ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অপরাধ ]

গণপূর্ত ই/এম-১-এ বাশারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮:০১, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গণপূর্ত ই/এম-১-এ বাশারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট
সহকারি প্রকৌশলী আবুল বাসার ও তার স্ত্রী গুলনাহার

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আবুল বাসারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে আবাসন ব্যবসায় জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে করা আবেদনপত্রের সূত্র ধরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘অদৃশ্য প্রপার্টি সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত এক নেপথ্য ব্যবসায়িক চক্রের কথা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি পদে থাকা অবস্থায় তিনি নিজে বা ঘনিষ্ঠ স্বজনদের আড়ালে ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন, ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন অংশীদারিত্ব রেখেছেন এবং ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ও নির্মাণকাজ পরিচালনা করছেন। এর পাশাপাশি ফ্ল্যাট বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এই অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে গণপূর্তের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নানা মহলে আলোচনা চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবুল বাসারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া লাভজনক ব্যবসা বা বাণিজ্যে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারেন না। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা যেখানে সরকারি ভবন নির্মাণের বাজেট প্রাক্কলন, তদারকি ও বাস্তবায়নের মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে একই সময়ে ব্যক্তিগত আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 

Advertisement

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কাগজপত্রে ভাইয়ের নাম থাকলেও নেপথ্যে মূল পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ আবুল বাসারের হাতেই রয়েছে। বিভিন্ন নির্মাণাধীন ও নির্মিত ভবনের ফ্ল্যাট বিক্রির সঙ্গে তার ও তার স্বজনদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। এসব বিক্রয় থেকে অর্জিত অর্থ কোথায় জমা হয়েছে, কার ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে এবং আয়কর রিটার্নে তা প্রদর্শিত হয়েছে কি না—এসব বিষয় অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাসার বলেন, হয়তো কারও স্বার্থে আঘাত লেগেছে বলেই এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন যে দুদকে দায়ের করা অভিযোগের বিষয়টি তার নজরে আগেই এসেছে। তবে তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এর সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে থেকে তিনি কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন এবং স্বজনদের নামে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। 

অপরদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে জানান, অভিযোগের বিষয়টি যদি দুদক বা গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে তাহলে অবশ্যই এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে। তাদের দাবি, সরকারি পদে থেকে আবাসন ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন নয় এবং এ ধরনের সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়। তারা মনে করেন, শুধু অভিযোগ নয় বরং ব্যাংক হিসাব, সম্পদের হিসাব এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বচ্ছ তদন্তই পারে আসল চিত্র তুলে ধরতে। 

একই সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, কেউ যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, কোনো অন্যায়কে তিনি ছাড় দেবেন না। তার মতে, সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং স্বার্থের সংঘাত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি। তিনি মনে করেন, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে এ ধরনের অভিযোগ এলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা উচিত। কারণ সরকারি পদের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের সংস্কৃতি যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে জনআস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে। তার ভাষ্য, কেবল অভিযোগ নয় বরং প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাই পারে এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিস্তার রোধ করতে।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট তন্ময় দাস এ বিষয়ে বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা অনুমতি ছাড়া ব্যবসায় জড়িত থাকলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলো যদি প্রমাণিত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তার মতে, দুদকের অনুসন্ধানে ব্যাংক হিসাব, সম্পদের ঘোষণা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, স্বজনদের নামে ব্যবসা পরিচালনা করে নিজেকে আড়াল করার কৌশল অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাই তদন্তে শুধু নামমাত্র মালিকানা নয় বরং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও লাভের অংশীদারিত্ব খতিয়ে দেখা উচিত।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আবুল বাসারের স্ত্রী গুলনাহারও একই অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) পদে কর্মরত। দুজনের সম্মিলিত অবস্থানকে কেন্দ্র করেই ‘অদৃশ্য প্রপার্টি সিন্ডিকেট’ নামে আলোচনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই দম্পতি ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে স্বজনদের আড়ালে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন। ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কাগজে ভাই রাশেদ-উল আলমের নাম রয়েছে, তবুও নেপথ্যে আবুল বাসারের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। 

এই ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের নৈতিকতার প্রশ্নকেও সামনে এনেছে। গণপূর্তের মতো সংস্থায় যেখানে বড় অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ ও নির্মাণকাজ হয়, সেখানে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জনস্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণী নিয়মিত যাচাই এবং ব্যবসায়িক সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। দুদকের কাছে এখন পর্যন্ত যে অভিযোগপত্র পৌঁছেছে তাতে আবুল বাসারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আয়ের উৎস, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই অনুসন্ধান কতটা গভীরে যায় এবং সিন্ডিকেটের আসল রূপ কতটা উন্মোচিত হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই পারে জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে। অভিযোগকারীরা আশা করছেন, দুদক শুধু কাগজে নয় বরং বাস্তবে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত দেবে। অন্যদিকে আবুল বাসার তার নির্দোষিতার দাবি বজায় রেখেছেন। 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ//এমএ
অপরাধ জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!