ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ আন্তর্জাতিক ]

গণতন্ত্রী নেত্রী থেকে গণহত্যাকারী সু চি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:১৮, ২৯ জানুয়ারি ২০২০
গণতন্ত্রী নেত্রী থেকে গণহত্যাকারী সু চি
ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের গণতন্ত্র পন্থী নেত্রী অং সান সু চি। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য নিজ দেশের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়ার কারণে তাকে ডাকা হত এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা নামে। গণতন্ত্রের কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক নোবেল পুরস্কারও। কিন্তু নিজ দেশের রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিকদের গণহত্যার ঘটনায় সেনাবাহিনীর পক্ষ নেয়ায় হারিয়েছেন সবই। সঙ্গে জুটেছে গণহত্যাকারীর তকমা।

রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) যখন নিজ দেশের সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইতে হাজির হয়েছিলেন, তখন খুইয়েছিলেন নিজের কষ্টার্জিত আন্তর্জাতিক সম্মানের অবশেষটুকুও।

আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা গণহত্যার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন তিনি। তবে আদালতকে প্রভাবিত করতে পারেননি। গত সপ্তাহে রোহিঙ্গা গণহত্যা রোধে মিয়ানমারকে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আইসিজে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইসিজে মিয়ানমারকে গণহত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার পর সু চি এখন কেবলই একজন ক্ষমতালিপ্সু স্বৈরাচার, যিনি ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের পক্ষে দাঁড়ান। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক বিশ্নেষণে এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে সু চিকে।

সু চির সাবেক ভক্তদের মতে, তিনি কেবল নিজেদের প্রতিরক্ষার পক্ষে কথা বলছেন, রোহিঙ্গাদের রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক সময় সু চির ব্যাপক প্রশংসা করেছিলেন। ওবামা বলেন, বছরের পর বছর ধরে সু চির নিরলস প্রচেষ্টা ও ত্যাগের কারণে মিয়ানমার আরও বেশি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক হয়েছে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার খবর প্রকাশের পর ১৯৮৪ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু সু চিকে একটি খোলা চিঠি লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।

চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমার প্রিয় বোন, জনজীবনে আপনার উত্থান হওয়ার পর রোহিঙ্গা নিপীড়ন প্রশ্নে আমাদের উদ্বেগ প্রশমিত হয়েছিল। কিন্তু এখনও রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ করছে কেউ কেউ। ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হিসেবে কোনো ব্যক্তি দেশ পরিচালনা করতে গেলে এ বিষয়গুলো তার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হওয়ার কথা। এমন যদি হয় যে, আপনার নীরবতা হলো মিয়ানমারের সর্বোচ্চ পদে অসীন হওয়ার রাজনৈতিক মূল্য চুকানো, তবে নিশ্চিতভাবে বলব, এ মূল্যটা খুব চড়া হবে।

তিনি লিখেছেন, আমরা আপনার জনগণের জন্য ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ঐক্যের পক্ষে প্রার্থনা করছি। আমরা আপনার হস্তক্ষেপ আশা করছি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও জাতিসংঘের দূত বিল রিচার্ডসন বলেন, আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশের পর সু চি তার সব মানসম্মান খুইয়েছেন। গণতন্ত্রের জন্য নোবেলজয়ী থেকে তিনি আজ রূপান্তরিত হয়েছেন একজন স্বৈরশাসক হিসেবে। শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সামরিক নিপীড়ন, গণহত্যা ও রোহিঙ্গা নিধনকে বৈধতা দিচ্ছেন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনায় গণহত্যার আলামত পেলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সু চিও রোহিঙ্গাদের পক্ষে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা নিতে সক্ষম হননি। বরং গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতেও কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নেননি তিনি, উল্টো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে থাকার দায় ঢাকার ওপর চাপিয়েছেন। সব মিলে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরক্ষায় তার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে হয়েছে।

মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সু চির অহিংস আন্দোলন চূড়ান্ত সাফল্য পায় ২০১৫ সালে। ওই বছর তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। আশা করা হচ্ছিল, এর মাধ্যমে মিয়ানমার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করবে।

তবে দ্রুতই বিপরীত ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। ক্রমশ পতনের পথে ধাবিত হতে থাকেন সু চি। পতনের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো হওয়ার পর।

ওই বছরের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের বাস্তবতায় জীবন বাঁচাতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে গত ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মামলা করে গাম্বিয়া।

গত বছর ডিসেম্বরে ওই মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের পক্ষে সাফাই গান সু চি। বিশ্বপরিসরে সু চি মানবাধিকার হরণের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়েছিলেন যতটা না আদালতে লড়াই করার জন্য, তার থেকে বেশি নিজ দেশে তার জাতীয়তাবাদী গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করতে।

সু চির এই অবস্থানের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতার। নিজ দলের বিশাল বিজয়ের পরও সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রশ্নে এখনও দেশের প্রকৃত শাসক সেনাবাহিনী।

সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ে সু চির মিত্র ছিল লবিং গ্রুপ বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে। তারা মনে করছে, সু চি রোহিঙ্গা নিধনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন নিজেকে জাতীয়তাবাদী প্রমাণ করে আসন্ন নির্বাচনে তার ভোট বাড়ানোর স্বার্থে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/মাহাদী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!