Alexa পূর্ণতার পাথেয় প্রবীণের ঝুলি

ঢাকা, শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬,   ১৯ সফর ১৪৪১

Akash

পূর্ণতার পাথেয় প্রবীণের ঝুলি

 প্রকাশিত: ১৭:৩২ ১ অক্টোবর ২০১৯  

১৯৯২ সালের ৫ মার্চ গোপালঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রনি রেজা। প্রকৃতির রূপবৈচিত্রে ঘেরা গ্রামটিতেই তার বেড়ে ওঠা। সমাজবিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করা হলে বাংলা সাহিত্যে রয়েছে বিশেষ ঝোঁক। ছাত্রজীবনে দেশের প্রথম সারির দৈনিকগুলোতে লিখতেন ফিচার, প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা। সে থেকেই যোগাযোগ গণমাধ্যমের সঙ্গে। একসময় এই সাহিত্যের গলি বেয়েই ঢুকে পড়েন সাংবাদিকতায়। দৈনিক ভোরের পাতা, সংবাদ প্রতিদিন, যমুনানিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম ও আজকের বাজার পত্রিকায় কাজ করেছেন সহ-সম্পাদক ও সিনিয়র সহ-সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশের মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি অব্যাহত রেখেছেন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে লেখালেখি।

আফ্রিকায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘একজন বৃদ্ধের মৃত্যু হলে পৃথিবী একটি গ্রন্থাগার হারায়।’ আজকের প্রবীণরা একদিন কর্মচঞ্চল তরুণ ছিলেন। তাদেরও ছিল পূর্ণ উদ্যোমে কাজ করার শক্তি। যা দিয়ে পূর্ণ করেছেন অভিজ্ঞতার ঝুলি। আর সেই ঝুলি থেকে সঠিকরূপে গ্রহণ করতে পারলেই নবীনরা পূর্ণতা পায়।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদুর্দ্ধ বয়সী ব্যাক্তিদের প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। যদিও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বয়সের ফ্রেমে প্রবীণত্বকে বন্দী করতে চাননি। তিনি অনেক নবীনের মাঝে প্রবীণত্ব ও বহু প্রবীণের মাঝে নবীনত্ব দেখতে পেয়েছেন। দেখিয়েছেন প্রবীণের অভিজ্ঞতার শক্তি। পুরো একটি জীবন খরচ করে যে অভিজ্ঞতা প্রবীণরা অর্জন করেছেন তা মোটেও উপেক্ষার মতো নয়। সূর্য যেমন দিন শেষে চতুর্দিক রাঙিয়ে দিয়ে অস্ত যায়, তেমনি একজন মানুষ যত প্রবীণ হতে থাকেন ততই তার চতুর্পাশ রাঙিয়ে দিতে থাকেন। সেই আলোর ঝলকানিতে নতুনরা খুঁজে নেয় চলার পাথেয়। পূর্ণ করে নিজের ঝুলি। অভিজ্ঞতার আলো দিয়ে পথ দেখাবেন প্রবীণরা আর নবীনরা গড়বে দেশ, জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিবে উদ্যমে আর উৎসাহে। রচনা করবে কল্যাণকর সুন্দর জীবনের পথ। যা দেশেরই কল্যাণ রচনা করবে। কিন্তু যদি হয় এর উল্টো, তবে অকল্যাণের শেষ নেই। যা বর্তমানে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে বসেছে।  বর্তমান সময়ের তরুণরা নবীণদের তেমন মানতেই চায় না এমন অনেক অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবহেলাও করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঐতিহ্যমÐিত যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থার ফাটল আর পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। সাধারণত একান্নবর্তী পরিবার-ব্যবস্থায় প্রবীণদের অবস্থান থাকে অত্যন্ত সম্মানজনক। কিন্তু পশ্চিমা সমাজ-ব্যবস্থার প্রভাব এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে দেশের প্রবীণরা আজ পরিবার-সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কাছে বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এক সময় আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

