ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ভৈরবে বর্জ্য-আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে মেঘনা, হুমকিতে জলজ প্রাণী

নাজির আহমেদ আল-আমিন, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশিত: ২০:০৪, ২ নভেম্বর ২০২৬
ভৈরবে বর্জ্য-আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে মেঘনা, হুমকিতে জলজ প্রাণী
নদীর পাড়ে ময়লার ভাগার। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় মেঘনা নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ভৈরবের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনবসতি। নদীপথের যোগাযোগ সুবিধায় সমৃদ্ধ হয়েছিল এ অঞ্চলের অর্থনীতি। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই মেঘনাই এখন দূষণের শিকার। নদীর তীর ও পানিতে প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও অপচনশীল আবর্জনা। কোথাও নদীর পাড়ে জমছে ময়লার স্তূপ, কোথাও সরাসরি মিশছে পয়োনিষ্কাশনের পানি। এতে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি, বাড়ছে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতার অভাব, নদীর তীর দখল এবং পয়োনিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থার কারণে মেঘনার দূষণ দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে নদীটির স্বাভাবিক পরিবেশ আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।

মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যবর্তী প্রাচীন উলুকান্দির চরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বর্তমান ভৈরব বাজার। নদীপথে যোগাযোগের সুবিধার কারণে একসময় এলাকাটি ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। নদীকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হয় জনবসতি, বাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হওয়ায় এখন নদীটিই পড়েছে মানুষের সৃষ্ট দূষণের চাপে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব পড়ছে নদীর ওপর। নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে জমে থাকতে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনা। পৌরসভার সংগৃহীত বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা নদীর আশপাশে ফেলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। বৃষ্টির পানি ও নদীর স্রোতে এসব বর্জ্যের একাংশ পানিতে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন দীর্ঘদিন অপচনশীল থাকায় নদীর পরিবেশের জন্য তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম রিপন বলেন, মেঘনাকে কেন্দ্র করেই ভৈরবের পরিচিতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। অথচ এখন নিজেরাই নদীতে ময়লা ফেলছি। নদীর পাড়ে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

আরেক বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অনেক খাল-বিল ও পানিপ্রবাহের পথ ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের পানি নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে পানির স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব নদীর পানি ও জলজ প্রাণীর ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান মিয়া বলেন, বাজারের আশপাশে অনেক দোকানি ময়লা ও প্লাস্টিক নদীর তীরে ফেলে রাখেন। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যবস্থা করা গেলে দূষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

এলাকাবাসীর মতে, মাঝেমধ্যে নদী পরিষ্কারের অভিযান চালিয়ে দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, পয়োনিষ্কাশনের পানি শোধন এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা তৈরি ও আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ভৈরব পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। তবে নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও বাজারের কিছু ব্যবসায়ী নদীর আশপাশে ময়লা ফেলছেন। এ বিষয়ে জনগণকে আরও সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হবে।

মেঘনা শুধু একটি নদী নয়, ভৈরবের মানুষের জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নদীটির দূষণ রোধে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানির গুণগত মান ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ভৈরব/এমকে
ট্যাগ: কিশোরগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!