ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
এইচএসসির ফলাফল

এক কলেজের সবাই ফেল, অস্তিত্বহীন ক্যাম্পাস

মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী
প্রকাশিত: ২১:২৫, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
এক কলেজের সবাই ফেল, অস্তিত্বহীন ক্যাম্পাস
আপার মডেল কলেজে পাঁচ শিক্ষার্থীর সবাই ফেল। ফাইল ছবি

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শূন্য পাস করা ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ‘বেগমগঞ্জ আপার মডেল কলেজ’। প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। তবে ফলাফল প্রকাশের পর কলেজটির ঠিকানা ধরে খোঁজ নিতে গিয়ে পাওয়া গেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। বাস্তবে নেই কলেজটির কোনো দৃশ্যমান ক্যাম্পাস, নেই অধ্যক্ষ কিংবা স্থায়ী শিক্ষক। এমনকি উপজেলা ও জেলা শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নন।

ফলাফল প্রকাশের পর শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানটির খোঁজে মাঠে নামেন সাংবাদিকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও অনলাইনে পাওয়া ঠিকানা ধরে বেগমগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নেওয়া হয়। প্রথমে কলেজটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয় বেগমগঞ্জের কন্ট্রাক্টরের মসজিদ এলাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের পরিবর্তে রয়েছে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। পরে চৌমুহনী পূর্ব বাজারের কেএইচ টাওয়ারের মণ্ডল পাড়ায় গিয়ে কলেজটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরপর চৌমুহনী কলেজ গেট এলাকায়ও খোঁজ নেওয়া হয়।

কলেজের প্রচারপত্রে দেওয়া একাধিক মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কেউই বর্তমানে দায়িত্বে থাকার কথা স্বীকার করেননি। স্বপন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম, আমি পাঁচ বছর আগে কলেজের দায়িত্বে ছিলাম। এখন আর নেই।

পরে আরেকটি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে রফিকুল আলম রুবেল নামে এক ব্যক্তি নিজেকে কলেজটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি জানান, দায়িত্বটি কাগজে-কলমে নয়। কলেজের গভর্নিং বডি তাঁকে অধ্যক্ষ করার প্রস্তাব দিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু তিনি ওই দায়িত্ব নিতে রাজি হননি।

কলেজটির ক্যাম্পাস কোথায়- এমন প্রশ্নের জবাবে রুবেল জানান, বর্তমানে তাদের কোনো ক্যাম্পাস নেই। আগে চৌমুহনী কলেজের পাশে একটি কক্ষে কলেজের অফিস ছিল। সেটিও এখন আর নেই। চৌমুহনী গণিপুর গার্লস একাডেমির সামনে একটি ভবন ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে ভবনের নিচে ফুচকার দোকান থাকায় সেখানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। তাই বিকল্প জায়গা খোঁজা হচ্ছে।

কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে কোনো অধ্যক্ষ কিংবা স্থায়ী শিক্ষক নেই। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী কলেজে ক্লাস নেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাঁদের নাম-পরিচয়ও জানাতে পারেননি।

রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর একসময় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন এবং তাঁদের অনেকে বর্তমানে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে কলেজটি তিনজন মিলে দেখভাল করেন। তাঁদের একজন নূরনবী, যিনি চৌমুহনী কলেজ রোডে প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসা করেন। অপরজন আফাজ উদ্দিন। আর রুবেল নিজে কলেজের কাগজপত্র দেখাশোনা করেন বলে জানান।

রুবেল আরও দাবি করেন, বর্তমানে কলেজে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে তাঁদের নিয়মিত ক্লাস হয় না। এমনকি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাও চৌমুহনীর একটি মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান তিনি। তবে ওই মাদ্রাসার নামও জানাতে পারেননি তিনি।

এদিকে, কলেজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা নূরনবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কলেজের কোনো দায়িত্বে নেই বলে দাবি করেন। বর্তমানে কে বা কারা কলেজটির দায়িত্বে রয়েছেন, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। অপর ব্যক্তি আফাজ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জহিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, উপজেলায় এ নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে আমার জানা নেই। গত তিন-চার বছরেও প্রতিষ্ঠানটির কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কলেজগুলো সরাসরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমার সন্দেহ রয়েছে।

বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার রহমান জানান, এ নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে তিনি জানেন না। তাঁর ধারণা, অন্য কোনো কলেজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকতে পারেন। কীভাবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নোয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, এই প্রথম শুনলাম নোয়াখালীতে এ নামে একটি কলেজ রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় নোয়াখালী জেলায় ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। জেলায় মোট ১৬ হাজার ২৩৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ হাজার ৩১৭ জন। পাসের হার ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১১২ জন।

তবে বেগমগঞ্জ আপার মডেল কলেজের অনুমোদন, পরিচালনা, শিক্ষার্থী ভর্তি, পাঠদান ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বাস্তবে ক্যাম্পাস ও স্থায়ী শিক্ষক না থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কীভাবে চলছে, কারা এর দায়িত্বে রয়েছেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন- এসব বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয়রা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/নোয়াখালী/এমকে
ট্যাগ: Chittagong
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!