ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ ভ্রমণ ]

শরীর ও মনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ভ্রমণে

মাহি আছহাব স্বপ্নীল
প্রকাশিত: ১১:৫৫, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
শরীর ও মনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ভ্রমণে
গবেষণায় দেখা গেছে যে সঠিকভাবে পরিকল্পিত ভ্রমণ মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে

ভ্রমণ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুখের জন্য অনেক সুবিধা প্রদান করতে পারে। এটি আমাদের প্রতিদিনের রুটিন থেকে দূরে সরে যেতে, আমাদের মন এবং শরীরকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং নতুন জিনিসগুলি অনুভব করতে দেয় যা আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার উন্নতি করতে পারে। সুতরাং, আপনি যদি আটকে, চাপ বা পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ করেন, তাহলে আপনি যে ট্রিপের স্বপ্ন দেখছেন সেটি বুক করার কথা বিবেচনা করুন!

ভ্রমণ মানুষকে সুস্থ রাখে। শরীর ও মন উভয় উজ্জীবিত হয়। অন্তত গবেষণা তা–ই বলছে। এ জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম না করে ছুটি নিয়ে ঘুরে এলে বাড়বে কাজের উৎসাহ। সুখ একটি গন্তব্য নয়, এটি একটি যাত্রা। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে লালন করার জন্য সময় নিন এবং আপনার চারপাশে আনন্দ ছড়িয়ে দিন।

 "নিয়মিত ভ্রমণ করলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে"—
এই ধারণাটি অনেকাংশেই বিজ্ঞানসম্মত। তবে এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়; বরং গবেষণায় দেখা গেছে যে সঠিকভাবে পরিকল্পিত ভ্রমণ মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এর কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ হলো—

- প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা মানসিক চাপ (স্ট্রেস) কমাতে সাহায্য করে এবং মনকে শান্ত করে।

- নতুন পরিবেশ ও নতুন অভিজ্ঞতা মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে, একঘেয়েমি কমায় এবং ইতিবাচক অনুভূতি বাড়ায়।

- হাঁটা, ট্রেকিং বা ঘোরাঘুরি শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ায়, যা এন্ডোরফিন ও সেরোটোনিনের মতো "ভালো লাগার" রাসায়নিক নিঃসরণে সহায়তা করে।

- পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ সামাজিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

- কাজের চাপ থেকে সাময়িক বিরতি মনোযোগ, সৃজনশীলতা এবং কর্মক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।

ভ্রমণ থেকে দীর্ঘদিনের বিরতি মনের স্বাস্থ্যের জন্য একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। ট্যুরিজম অ্যানালাইসিসের একটি জার্নালে বলা হয়েছে, যাঁরা নিয়মিত ভ্রমণে যান, তাঁরা না যাওয়া বা কম ভ্রমণে যাওয়া মানুষের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি সুখী হন। এ ছাড়া উইসকনসিন মেডিকেল জার্নালে প্রকাশ, ১ হাজার ৫০০ নারীর ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রমণকারীরা কম হতাশা ও বিষণ্নতায় ভোগেন।

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণার তথ্য বলে, সারা বিশ্বে ২০১৬ সালে ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকে মারা গেছেন, যার প্রধান কারণ, ছুটি ছাড়াই অতিরিক্ত কাজ। তাদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে হার্টের অসুখের ঝুঁকি বাড়ে ৩৫ শতাংশ। আর সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজের মধ্যে থাকলে এই হার্টের অসুখ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে ১৭ শতাংশ।

চাপ কমানো
আমরা যখনই কোনো বিপদ অনুমান করতে পারি, শরীরে কর্টিসল ও এপিনেফ্রিনের মতো স্ট্রেস হরমোন তৈরি হয়। এ ছাড়া আমাদের প্রতিদিনের চাপময় জীবনের কারণেও এই হরমোন তৈরি হয়। আর দীর্ঘদিন এমন হতে থাকলে বাড়তে থাকে বিষণ্নতা, ওজন ও নিদ্রাহীনতা। এ ধরনের বিষণ্নতা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তিও কমিয়ে দেয়, যা আপনার নৈমিত্তিক কাজের জন্য মোটেও ভালো নয়। এ জন্য ভ্রমণের ভালো দিক হলো, তা শরীরে তৈরি হওয়া স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ কমায়; যা সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ সহজ করে। আবার কাজের মনোযোগও বাড়ায়।

বাড়ায় আনন্দ
ভ্রমণের সময়ে আপনার মন সাধারণ একটি দিনের থেকে অনেক বেশি ভালো থাকে। আর এই আনন্দ বাড়ে ভ্রমণ পরিকল্পনার সময় থেকেই। কিন্তু দীর্ঘদিন শুধু পরিকল্পনার করতে থাকলে আবার এর পরিমাণ কমতে শুরু করে। পরিকল্পনার কিছুদিনের মধ্যেই ভ্রমণে চলে গেলে যথাযথভাবেই এই আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব।

