ঢাকা,  শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ রাজনীতি ]

বিএনপিতে সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য, হতাশ ত্যাগিরা

নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০:২৪, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিএনপিতে সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য, হতাশ ত্যাগিরা
বিএনপি লোগো

মুক্তার হোসেন
বাংলাদেশে রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তনের পর বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপট এবং রাজপথের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিজ্ঞতায় এক চরম হতাশা, বঞ্চনা ও ক্ষোভের চিত্র ফুটে উঠেছে। বিগত দেড় দশকের হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, রিমান্ড এবং চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করে যেসব নেতাকর্মী দলীয় আদর্শে অটল ছিলেন, বাস্তবে তারা আজ চরম অবমূল্যায়িত। দুঃসময়ে এসব ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত বন্ধুদের কোনো বাড়তি বৈষয়িক সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক সহযোগিতার আবদার ছিল না। তখন পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাত থেকে বেঁচে থাকা, আত্মগোপন করা এবং আদালতের বারান্দায় আইনি লড়াই চালানোই ছিল মুখ্য। আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে এবং নিজেদের পরিবার কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে ওই ত্যাগী নেতাকর্মীরা উল্টো স্বজনদের আর্থিক সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন। রাজপথের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।


সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়গুলোকে কেন্দ্র করে। দায়িত্বশীল সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারণী পদে থাকা বিএনপি সমর্থিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের একটি বড় অংশের কাছেও এখন রাজপথের নিঃস্বার্থ কর্মীদের চেয়ে সুবিধাবাদী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বেশি কদর পাচ্ছে। দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোতে সুবিধাবাদীদের এমন দাপট তৈরি হয়েছে যে, কিছুদিন আগে বিএনপির মিডিয়া সেলে এক চিহ্নিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে অন্তর্ভুক্ত করার মতো ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বাদ দিতে হয়। আবার ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসির ফাঁস হওয়া অডিওতে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পদ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠার পর তাকে সরিয়ে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে সুবিধাবাদীদের অর্থের প্রভাব কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে। মাঠের কর্মীদের স্পষ্ট অভিযোগ, এসব প্রভাবশালী নেতাদের চারপাশে চাটুকার ও সুবিধাভোগী চক্র এমন এক বলয় তৈরি করে রেখেছে, যারা অর্থ ও লবিংয়ের জোরে সার্বক্ষণিক তাদের সান্নিধ্যে থাকে। এলাকা বা সমাজের সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের চেনেন এবং যেকোনো বিপদ-আপদে, এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন, নলকূপ বা সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক সহযোগিতার আশায় তাদের কাছেই ছুটে আসেন। কিন্তু দায়িত্বশীলদের কাছে সুবিধাবাদীদের আধিপত্য থাকায় সাধারণ মানুষের এসব ন্যায্য দাবি বা ছোটখাটো সমস্যার সমাধানও রাজপথের কর্মীরা করে দিতে পারছেন না। ফলে জনগণের কাছে মুখ রক্ষা করাও ত্যাগীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমপি-মন্ত্রী বা দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে কাজের জন্য গেলে ত্যাগীদের একপাশে সরিয়ে উপেক্ষা করা হয়, আর সুবিধাবাদীরা অর্থের বাণিজ্য নিয়ে সেসব কাজ হাসিল করে নেয়।
একই চিত্র দৃশ্যমান প্রশাসনিক ও টেন্ডার ব্যবস্থার ভেতরে। বিসিআইসি এবং রাজউক এর মতো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও বিগত আমলের সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে কলকাঠি নাড়ছে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প কিংবা বালিশ কাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির সাথে জড়িত প্রশাসনিক চক্রটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থ ও লবিংয়ের জোরে খোলস বদলে ভালো ভালো পোস্টিং নিশ্চিত করছে। নতুন প্রেক্ষাপটে বড় বড় সরকারি টেন্ডার বা ঠিকাদারি কাজে অংশ নেওয়ার মতো ব্যাংক গ্যারান্টি, অভিজ্ঞতা বা মূলধন রাজপথের নিঃস্ব কর্মীদের নেই। সরকারি বিধিমালার মারপ্যাঁচে অভিজ্ঞতা সনদ এবং বিপুল অঙ্কের টার্নওভার দেখানোর বাধ্যবাধকতা থাকায় আগের সেই ক্ষমতাসীনদের সমর্থক ও অসাধু ঠিকাদাররাই দায়িত্বশীলদের ম্যানেজ করে নতুন করে বড় বড় টেন্ডার হাতিয়ে নিচ্ছে।
