাইলের ক্লিকে কেনাকাটা, ডেলিভারিতে ভাগ্যবদল

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১৮:৪১, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোবাইলের ক্লিকে কেনাকাটা, ডেলিভারিতে ভাগ্যবদল
স্টেডফাস্টের ডেলিভারিম্যান মো. জাবের। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গ্রাম থেকে শহরের বাজারে ছুটতে হতো। এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হতো। প্রযুক্তির প্রসারে সেই চিত্র বদলে গেছে। হাতে থাকা স্মার্টফোনে কয়েকটি ক্লিকেই এখন পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য অর্ডার করা যাচ্ছে। আর সেই পণ্য ক্রেতার ঘরের দরজায় পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় তরুণেরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়ছে ডেলিভারি সেবার পরিধি। এতে একদিকে মানুষের কেনাকাটা সহজ হয়েছে, অন্যদিকে তরুণদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিভিন্ন কুরিয়ার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করে অনেকে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বেশি আয় করছেন। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সহায়তাও করছেন তাঁরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আখাউড়া পৌর শহরে স্টেডফাস্ট, দারাজ, পাঠাওসহ কয়েকটি কুরিয়ার ও ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় অনেক তরুণ কমিশনভিত্তিক কাজ করছেন। স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট ও ডিজিটাল লেনদেনের সহজলভ্যতায় দিন দিন বাড়ছে অনলাইন কেনাকাটার গ্রাহক।

Advertisement

ডেলিভারিতেই জীবিকার পথ

স্টেডফাস্টের ডেলিভারিম্যান মো. জাবের বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে প্রায় তিন বছর আগে প্রবাস থেকে দেশে ফেরেন। পরে কাজের সন্ধানে ডেলিভারি পেশায় যোগ দেন। গত এক বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন।

জাবেরের নিজের একটি বাইসাইকেল রয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এলাকায় পণ্য পৌঁছে দেন। প্রতি পার্সেলে প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ টাকা কমিশন পান। মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। জাবের বলেন, ‘এ কাজ করে আমি সন্তুষ্ট। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের জন্যও সহযোগিতা করতে পারছি।’

ডেলিভারিম্যান মো. সানী এইচএসসি পাস করার পর নিজের পায়ে দাঁড়াতে এ পেশায় যুক্ত হন। প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। সানী বলেন, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করেন। এ আয় দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে পারছেন।

আরও ভিন্ন এক গল্প মো. সোহাগ মিয়ার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। চাকরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে ডেলিভারিম্যানের কাজ নেন তিনি। গত এক বছর ধরে এ পেশায় আছেন। সোহাগ বলেন, ‘এই কাজের আয় দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও টাকা দিতে পারছি।’

ঘরে বসেই পছন্দের পণ্য

শুধু তরুণদের কর্মসংস্থান নয়, অনলাইন কেনাকাটা আখাউড়ার ক্রেতাদের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন এনেছে। কাজী জান্নাতুল মাওয়া বলেন, আগে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাজারে যেতে হতো। এখন স্মার্টফোনে পণ্যের ছবি ও তথ্য দেখে ঘরে বসেই অর্ডার করা যায়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।

গৃহিণী আয়েশা আক্তার বলেন, আগে গ্রামে বসে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি পণ্য কেনার সুযোগ সীমিত ছিল। এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে পণ্যের মান ও বিবরণ দেখে অর্ডার করতে পারছেন। তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করা যায়, ফলে কেনাকাটায় আস্থাও বাড়ছে।

মো. জামির হোসেন বলেন, অনলাইন কেনাকাটা সম্পর্কে তাঁর তেমন ধারণা ছিল না। তাঁর মেয়ে নিয়মিত অনলাইনে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। ডেলিভারিম্যানরা দ্রুত সেগুলো বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন।

ব্যবসাতেও বদল

অনলাইন কেনাকাটার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাজের ধরনও বদলেছে। ব্যবসায়ী মুনিরা ইয়াসমিন কয়েক বছর ধরে থ্রি-পিস, শাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের ছবি, গুণগত মান ও বিবরণ তুলে ধরার কারণে ক্রেতারা এখন ঘরে বসেই অর্ডার করছেন। এতে ব্যবসায় ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

অনলাইন কেনাকাটায় ক্যাশ অন ডেলিভারি, ডিজিটাল পেমেন্ট, পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ ও ক্রেতাদের পর্যালোচনা বা রিভিউ সুবিধা থাকায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে বাজারে না গিয়েও ক্রেতারা বিভিন্ন পণ্যের দাম ও মান তুলনা করে পছন্দের পণ্য কিনতে পারছেন।

আখাউড়া সচেতন নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহসভাপতি আলহাজ মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, ‘অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে ডেলিভারি সেবাও এখন বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তরুণেরা এ পেশায় যুক্ত হয়ে সফলতা পাচ্ছেন।’

প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে আখাউড়ার কেনাকাটার অভ্যাস যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তরুণদের জীবিকার পথও। ঘরে বসে অর্ডার করা একটি পণ্য এখন শুধু ক্রেতার প্রয়োজন মেটাচ্ছে না; সেই পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-M-02
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!