শিক্ষাছুটি থেকে ফেরেননি ১৮ শিক্ষক, কুবির পাওনা ১ কোটি ৭৭ লাখ
উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে ফেরেননি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ১৮ শিক্ষক। তাদের মধ্যে ৯ শিক্ষকের কাছে চলতি বছরের ২৪ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা ছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওরভিলা সরকার পরবর্তী সময়ে তাঁর পুরো পাওনা পরিশোধ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। এ ছাড়া ছয় (০৬) শিক্ষক তাঁদের পাওনা পরিশোধ করেছেন। আরও বারো (১২) শিক্ষকের পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর ও অর্থ ও হিসাব দপ্তরের নথি ও পাওনা-সংক্রান্ত হিসাব পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
.png)
রেজিস্ট্রার দপ্তরে তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে চাকরি ছেড়েছেন মোট ৪৪ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি। আরেকজন লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ড. মো. মশিউর রহমান ২০১৯ সালে বিদেশ থেকে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেও ২০২৩ সালে ফের চাকরি ছেড়ে দেন। ফলে শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ফেরেননি এমন শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮।
চলতি বছরের ২৪-আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ৯ শিক্ষকের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা রয়েছে। তাদের মধ্যে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদুল আলমের নামে ৪১ লাখ ৯২ হাজার ৩০৮ টাকা, রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেবাশীষ সেনের নামে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬১৮ টাকা এবং আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওরভিলা সরকারের নামে ২৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা পাওনা দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ড. মো. মশিউর রহমানের কাছে ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪ টাকা এবং ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসনিমা আক্তারের কাছে ২৮ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪ টাকা পাওনা দেখানো হয়েছে। তবে তাসনিমা আক্তারের বর্তমান বকেয়া ৩ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৮ টাকা।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাকির হোসাইনের মোট পাওনা ৪০ লাখ ৬৯ হাজার ৭২৬ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান বকেয়া ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৭২৬ টাকা। ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদিয়া সারওয়ারের মোট পাওনা ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৬৫ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান বকেয়া ২২ লাখ ৬৬ হাজার ৮৯৮ টাকা।
সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাহফুজুর রহমানের মোট পাওনা ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ২৬ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান বকেয়া ১২ লাখ ৩০ হাজার ২৬ টাকা। আর পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপা রানী দাসের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা ১৫ লাখ ৪ হাজার ৬০২ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ শিক্ষকের কাছে একসময় মোট পাওনা ছিল ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৩ টাকা। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ লাখ ৯২ হাজার ১১৫ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮৭ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৯৭২ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৫৯ টাকা আদায় হয়েছে।
চার অর্থবছরে মোট আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৩৩ টাকা। ফলে ২৪ আগস্টের হিসাবে অবশিষ্ট পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে ২৪ আগস্টের হিসাবের পর আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওরভিলা সরকার তার পুরো পাওনা পরিশোধ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নুরুল করিম চৌধুরী।
নুরুল করিম বলেন, ‘তাঁকে চিঠি দেওয়া হলে তিনি সুদ মওকুফের আবেদন করে চিঠির জবাব দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় সুদ ছাড়া বাকি অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত দিলে তিনি গত ৭ সেপ্টেম্বর সেই অর্থ পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের পর বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে হয়। ওরভিলা সরকার সেটি না দেওয়ায় তাঁর অর্থ পরিশোধের বিষয়টি অফিসিয়াল রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে কিছুটা সময় লেগেছে।
এর আগে ওরভিলা সরকার বলেন, তিনি ৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে ২৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা জমা দিয়েছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে এ তথ্য যাচাই করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অব্যাহতি নেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে ছয়জন তাদের পাওনা অর্থ পুরোপুরি পরিশোধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান ৩৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৭ টাকা, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসাইন ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯২ টাকা, আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ফিদা হাসান ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪৫২ টাকা, মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাহিদ শাহ ১৯ লাখ ৯১ হাজার ১৬৯ টাকা, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা হক ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬১ টাকা এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক মো. কামরুল হাসান মজুমদার ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৩ টাকা পরিশোধ করেছেন।
