ঢাকা,  শুক্রবার   ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য: কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও পূর্ণ জনবল

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:২৬, ২ অক্টোবর ২০২৬
প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য: কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও পূর্ণ জনবল
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের দুর্গম হাওরাঞ্চলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওর ও দুর্গম এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট ও পদশূন্যতা চলছে। কোথাও একজন শিক্ষক দিয়ে চলছে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান, আবার কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকও না থাকায় পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যালয় খোলা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ও তুলনামূলক সুবিধাজনক এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংখ্যা রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্গম এলাকায় পদায়ন পাওয়া শিক্ষকদের অনেকে বদলির সুযোগ পেলেই অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। এতে হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে।

সম্প্রতি প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির পর দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পাশের দুটি বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে দিয়ে বিদ্যালয়টি খোলা এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কাজ চলছে।

Advertisement

এ ছাড়া দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পুরান খালাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকই সুবিধাজনক এলাকায় বদলির আদেশ পেয়েছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের শিবরামপুর, মন্দিয়াতা, জয়পুর, বাঁশতলা ও মনভোজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের উক্তিয়ারগাঁও, কলাপাড়া ও মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উত্তর বড়দল ইউনিয়নের মাহরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজন করে শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শেষে তাহিরপুর উপজেলার ৪৯ জন শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিসে যোগ দিয়েছেন। আগামী ১১ অক্টোবর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তাদের পদায়নের আদেশ জারি হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সানজু মিয়া বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মোট পাঁচটি পদ রয়েছে। কিন্তু ১২ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য। বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমি দায়িত্ব পালন করছি। অনেক সময় বিদ্যালয়ে অন্য কোনো শিক্ষক না থাকায় একাই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান করতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে কোনো শিক্ষককে পোস্টিং বা ডেপুটেশনে দেওয়া হলেও পরে তিনি বদলি হয়ে যান। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকও বদলির আদেশ পেয়েছেন। নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। এখন বিদ্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।’

শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোয়াজ্জেমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রীতম সরকার ও মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিলন তালুকদার।

প্রীতম সরকার বলেন, ‘শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক না থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের দুজনকে বিদ্যালয়টি খোলা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়টি স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে দ্রুত শিক্ষক প্রয়োজন।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির সদস্য ও মধ্য তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাখাওয়াত হোসেন পাটোয়ারী বলেন, দুর্গম এলাকার বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকরা বদলি হয়ে সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে চলে আসায় হাওরাঞ্চলের শিশুরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, হাওরাঞ্চলের শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পদায়নকৃত শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ে রাখা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় নিয়োগ দেওয়া হলেও ভালো যোগাযোগব্যবস্থার বিদ্যালয়ে চলে আসার প্রবণতা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন।

তিনি আরও বলেন, দুর্গম এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখতে যাতায়াত, আবাসন ও হাওর ভাতার মতো সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। হাওরপাড়ের মানুষের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হাওর রেশনিংয়ের আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

আনোয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদ শূন্য কিংবা শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন শিক্ষকদের পদায়ন করা উচিত।

তাহিরপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজন কুমার সাহা বলেন, উপজেলার যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখন জেলা শিক্ষা অফিস বিষয়টি বিবেচনা করবে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহনলাল বলেন, সহকারী শিক্ষকদের পদায়ন কমিটির মাধ্যমে করা হবে। তবে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: সুনামগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!