ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]

স্ত্রীকে প্রেম নিবেদন করতে বাহারি উপহার দেয় রাজ ধনেশ!

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:১৩, ৬ মে ২০২০
স্ত্রীকে প্রেম নিবেদন করতে বাহারি উপহার দেয় রাজ ধনেশ!
ছবি: রাজ ধনেশ পাখি

প্রকৃতির অপরূপ শোভামণ্ডিত পাখি রাজ ধনেশ। ইংরেজিতে রাজ ধনেশকে গ্রেট হর্নবিল, গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিল বা গ্রেট পাইড হর্নবিল বলা হয়। হর্নবিল পরিবারভুক্ত সর্ববৃহৎ প্রজাতি এটি। রাজ ধনেশ পাখির আকার ও গাঁয়ের রঙে ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত রাজ ধনেশ পাখি দীর্ঘজীবী হয়।  

গ্রেট হর্নবিল বা রাজ ধনেশ পাখি ৯৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। ডানা মেলা অবস্থায় এর দুই ডানা ১৫২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। পাখিটির ওজন দুই থেকে চার কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের ঠোঁট বেশ বড় আকারের এবং নিচের দিকে বাঁকানো।

গাছের কোঠরে বাসা বাঁধে তারারাজ ধনেশের গায়ের পালক কালো, সাদা এবং হলদে। কিছু কিছু পাখির ডানার মাঝ বরাবর লম্বা সাদা দাগ থাকে।স্ত্রী পাখিগুলো পুরুষ পাখির থেকে আকারে ছোট হয়। পুরুষ রাজ ধনেশের চোখের রঙ লাল হয় এবং স্ত্রী পাখির চোখের রং নীলাভ সাদা রঙের হয়ে থাকে। পাখিটির চোখের পাতার লোমের জন্য বেশ বিখ্যাত। 

রাজ ধনেশ উড়ার সময় দূর থেকে এদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ সোনা যায়। বনের উপর অনেক উঁচুতে উড়তে পারে এরা। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় রাজ ধনেশের মূল আবাসভূমি। বাংলাদেশে রাজ ধনেশ পাখি বিপন্ন প্রায়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলে খুবই অল্প পরিমাণ আছে। 

ডানা মেলে উড়ছে রাজ ধনেশএখন নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে পাখিটি দেখা যায়। রাজ ধনেশ দলবদ্ধভাবে চলতে পছন্দ করে। একটি দলে সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত পাখি থাকতে পারে। রাজ ধনেশের প্রধান খাবার ফল। তবে পোকামাকড়, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ছোট পাখিও খেয়ে থাকে। 

ফলজাতীয় খাবার বেশি খাওয়ায় শরীরের পানির অধিকাংশ চাহিদা সেখান থেকেই পূরণ হয়। রাজ ধনেশ অসম্ভব রোমান্টিক পাখি। তাদের সঙ্গী নির্বাচনের প্রক্রিয়াও খুবই চিত্তাকর্ষক। প্রজননের উপযুক্ত হওয়া পুরুষ ধনেশ পাখি দ্রুতই সঙ্গী নির্বাচন করে এবং স্ত্রী পাখিকে অনেক উপহার দেয়। 

স্ত্রী পাখির মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে পুরুষ রাজ ধনেশস্ত্রী পাখি যতক্ষণ উপহারগুলো গ্রহণ না করে ততক্ষণ নতুন সব উপহার নিয়ে আসে পুরুষ রাজ ধনেশ। সেরা উপহার আনা পুরুষ পাখিটিকেই সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে স্ত্রী ধনেশ পাখি। খাবার বস্তুই তাদের মূল উপহার সামগ্রী। মূল্যবান উপহারের মধ্যে আছে মৃত প্রাণী, হাড়, ডাল প্রভৃতি। 

স্ত্রী পাখিটিকে সর্বোচ্চ খুশি রাখতে চেষ্টা করে পুরুষ ধনেশ পাখি। তার সঙ্গেই আজীবন কাটাতে চায়। স্ত্রী পাখিটির কাছ থেকে একবার ইতিবাচক সংকেত পেলে আসল রোমান্স শুরু হয়। সঙ্গী পাতানোর প্রথম দিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রেম বেঁচে থাকে। 

গাছের ডালে বসে খাচ্ছে আর প্রেম করছে পাখি দম্পতিসঙ্গীর সঙ্গে কাটানো মহূর্তগুলো উভয় পাখিই উপভোগ করে। তারা কখনো সঙ্গীকে ঠকায় না এবং প্রেমে অগাধ বিশ্বাস রাখে। রাজ ধনেশ পাখি জীবনের শেষ অবধি সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করে। এ কারণেই এদেরকে রোমান্টিক পাখি বলা হয়।

বছরের যে কোনো সময় রাজ ধনেশের বাচ্চা জন্ম দেয়ার সক্ষমতা থাকলেও গ্রীষ্মকালই মূলত তাদের প্রজনন মৌসুম। এসময় পুরুষ এবং স্ত্রী উভয় পাখি মিলে গহীন বনে বাসা বাঁধে। লম্বা এবং বয়স্ক গাছের কোটরে তারা বাসা করে। 

গর্ভবতী স্ত্রীকে বাসায় রেখে খাবারের সন্ধানে যায় পুরুষ রাজ ধনেশএরপর স্ত্রী রাজ ধনেশ কুটিরের ভেতর ঢুকে নিজের বিষ্ঠা দিয়ে কুঠিরের প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়। তবে একটা সরু ছিদ্র রেখে দেয়। ডিম পাড়ার পর স্ত্রী ধনেশ বাচ্চা না ফোটানো পর্যন্ত বাইরে আসে না। এসময় পুরুষ রাজ ধনেশটি স্ত্রী পাখিটির জন্য ঠিক সময় মতো খাবার নিয়ে হাজির হয়। 

এরপর স্ত্রী ধনেশ ছোট ছিদ্র দিয়ে ঠোঁট বের করে দেয়। তখন পুরুষ ধনেশ স্ত্রী পাখিটির ঠোঁটে খাবার তুলে দেয়। রাজ ধনেশ পাখির অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে। উপজাতিরা এর ঠোঁট এবং মাথা কবজ তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। আর মাংস ওষুধ হিসেবে বিশ্বাস করে। 

পাখির ঠোঁট দুটি যেন ফুলের পাপড়ির ন্যায়বাচ্চা পাখি সুস্বাদু খাবার হিসেবে খায়। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বোর্নিওয়ের কিছু অংশের উপজাতিরা মাথার এক ধরনের পোশাক হিসেবে রাজ ধনেশ পাখির পালক ব্যবহার করে। তারা পাখিটির মাথার খুলি প্রায়শই সজ্জা হিসেবে ব্যবহার করে। অনেকে এর ডিমও খেয়ে থাকে। তবে সকলেরই উচিত অপূর্ব সুন্দর এই পাখিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করা।  

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!