ঢাকা,  শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

জলাভূমি ভরপুর, তবু আখাউড়ায় কমছে দেশি মাছ

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১১:৫৫, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলাভূমি ভরপুর, তবু আখাউড়ায় কমছে দেশি মাছ
আখাউড়ায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, বাজারে ভরসা চাষের মাছ । ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা। এ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে হাওড়া, তিতাসসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি নদী। রয়েছে অসংখ্য খাল, বিল, ডোবা ও জলাশয়। এত জলাভূমি থাকা সত্ত্বেও দিন দিন কমছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ। স্থানীয় বাজারগুলোতেও আগের মতো দেখা মিলছে না এসব মাছের।

একসময় হাওড়া ও তিতাস নদীর মাছের বেশ সুনাম ছিল। কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, শোল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বুয়াল, বাইম, ফলি, চিংড়ি, মালান্দা, গজার, টাকি, চিতল, পোয়া, বালিয়াসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ সহজেই পাওয়া যেত। এখন এসব মাছের বেশিরভাগই বাজারে খুব কম দেখা যায়।

Advertisement

হাতে গোনা কিছু দেশি মাছ পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে গত কয়েক বছর ধরে পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ বাড়ায় বাজারে চাষের মাছের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব মাছ জেলার বিভিন্ন এলাকা এবং দেশের অন্য স্থানেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ তুলনামূলক বেশি থাকায় দামও ছিল নাগালের মধ্যে। বর্তমানে সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক প্রজাতির দেশি মাছের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মাছের পাতে চাষের মাছই বেশি জায়গা করে নিয়েছে।

বাজারে চাষের মাছের আধিপত্য

আখাউড়া পৌর শহরের সড়ক বাজারের মাছের দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি করে রাখা হয়েছে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই, কাতল, কার্প, মৃগেল, থাই পুঁটি, থাই কৈ ও আফ্রিকান মাগুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির চাষের মাছ। দেশি মাছের উপস্থিতি সেখানে খুবই কম।

বাজারে প্রতি কেজি কার্প ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, শিং ৩০০ থেকে ৩৫০, ব্রিগহেড ১৮০ থেকে ২৫০, পাপদা ৩০০ থেকে ৩৫০, পাঙ্গাস ১৫০ থেকে ১৮০, তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২২০, রুই ২৮০ থেকে ৩৫০, কাতল ৩০০ থেকে ৪০০, মৃগেল ১৯০ থেকে ২৫০, থাই পুঁটি ১৯০ থেকে ২৫০ এবং থাই কৈ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষের টেংরা ৫০০ থেকে ৬০০ ও বোয়াল ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে দেশি মাছের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। আকারভেদে দেশি শোল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, কৈ ৭০০ থেকে ৮০০, শিং ৬০০ থেকে ৮০০, মাগুর ৬০০ থেকে ৮০০, পাবদা ৭০০ থেকে ১ হাজার এবং দেশি বাইম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য দেশি মাছ এখন অনেকটাই বিলাসী খাবারে পরিণত হয়েছে।

ক্রেতাদের পছন্দেও চাষের মাছ

মাছ ব্যবসায়ী রবি দাস বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি মাছ বিক্রি করছেন। বর্তমানে তার বিক্রি করা মাছের বেশিরভাগই চাষের। দেশি মাছ খুব কম পাওয়া যায়। যেটুকু পাওয়া যায়, দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতাই তা কিনতে পারেন না।

আরেক ব্যবসায়ী ঋষি দাস বলেন, তিনি প্রতিদিন আড়ত থেকে চাষের মাছ এনে বাজারে বিক্রি করেন। দেশি মাছ খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়া গেলেও দাম শুনে অনেক ক্রেতা অবাক হন। তাই চাষের মাছই বেশি বিক্রি করছেন তিনি।

গৃহিণী মৌসুমী আক্তার বলেন, বাজারে দেশি মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে। পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। তাই বাধ্য হয়ে চাষের মাছ কিনতে হয়। তার ভাষ্য, দুই কেজি রুই মাছ ৬০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। নিয়মিত চাষের মাছ খেলেও দেশি মাছের স্বাদ আলাদা।

মো. মানিক মিয়া বলেন, একসময় বাজারে নানা ধরনের দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, কার্প, থাই পুঁটি ও আফ্রিকান মাগুরের মতো চাষের মাছই বেশি দেখা যায়। তবে এসব মাছের দামও খুব কম নয়।

তাজুল ইসলাম বলেন, তার বৃদ্ধ মা দেশি শোল মাছ খেতে চেয়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মাছটি পেলেও প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়েছে। তার মতে, একসময় যে মাছ সাধারণ মানুষের খাবার ছিল, এখন সেটিই বিশেষ খাবারে পরিণত হয়েছে।

নানা কারণে হুমকিতে দেশি মাছ

আখাউড়া উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, খাল-বিল ও জলাশয়ের গভীরতা হ্রাস, মা মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং ডোবা-নালায় সেচ দিয়ে মাছ ধরার কারণে দেশি মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, রাক্ষুসে মাছের চাষ, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও দেশি মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।

দেশি মাছের উৎপাদন বাড়াতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান এই মৎস্য কর্মকর্তা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আখাউড়া/এআর/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!