এই ছয় শিক্ষকের পরিশোধ করা অর্থের মোট পরিমাণ ২ কোটি ১৬ লাখ ২২ হাজার ৬৯৪ টাকা।
এদিকে ১১১তম সিন্ডিকেট সভায় নতুন করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন চৌধুরীকে পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার সঙ্গে আরও পাঁচ শিক্ষককে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাদের মধ্যে মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী হাসান ও একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ রয়েছেন। বাকি তিন শিক্ষকের পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নুরুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘কামাল হোসাইন চৌধুরীসহ আরও পাঁচজন শিক্ষককে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই করতে পাওনা থাকা নয় শিক্ষককে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজন জবাব দিয়েছেন। বাকি ছয়জনের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন লিখা পর্যন্ত তাঁরা কোনো জবাব দেননি।
ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদুল আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য তিনি ব্যাংক হিসাব নম্বর চেয়ে আসছিলেন। গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীর কাছ থেকে হিসাব নম্বর পেয়েছেন। শিগগিরই সেখানে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেবাশীষ সেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা অর্থ পরিশোধের বিষয়ে তিনি শুরু থেকেই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং অনুমোদিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দেবাশীষ সেন জানান, গত ১ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রার দপ্তরে পদত্যাগপত্র দিয়ে পাওনা অর্থ নির্ধারণের অনুরোধ করেন তিনি। পরে ২১ মে তাঁকে পাওনা অর্থের পরিমাণ জানানো হয়। ১৬ জুন এক বছরের মধ্যে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের অনুমতি চাইলে ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে চার কিস্তিতে এক বছরের মধ্যে অর্থ পরিশোধের অনুমতি দেয়। সে অনুযায়ী ১৯ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রথম কিস্তি পরিশোধ করবেন বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায় এড়িয়ে যাইনি; বরং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পাওনা পরিশোধের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়া কিংবা নির্ধারিত সময়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ না দেওয়া শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি রয়েছে।
তিনি জানান, অনেক সময় পাওনার পরিমাণ বেশি হওয়ায় একবারে তা পরিশোধ করা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো পাওনা অর্থ ফেরত আনা।
কোষাধ্যক্ষ আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের উদ্যোগের পরও কেউ অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক যে দেশেই থাকুন না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় ওই দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। দূতাবাস ওই শিক্ষক যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ উদ্ধারে সহযোগিতা করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়নি বলে জানান তিনি।
পাওনা আদায়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নুরুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘পাওনা আদায়ের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। এবারের সিন্ডিকেট সভায় ছয়জন শিক্ষককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা সুদ মওকুফ বা কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের আবেদন করতে পারেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেয়।’
পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ পাওনা অর্থ পরিশোধে রাজি না হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সে দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দূতাবাসের মাধ্যমে পাওনা অর্থ আদায়ে সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাছুটির নীতিমালার ৯.১ ধারায় বলা হয়েছে, পূর্ণ বেতনে শিক্ষাছুটি নেওয়া শিক্ষককে ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে ছুটির সমপরিমাণ সময় চাকরি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের আগে চাকরি ছেড়ে দিলে বা প্রয়োজনীয় সময় পূর্ণ না করলে শিক্ষাছুটির সময়ে পাওয়া বেতন-ভাতা ব্যাংক সুদসহ ফেরত দিতে হবে। কেউ আংশিক সময় চাকরি করলে অনুপাতে পাওনা নির্ধারণের বিধানও রয়েছে।
পাওনা অর্থ পরিশোধ না করলে জামিনদারের কাছ থেকেও তা আদায় করা যেতে পারে বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। আর কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সংখ্যা ও পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা সিন্ডিকেটের হাতে রাখা হয়েছে বলে নীতিমালায় উল্লেখিত।