হৃদ্‌যন্ত্র ভালো রাখে
বিভিন্ন রকম গবেষণায় পাওয়া গেছে ভ্রমণ হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী। নিয়মিত কম বা বেশি দিনের ভ্রমণে যাওয়া সম্ভব হলে রক্তে খারাপ কোলেস্টরলের পরিমাণ কমতে শুরু করে। তথ্য আরও বলে, বছরের বেশি সময় যাঁরা বাসাতেই থাকেন, তাঁরাই এ ধরনের অসুখে বেশি ভোগেন।

ভালো ঘুমের দাওয়াই
অতিরিক্ত কাজ আপনার ঘুমের পরিমাণ কমায়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমায় আর হতাশা তৈরি করে। শরীরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় ক্লান্তি। কিন্তু ভ্রমণ পরিকল্পনা করা থেকেই আপনার ঘুমের সমস্যা কমতে শুরু করে। ভ্রমণে যাওয়ার আগে ও ভ্রমণ থেকে আসার পরও ভালো ঘুমের সুফল পাওয়া যাবে।

মনোযোগ বাড়ায়
একটানা কাজে আপনার মস্তিষ্কের কার্যকরিতা কমে। এতে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অতিরিক্ত চাপে স্মৃতিশক্তিও কমতে থাকে ধীরে ধীরে। অন্যদিকে ভ্রমণে আসে মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন। ভ্রমণের পর আপনি আরও বেশি মনোযোগী ও উৎসাহিত অনুভব করবেন, যা বাড়াবে কার্যক্ষমতা।

কমবে শারীরিক অসুস্থতা
অতিরিক্ত কাজ বা পরিশ্রম অ্যাড্রিনাল সিস্টেমকে চাপে ফেলে দেয়। ভ্রমণ অ্যাড্রিনালিন হরমোনের নিঃসরণকে স্বাভাবিক রাখে। ফলে আমাদের শরীর ও মন ভালো থাকে। অন্যদিকে মানসিক চাপ এই হরমোণের নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে।

বাড়ায় জীবনীশক্তি
গবেষণা বলে, ভ্রমণে বাড়ে জীবনীশক্তি। এর প্রধান কারণ, ভ্রমণ মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর রাখে। কমে মানসিক চাপ, হতাশা ও বিষণ্নতা। এ সবই বেঁচে থাকার আনন্দ বাড়ায়।

সুন্দর করে সম্পর্ক
মানসিক চাপ প্রভাব ফেলে সম্পর্কে। ফলে কমতে থাকে সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানো এবং কথা বলার ইচ্ছা। ভ্রমণে গেলে নতুন স্থানের প্রভাব পড়ে। কমে মানসিক চাপ। সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটাতে ও বিভিন্ন বিষয়ে গল্পে বাড়ে উৎসাহ।

কিভাবে ভ্রমণ আপনার মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুখ উন্নত করে?
ভ্রমণ একজনের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে জানা গেছে। এখানে কিছু উপায় রয়েছে যা ভ্রমণ আপনার মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুখকে উন্নত করতে পারে:

১. মানসিক চাপ কমানো : ভ্রমণ আপনাকে দৈনন্দিন রুটিন থেকে বেরিয়ে আসতে এবং নতুন স্থান ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা লাভ করতে সাহায্য করে। এটি আপনাকে জীবন সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে এবং আপনার দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ কমাতে পারে।

২. সৃজনশীলতা বৃদ্ধি : ভ্রমণ সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলার এবং মনকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করার একটি দুর্দান্ত উপায়। নতুন কোনো শিল্পকলার অভিজ্ঞতা লাভ করা, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া, বা প্রাকৃতিক বিস্ময় অন্বেষণ করা—যা-ই হোক না কেন, ভ্রমণ আপনাকে এমন নতুন অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় যা সৃজনশীলতাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

৩. আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি : একা ভ্রমণ আপনাকে আরও আত্মসচেতন এবং স্বচ্ছন্দ হতে সাহায্য করতে পারে। যখন আপনি অপরিচিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তখন আপনি নিজের উপর নির্ভর করতে শেখেন এবং নিজের সামর্থ্যের উপর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

৪. সংযোগ স্থাপন : ভ্রমণের মাধ্যমে আপনি নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে এবং নতুন সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। এটি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে এবং আপনার মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতির অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

৫. জ্ঞানীয় কার্যকারিতার উন্নতি : গবেষণায় দেখা গেছে যে ভ্রমণ জ্ঞানীয় কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে। নতুন অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক আলাপচারিতা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগের পরিসর এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা উন্নত করতে পারে।

তথ্যসূত্র: এনপিআর ও এভরিডে হেলথ

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!