ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

দুই বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পরীক্ষায় বসতে পারেননি মাহবুব

রিফাত আহমেদ রাসেল, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ১৮:৪৫, ১ নভেম্বর ২০২১
দুই বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পরীক্ষায় বসতে পারেননি মাহবুব
পড়াশোনায় ব্যস্ত মেধাবী শিক্ষার্থী মাহাবুব রহমান

বাবা সামান্য কৃষিকাজ করে কোনোরকমে দুই ছেলেকে পড়াশোনা খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হয় প্রতিমাসে। তারপরও ছেলেদের স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়েছেন বাবা। 

এই পরিবারের দুই সন্তান আতাউর ও মাহবুব। দুই ভাই একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর এক ভাই ভর্তি হন সরকারি কলেজে অন্য ভাই কারিগরি কলেজে। দুই ভাই একসঙ্গে করছেন পড়াশোনা। পড়াশোনা সমান হলেও এক ভাইয়ের পড়াশোনার শেষের দিকে হলেও অন্য ভাই এখনো শুরুতেই পড়ে আছে। 

গত দুই বছর ধরে বই পড়ে আছে মাহবুরের টেবিলের উপরে। অথচ এতদিনে এ বইগুলোর পরিবর্তে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চতর কোনো শাখার বই থাকার কথা ছিল টেবিলে। নিয়মিতই বইয়ের পাতাগুলো ভিজে তার চোখের জলে। তারপরও পড়াশোনা করে নিজেকে প্রস্তুত রাখেন সবসময়। কবে প্রস্তুতি শেষ হয়ে পরীক্ষার বসবে তাই যেন অনিশ্চিত। 

কঠোর পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে পড়াশোনা করেও এখন পড়াশোনা নিয়েই অনিশ্চয়তায় ভুগছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী মাহবুব রহমান। 

উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গোদারিয়া গ্রামের কৃষক আবু সিদ্দিকের ছোট সন্তান তিনি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও নিয়মিত কলেজ ফ্রি, রেজিস্ট্রেশন ফিসহ কলেজের সব পাওনা পরিশোধ করেছেন। তারপরও কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে দুই বছর ধরে বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছেন তাদের গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। বোর্ডের ভুলের কারণেই এ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। 

জানা যায়, ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট নিয়ে ভর্তি হন ঝানজাইল কারিগরি কলেজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। কম্পিউটার ট্রেডে ভর্তির পরপরই কিনেছেন সব বই। ভালো রেজাল্টের আশায় নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি রাতে দিনে পড়াশোনায় কমতে রাখেননি। তবে বছর ঘুরতেই তার এ পড়াশোনা আসছে না কোনো কাজে। সহপাঠীরা নিয়মমাফিক বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিলেও গত দুই বছরেও পরীক্ষায় বসতে পারেননি মাহাবুব।

২০২০ সালে এইচএসসি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রথম বর্ষের পরীক্ষার প্রস্তুতিকালীন ফরম ফিলাপ লিস্টে নাম না আসার বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন এই শিক্ষার্থী। বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কেটে যায় এক বছর তার উপর আবার মহামারি করোনার থাবা। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের মতে দ্বৈত ভর্তির কারণে হয়তো এই সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে । সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীর পরিবারের কাছ থেকে এক বছরের সময়ও নেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মাহবুবসহ আরো দুই শিক্ষার্থীর একই সমস্যার কথা জানিয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন শাখায় একটি আবেদন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। 

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ লিস্টের তালিকা প্রকাশের পর জানা যায় এবারো তালিকায় নাম আসেনি মাহবুবের। পরপর দুই বছর একই সমস্যা সৃষ্টি হতে দেখে হতবাক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী। বারবার একই সমস্যার কেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে তা নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে বোর্ডের সমস্যার কারণেই এ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে এবারো পাশ কাটিয়ে গেছেন কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল বাশার।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাহবুব রহমান বলেন, গত দুই বছর ধরে আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি এখন তারা দুই বছর ধরে আমাকে ঘুরাছে। আমি সব টাকা-পয়সার দিয়েও কলেজের কোনো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি না। শুধুমাত্র কলেজের গাফিলতির ও দুর্নীতির কারণে আমার এ অবস্থা। কিছুদিন পরে পরীক্ষা শুরু হবে। এবারের পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে ফরম ফিলাপের তালিকা প্রকাশের পর জানতে পারি এবারো আমার নাম আসেনি।

পরে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন বোর্ডে সমস্যার কারণে রেজিস্ট্রেশনে আমার নাম আসছে না এখানে তাদের কোনো কিছু করার নেই। আমি তাদের কলেজের ছাত্র তারপরও তারা বলে তাদের কোনো কিছু করার নেই। এই সমস্যা কীভাবে সমাধান হবে তার কোনো পথও আমাদের দেখায় না। আমি দুই বছর ধরে কোনো পরীক্ষায় দিতে পারিনি। আমার সহপাঠীরা সবাই প্রথম বর্ষে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা দিয়ে ফেলবে অথচ আমি এখনো এক জায়গায় পড়ে আছি। আমার জীবন থেকে পরপর দুই বছর নষ্ট হয়ে গেল এর দায়ভার কে নেবে? 

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, গত দুই বছর ধরে আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও মাহবুবের নাম রেজিস্ট্রেশনে আনতে পারিনি। কারণে এখন পর্যন্ত একটা পরীক্ষাও দিতে পারে নি। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে যথাযথ টাকা পয়সা দিচ্ছি। তাদের কাছে অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান করছি, নিয়মিত ক্লাস করেও পরপর দুই বছর একই সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ। আর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানের রাস্তা দেখাতে পারেনি।

আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করছি। কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই কিন্তু বারবার এই সমস্যাটা সৃষ্টি হচ্ছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে আমাদের নাকি দ্বৈত ভর্তি রয়েছে। যদি দ্বৈত ভর্তি থাকতো তাহলে তো আমরা অন্য কলেজে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত। তাদের দ্বারে দ্বারে আমাদের বারবার যেতে হতো না। আমাদের দাবি এই ঘটনার জন্য সুষ্ঠু একটা তদন্ত হোক এবং মাহাবুর যেন এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে তার ব্যবস্থা হয়। 

ঝানজাইল কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল বাশার বলেন, আমরা এ সমস্যার সমাধানে যথাযথ চেষ্টা করেছি আরো যদি কোনো কিছু করার থাকে অবশ্যই আমরা তা করবো। কিন্তু তারপরও কেন এবারের ফরম ফিলাপে তার নামটি আসেনি তা আমাদের সঠিক ভাবে জানা নেই। মাহবুব ভর্তি হওয়ার পর একদম শেষ সময়ে আমাদের কাছে এসএসসির মার্কশিট জমা দিয়েছেন যথাসময়ে বোর্ডে প্রেরণ করেছি। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে দ্বৈত ভর্তির কারণে তার নাম আসেনি। পরবর্তীতে আমরা বিষয়টি জানিয়ে বোর্ডের একটি আবেদন প্রেরণ করেছি। এ বছর ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে আশা ছিল রেজিস্ট্রেশনে তার নাম আসবে কিন্তু কেন আসেনি আমার তা জানা নেই। এটা কেন হয়নি বোর্ড বলতে পারবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব উল আহসান বলেন, আমরা বিষয়টি এরই মধ্যে শুনেছি। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!