এমনও মূল্যবোধ এক সময় সমাজে ছিল যে, একজন বয়স্ক মানুষ ঘরে থাকলে মনে করা হতো পরিবারটি একটি বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ার নিচে রয়েছে। কিন্তু এই আধুনিকায়নের যুগে, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশে স্বাধীনতার নামে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয় পরিবারের মানুষগুলো। পরিবারের বয়স্ক মানুষটিকে অমান্য করে, তার ভালোবাসার বাইরে গিয়ে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি তা হচ্ছে সন্তানকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া। আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে- প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা। বর্তমানে বসবাসরত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯৫ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ কোনো না কোনো ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। প্রত্যেক মানুষ যখন বার্ধক্যে পা দেন তখন তার সঙ্গে যোগ হয় কিছু শারীরিক পরিবর্তন। বিশ্ব প্রবীণ জনসংখ্যা প্রতিবেদন ২০১৩-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে ১৯৭৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রবীণ জনসংখ্যা যে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা খুব স্পষ্ট। যেমন- ১৯৭৪ সালে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৭ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২০ শতাংশ। অনুমান করা হচ্ছে, এভাবে যদি দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেতে থাকে, তা হলে ২০৫০ সালে এ দেশে প্রতি পাঁচজনের মাঝে একজন হবে প্রবীণ। তথ্যমতে, বর্তমানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রবীণ বিবাহিত ও বিবাহিত প্রবীণ নারীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিধবা এবং ৯৮ শতাংশ প্রবীণের সন্তান রয়েছে। তাছাড়া অন্য এক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭০ শতাংশ প্রবীণ বেতন বা মজুরিভিত্তিক কোনো-না-কোনো কাজের সাথে জড়িত। অন্যদিকে প্রবীণ নারীদের মধ্যে অধিকাংশ বেতন বা মুুরিবিহীন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
২০১০ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকার মোট জনসংখ্যার প্রবীণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ সে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। তাছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় ছিল মোট জনসংখ্যার ৮.৯ শতাংশ, ভারতে ৭.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ছিল ৬.৩ শতাংশ প্রবীণ জনগোষ্ঠী। দেশে দেশে প্রবীণদের বয়সভেদে সংখ্যাগত দিকে বেশ তারতম্য রয়েছে। যেমন- বাংলাদেশে ৮০-এর অধিক প্রবীণ মানুষের সংখ্যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ০.৫৭ শতাংশ হলেও নেপালে এই হার ০.৪৬ শতাংশ। আবার নেপালে ৭৫ থেকে ৭৯ বয়সের প্রবীণ মানুষের সংখ্যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ০.৭১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এই সংখ্যা ০.৬৮ শতাংশ।

ক্রমান্বয়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে- এ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা। প্রবীণদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্রমে ভঙ্গুরতার দিকে ধাবিত হয়। এসবই আসে বার্ধক্যের গলিপথ বেয়ে। বার্ধক্য এমনই এক সত্য। যা মেনে না নেয়া আরাধ্য মানবজীবনের এক অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়াকে মানব জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সময় একজন মানুষ বহুমাত্রিক সমস্যায় পতিত হন। পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তির কর্মক্ষমতা একটু একটু করে হ্রাস পায়। ফলে প্রবীণদের মাঝে পরনির্ভশীলতা বাড়ে। তাছাড়া এ সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে দেহে বাসা বাঁধে কিছু ‘চিরাচরিত রোগ’। পরিবার ও পরিবেশ যদি প্রবীণবান্ধব না হয় এবং প্রবীণ ব্যক্তিটি নিজেও যদি স্বাস্থ্য সচেতন না হন, এ ক্ষেত্রে ভোগান্তির মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ। সময়ের এই তো বিধি- আমরা কখনও বার্ধক্যকে রোধ করতে পারি না; কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকে সহনশীল পর্যায়ে রাখতে পারি। এ জন্য প্রয়োজন প্রবীণ ব্যক্তি, তার পরিবার, সমাজ কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। এসব সমস্যার কারণে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। অমূল্য অভিজ্ঞতার ঝুলি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে অবহেলার পাত্রে। যার প্রতিচ্ছবি আমরা বৃদ্ধাশ্রমগুলোয় দেখতে পাই। প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা দেয়া হলে কখনোই বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার কথা নয়।

একসময় যে বৃদ্ধদের বটগাছ হিসেবে মান্য করা হতো আজ তাদের বৃহৎ একটা অংশের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম। কারণ যতই থাকুক না কেন নবীনদের ভুললে চলবে না আজকের প্রবীণরাই একসময় দেশের উন্নতির জন্য তরুণদের ভালোর জন্য নিজের সবটুকু শক্তি সামর্থ উজাড় করে দিয়ে কাজ করেছেন। আজকের তরুণটি যে উন্নত, আধুনিক সমাজের বড়াই  কওে; সবই প্রবীণদের সৃষ্ট পথ ধরে এসেছে। ক্রমাগত উন্ননয়ের মাধ্যমে আজ নবীনরা যেটিকে সর্বাধুনিক করে তুলছে এটিও একদিন বাদ হয়ে যাবে। আবার আসবে নতুনরা; জায়গা করে নিবে তারা। কিন্তু আজকের প্রচেষ্টা, আজকের অর্জনও ভুলবার নয়। এভাবেই পরিবর্তন আসে। আসবে। কিন্তু অতীতকে অবহেলা করলে, অস্বীকার করলে হবে চরম ভুল। বলাই যায়- অতীতের গলিপথ বেয়েই আসে বর্তমানের সমস্ত অর্জন। আর প্রবীণদেও অভিজ্ঞতার ঝুলিতেই লুকিয়ে থাকে নবীনদের পূর্ণ হওয়ার পাথেও।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর