আবেগঘন পরিবেশে মুয়াজ্জিনকে বিদায় দিলো মুসল্লিরা
ফজরের নীরব ভোর, দুপুরের ব্যস্ত সময়, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে মায়াবী আবহে সুমধুর কণ্ঠে ভেসে আসতো আল্লাহু আকবারের ধ্বনি। দিনের পর দিন নামাজের জন্য মুসল্লিদের ডাক দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের সেই পরিচিত কণ্ঠ শোনা যাবে না আর কখনো। এমন বাস্তবতায় আবেগাপ্লুত হয়ে প্রিয় মুয়াজ্জিন হাফেজ মো. হারুনুর রশিদকে বিদায় জানিয়েছেন মসজিদের মুসল্লিরা। হাফেজ মো: হারুনুর রশিদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের তারাগন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দীর্ঘ ১৭ বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। অসুস্থ জনিত কারণে এ দায়িত্ব থেকে তিনি অবসরে যান।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জুম্মার নামাজ আদায় শেষে বিদায় উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়। এতে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সদস্য, ইমাম, মুসল্লি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
.png)
একাধিক মুসল্লি জানান, মুয়াজ্জিন হারুনুর রশিদ দীর্ঘদিন এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম বিনিময়, কারও খোঁজ নেওয়া, শিশুদের স্নেহ করতেন। সব মিলিয়ে তিনি শুধু একজন মুয়াজ্জিনই ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন মসজিদ কেন্দ্রিক মানুষের আপনজন। বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেক মুসল্লিই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
মুসল্লি মো: নাজির হোসেন বলেন, তার আজানের সঙ্গে আমাদের অনেক বছরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে দিনের প্রতিটি ওয়াক্তে তাঁর কণ্ঠ শুনেছি। এখন সেই কণ্ঠ আর শোনা যাবে না এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
মসজিদ কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম মক্কী বলেন, তিনি খুবই একজন ভালো মানুষ ছিলেন। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে,তা সহজে ভোলার নয়।
মুয়াজ্জিন মো: হারুনুর রশিদ বলেন, এই মসজিদের মুসল্লিদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা আমি সব সময় মনে রাখব। দীর্ঘদিন এখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবার সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমার জীবনের মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। দীর্ঘ সময় চলতে গিয়ে যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমাকে আপনারা ক্ষমা করে দিবেন। তিনি আরও বলেন, আসলে এই মসজিদ থেকে যাওয়ার কোন ইচ্ছে ছিল না। আমার স্বাস্থ্যগত সমস্যা হওয়ায় যেতে হলো।
অনুষ্ঠান শেষে মসজিদ কমিটি, যুব সমাজ ও মুসল্লিদের পক্ষ থেকে তাঁকে নগদ অর্থসহ সম্মাননা উপহার দেওয়া হয়। এ সময় অনেক মুসল্লি তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় করে দোয়া চেয়েছেন।
একজন মুয়াজ্জিনের বিদায় যেন শুধু একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং একটি পরিচিত কণ্ঠ, একটি চেনা মুখ এবং দীর্ঘদিনের অসংখ্য স্মৃতির বিদায়। তাই বিদায়ের মুহূর্তে মসজিদ প্রাঙ্গণে নেমে আসে এক আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘদিনের সেই পরিচিত কণ্ঠ হয়তো আর প্রতিদিন মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসবে না। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত আজানের ধ্বনি আর মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যাবে মুসল্লিদের হৃদয়ে।