ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অপরাধ ]

ডিএসসিসিতে প্রভাবশালী তিন চক্রের দাপট

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮:৫২, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিএসসিসিতে প্রভাবশালী তিন চক্রের দাপট
রাসেল, নজিব ও সাখাওয়াত

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে একটি প্রভাবশালী চক্রের দাপট নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। রাসেল, নজিব ও সাখাওয়াত হোসেন—এই তিনজনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার বলয় তৈরি, স্বজনপ্রীতি, বদলি-পদায়নে লেনদেন এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিত কর্মীদের নামে বেতন উত্তোলনের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কে কোথায় দায়িত্ব পাবেন, কে বদলি হবেন এবং কে সুবিধাজনক এলাকায় থাকবেন—এসব বিষয়েও এই চক্রের প্রভাব রয়েছে। সুবিধাজনক ওয়ার্ডে বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ উঠেছে ওয়ার্ড-৪কে ঘিরে। অভিযোগকারীর দাবি, ওয়ার্ড-৪-এ প্রায় একশ পাঁচজন পরিচ্ছন্ন কর্মী কর্মরত থাকলেও তাদের মধ্যে প্রায় চল্লিশজন নিয়মিত কাজে না থেকেও বেতন সুবিধা পাচ্ছেন। প্রতি কর্মীর নামে প্রায় নয় হাজার টাকা করে উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে। যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কাজ না করা কর্মীর হাজিরা কে দিচ্ছেন, হাজিরা অনুমোদন করছেন কে, বেতন বিল তৈরি করছেন কে এবং কোন কর্মকর্তার স্বাক্ষরে সেই অর্থ ছাড় হচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললেই কথিত অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। 

Advertisement

অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই ধরনের হিসাব এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, আট, নয়, দশ, এগারো, বারো ও তেরো নম্বর ওয়ার্ড নিয়েও তোলা হয়েছে। তবে অর্থের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মাসের বেতন বিল, হাজিরা ও ব্যাংক বা ইএফটি রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।

ওয়ার্ড-৪-এর ঘটনায় অভিযোগ আরও বিস্ফোরক আকার ধারণ করেছে। পরিচ্ছন্ন কর্মী অরুণ কুমারকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়ার পর সাখাওয়াত হোসেন নিজেই ওয়ার্ড-৪-এর পরিচ্ছন্ন পরিদর্শকের দায়িত্ব নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বরাবর একটি আবেদনও দায়ের করা হয়েছে। 

আবেদনকারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আবু তাহের অভিযোগ করেছেন, সাখাওয়াত হোসেন তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, সাখাওয়াত তাকে এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছে অর্থ দাবি করেছেন এবং ভয় দেখিয়েছেন। 

অফিস আদেশে দেখা যায়, সাখাওয়াত হোসেনকে অঞ্চল-২, ওয়ার্ড-৪-এর পরিচ্ছন্ন পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অরুণ কুমারকে সাময়িকভাবে কাজে বিরত রাখার আদেশও জারি করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—অরুণ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল কি না, তাকে সরানোর আদেশ কে দিয়েছেন এবং সাখাওয়াতকে একই ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি কী।

বজ্য সহকারি কর্মকর্তা রাসেলকে ঘিরে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও জোরালো। অভিযোগকারীর তথ্য অনুযায়ী, ওয়ার্ড-৩৮-এ মহাসেন তার ভাগ্নির জামাই, ওয়ার্ড-৪৩-এ সাইফুল চাচাতো ভাই, ওয়ার্ড-৩০-এ সাজ্জাদ উল্লাহ খালাতো ভাই এবং ওয়ার্ড-৫৬-এ আতিকুর রহমান আরিফ আপন ভাই হিসেবে নিয়োগ বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। এসব সম্পর্কের দাবি এবং তাদের নিয়োগ-পদোন্নতিতে কোনো বিধিবহির্ভূত সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়োগপত্র, পদোন্নতির আদেশ ও চাকরির নথি যাচাই করলেই পরিষ্কার হতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু স্বজনপ্রীতির প্রশ্ন নয়, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারেরও গুরুতর অভিযোগ হতে পারে।

বজ্য সহকারি কর্মকর্তা নজিবের বিরুদ্ধে একাধিক ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর তালিকায় রয়েছে চোদ্দ, উনিশ, বাইশ, তেইশ, চব্বিশ, পঁচিশ, ছাব্বিশ, সাতাশ, আটাশ, ঊনত্রিশ, পঞ্চাশ, ছাপ্পান্ন ও সাতান্ন নম্বর ওয়ার্ড। বিশেষ করে উনিশ নম্বর ওয়ার্ডের কার্যক্রম তিনি নিজেই পরিচালনা করেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিধি অনুযায়ী যতটুকু দায়িত্ব পাওয়ার কথা, তার বাইরে তিনি একাধিক ওয়ার্ডের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন কি না।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো পরিচ্ছন্ন পরিদর্শকদের পছন্দের ওয়ার্ডে বদলি, সুবিধাজনক পদায়ন অথবা বদলি ঠেকাতে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হওয়ার বিষয়টি। এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো গত কয়েক বছরের বদলি তালিকা বের করা। কারা বারবার গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে গেছেন, কারা বদলি ঠেকিয়েছেন এবং কারা অল্প সময়ের মধ্যে আবার সুবিধাজনক এলাকায় ফিরে এসেছেন—এসব তথ্য তদন্ত করা হলে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। 

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরিচ্ছন্ন কর্মীদের বেতন। হাজিরা খাতা, মাস্টাররোল, বেতন বিল, ইএফটি বা ব্যাংক রেকর্ড এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি—এই পাঁচটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে কাগজে কতজন, বেতনে কতজন এবং বাস্তবে মাঠে কতজন। যদি এই তিন হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়, তাহলে তার দায় নির্ধারণ করাও জরুরি বলে মনে করেন নগরবাসি।

এ বিষয়ে সহকারি বজ্য কর্মকর্তা রাসেল জানিয়েছেন, এসব অভিযোগের সঙ্গে তিনি জড়িত নেই। তার উপর অর্জিত দায়িত্ব পালনে তিনি সবসময় সচেষ্ট থাকেন। নজিব বলেছেন, তাকে নিয়ে তার এক সহকর্মী মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন। সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। 

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দস সালাম বলেন, কোনো অভিযোগ এলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নগরবাসীর মৌলিক সেবা। এখানে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, তার কাছে আবু তাহেরের আবেদনপত্র পৌঁছেছে। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি বিধি লঙ্ঘন করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি দ্বিধা করবেন না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নগরবাসীর মধ্যেও অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। ওয়ার্ড-৪-এর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, রাস্তাঘাটে ময়লা পড়ে থাকলেও অনেক সময় পরিচ্ছন্ন কর্মী দেখা যায় না। তিনি প্রশ্ন করেন, বেতন দিয়ে যদি কাজ না হয় তাহলে অর্থ কোথায় যায়। আরেক বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের কথা শুনলে নগরবাসী হিসেবে তিনি উদ্বিগ্ন। 

নগরবাসির দাবি- ডিএসসিসির মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি। কারণ এখানে অনিয়মের অভিযোগ শুধু কয়েকজন কর্মচারীর বদলি-পদায়নের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থ, কর্মীদের অধিকার এবং নগরবাসীর পরিচ্ছন্নতা সেবার মান সরাসরি জড়িত। 

ডেইলি-বাংলাদেশ//এমএ
অপরাধ জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!