এছাড়া, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও সাইবার যুদ্ধের ময়দানে দেখা যায় চরম বৈপরীত্য। বাস্তবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলাদারিত্ব কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে অর্থের বিনিময়ে আসা সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড চক্রটি। অথচ এসব অপকর্মের দায় যখন পুরো দলের ওপর এসে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, তখন দলকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান রাজপথের সেই বঞ্চিত ত্যাগী নেতাকর্মীরাই। নিজেদের রক্ত ও ঘামে গড়ে তোলা দলের সুনাম বাঁচাতে তারা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে লড়ে যান এবং দলকে ডিফেন্ড করেন। অর্থাৎ, ক্ষমতার আশপাশে থেকে অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে সুবিধাবাদীরা, আর সেই অপকর্মের তকমা মাথায় নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে দলীয় আদর্শ রক্ষায় গালি খাচ্ছেন ও ডিফেন্ড করছেন তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীরা।
অন্যায় ও ক্ষমতার অনৈতিক লেনদেনের কারণে ত্যাগী কর্মীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, কারণ তাদের পরিবারের সরকারি চাকরিজীবী সদস্যরাও রাজনৈতিক ট্যাগ ও লবিংয়ের অভাবে প্রমোশন ও পোস্টিংয়ে আগের মতোই বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। রাজপথের কর্মীরা নিজের দলের লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে স্বজনদের প্রমোশন বা বদলির সুপারিশ করানোর কথা ভাবতেও পারেন না, ফলে তাদের স্বজনরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। সততা, আদর্শ ও রাজপথের লড়াকু ইতিহাসকে দূরে ঠেলে দিয়ে যখন জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের কাছে টাকা ও সুবিধাভোগীদের অবস্থান প্রাধান্য পায়, তখন তা পুরো সংগঠনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। বিএনপি হাইকমান্ড ও শীর্ষ নেতৃত্ব যদি অবিলম্বে এই সুবিধাবাদী-চাটুকার চক্রের অপকর্ম বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ না নেয় এবং ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন না করে, তবে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া তৃণমূলের মূল শক্তি চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে।
বিগত বছরগুলোতে রাজপথে সক্রিয় থাকা জেলা পর্যায়ের এক তৃণমূল কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, "বিগত দেড় দশকে পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছি, ডজন ডজন রাজনৈতিক মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে কোর্টের বারান্দায় কেটেছে জীবন। পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। আর আজ যখন দলের সুসময় এলো, তখন দেখছি যারা এতদিন ঘরে লুকিয়ে ছিল বা বিদেশে আরামে ছিল, তারাই বড় বড় পদ নিয়ে মঞ্চে বসে আছে! আমাদের কথা শোনার কেউ নেই।"
নারায়ণগঞ্জের এক স্থানীয় তৃণমূল নেতা কমিটি গঠন ও কোন্দল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করে সুবিধাবাদীরা এখন নানা অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে এবং নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। তাদের এই হাইব্রিড দাপটের কারণে দলের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং আমরা সাধারণ মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না।"
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা বলেন,"দলকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হাজার হাজার কর্মী গুম, খুন ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ত্যাগীরাই হলো বিএনপির অক্সিজেন। দল কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কে জড়ালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় এই ত্যাগী কর্মীরাই, কোনো সুবিধাবাদীরা নয়।"
যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যারা সংকটের সময়ে বা দলের কঠিন সংগ্রামের দিনে দল ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, সুসময়ে তাদের কোনোভাবেই দলে স্বাগত জানানো হবে না।"
সুবিধাবাদীদের দলে ভেড়ার প্রবণতা নিয়ে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু বলেন, "এতদিন যারা অন্য দল করেছে, এখন পরিস্থিতি বুঝে বিএনপি করবে—এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অচিরেই ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে সততা ও দুর্দিনের ত্যাগীকে মূল্যায়নের মাপকাঠি নির্ধারণ করা হবে"
অনুপ্রবেশকারী ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দলের 'জিরো টলারেন্স' নীতি পুনর্ব্যক্ত করে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, "যারা চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলের সাথে জড়িত, তারা আমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বা মিশনের অংশ নয়। তাদের অবশ্যই এর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।" দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. নাঈম আখতার সিদ্দিকীর মতে, বিএনপি হাইকমান্ড যদি অবিলম্বে এসব সুবিধাবাদী, অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিড গোষ্ঠী দূরীকরণে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে দীর্ঘকাল ধরে ত্যাগ স্বীকার করা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। অচিরেই ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে সততা ও দুর্দিনের ত্যাগকে মূল্যায়নের মাপকাঠি না করলে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও মৌলিক শক্তি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।

Advertisement
ডেইলি-বাংলাদেশ//এমএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!