ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ ভ্রমণ ]
মস্কো থেকে বিশ্বপথে

কাবুলের বরফ ও ভল্লুকের ফাঁদ: প্রফেসর কোভালের স্মৃতিতে আফগান যুদ্ধ

মোহাম্মদ কামরুল হাসান
প্রকাশিত: ১০:৫৫, ২২ অক্টোবর ২০২৬
কাবুলের বরফ ও ভল্লুকের ফাঁদ: প্রফেসর কোভালের স্মৃতিতে আফগান যুদ্ধ
যুদ্ধটি মূলত সোভিয়েত বাহিনী ও আফগান মুজাহিদীনদের মধ্যকার সংঘর্ষ হলেও এর পটভূমি ছিল শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা


পর্ব-চার
বাইরে তীব্র তুষারপাত, ঝড়ুবৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়া—যাই হোক না কেন, আন্দ্রে কোভাল স্যারকে সবসময়ই ইউনিভার্সিটিতে পাওয়া যেত। কখনো কোনো কম্পিউটার ল্যাবে, কখনো বা আইটি ডিপার্টমেন্টের শান্ত কোণে তিনি নিজের কাজে নিমগ্ন থাকতেন—ক্লাস নিতেন, গবেষণা করতেন কিংবা নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্টে ব্যস্ত থাকতেন। 

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করা তাঁর অভ্যাসের মতোই ছিল, আর তাঁর বিনয়ী, মিষ্টভাষী স্বভাব সবাইকে নির্ভরতা দিত।

Voronezh State University তে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইটি বিষয়ে পড়তে আসা দেশিুবিদেশি প্রায় সব শিক্ষার্থীর কাছেই তিনি একজন পরিচিত ও আপন মানুষ। তাঁর কাছ থেকে শেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি মূল্যবান অধ্যায় হয়ে থাকবে।

একদিন স্যার নিজেই শোনাচ্ছিলেন সোভিয়েতুআফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি সোভিয়েত পক্ষ হয়ে সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে এই বিষয় নিয়ে তাঁর তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। কারণ, কমিউনিস্ট আমলে যুদ্ধ করা ছিল বাধ্যতামূলক; প্রায় সব সোভিয়েত পুরুষ নাগরিককেই সামরিক সেবায় অংশ নিতে হতো। 

এখনো সেই প্রথার কিছু অংশ বলবৎ আছে—বর্তমান রাশিয়ায়ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক পুরুষ নাগরিককে দুই বছর সামরিক সেবায় থাকতে হয়, শুধুমাত্র যাঁরা শারীরিকভাবে অনুপযুক্ত, তাঁরা ব্যতিক্রম।

২৪ ডিসেম্বর, ১৯৭৯.....
আফগানিস্তানের পর্বত ঘেরা এক শীতল ভোর। কাবুলের আকাশে যেন এক অদৃশ্য ছায়া নেমে আসে—সোভিয়েত রেড আর্মির ট্যাঙ্ক আর হেলিকপ্টারের গর্জন। শহরের মানুষ মনে করল, যেন দুঃস্বপ্নের শুরু।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯-১৯৮৯) আধুনিক বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব বিস্তারকারী সংঘর্ষ। ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে সামরিকভাবে স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সোভিয়েত রেড আর্মি দেশটিতে প্রবেশ করলে এ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। 

যুদ্ধটি মূলত সোভিয়েত বাহিনী ও আফগান মুজাহিদীনদের মধ্যকার সংঘর্ষ হলেও এর পটভূমি ছিল শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

আফগান সরকারি সেনাবাহিনী সোভিয়েত বাহিনীকে সমর্থন করলেও দুর্বল প্রশিক্ষণ, সীমিত অস্ত্রসজ্জা এবং মনোবলহীনতার কারণে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। এর বিপরীতে, মুজাহিদীন গোষ্ঠীগুলি স্থানীয় জনসমর্থনের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তানসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেয়ে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর অর্থনৈতিক চাপ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সাথে আন্তর্জাতিক সমালোচনা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গর্বাচেভের গ্লাসনস্তুপেরেস্ত্রোইকা নীতির ফলে সোভিয়েত সরকার যুদ্ধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

১৯৮৭ সালে গর্বাচেভ আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ১৫ মে সৈন্য প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কাছে এই যুদ্ধটি প্রায়ই “সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনাম” বা “ভল্লুকের ফাঁদ” হিসেবে চিহ্নিত, কারণ এটি শুধু সোভিয়েত সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতাই উন্মোচন করেনি, বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের সামগ্রিক পতনের অন্যতম প্রভাবক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
(চলবে)

লেখক : মোহাম্মদ কামরুল হাসান, আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং ভ্রমণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্ব রাজনীতি বিষয়ক লেখক।


 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!