ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

আমি শিক্ষক : যেভাবে শিক্ষার আলো ছড়াই

লতিফা নিলুফার পাপড়ি
প্রকাশিত: ১০:৪১, ৫ অক্টোবর ২০২৬
আমি শিক্ষক : যেভাবে শিক্ষার আলো ছড়াই
আমি শুধু চাই, আমার স্কুলের শিশুরা লেখাপড়াকে ভয় না পাক। স্কুলকে বোঝা মনে না করুক। তারা যেন স্কুলে এসে আনন্দ পায়। আর যারা একটু পিছিয়ে আছে, তারা যেন কখনো মনে না করে যে তারা অযোগ্য। কারণ একটি শিশুর আজকের দুর্বলতা তার আগামী দিনের পরিচয় নয়।

আজ পাঁচ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। আমি শহর থেকে বেশ দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চলতি দায়িত্ব পালন করছি। এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সারাদেশ থেকে ১০০ জন গুণী শিক্ষককে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুরস্কৃত করছে। আমাকে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্থাৎ গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল।

আমি অবশ্য জানি না, আসলেই আমার কোনো গুণ আছে কি না। কী যোগ্যতায় আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত আমাকে প্রথম স্থানে রেখেছেন, সেটিও জানি না। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক বাছাইয়ের জন্য অন্যদের সঙ্গে আমারও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সাধারণ জ্ঞানের মতো কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। সবগুলোর উত্তরই দেওয়ার চেষ্টা করেছি। জানি না, বাছাই কমিটির কাছে আমার উত্তর কতটা সন্তোষজনক হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আমাকে জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়নি। বিভাগীয় পর্যায়ে আমার চেয়ে নম্বর কম পেয়ে যিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন, তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। আমি তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

Advertisement

সাক্ষাৎকার দিতে ঢাকায় যাওয়ার সময় ট্রেনে বসে মোবাইলের নোটবুকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় কীভাবে উদ্বুদ্ধ করি এবং বিদ্যালয়ে কী কী কর্মকাণ্ড করি, তার কিছু কথা লিখে রেখেছিলাম। 

  • আজ শিক্ষক দিবসে সংবাদপত্রের পাঠকদের সামনে সেই কথাগুলোই তুলে ধরছি। হয়তো এগুলো পড়ে কোনো শিক্ষক অনুপ্রাণিত হবেন। আবার কেউ হয়তো বলবেন, এগুলো এমন কী কাজ! কেউ হয়তো মনে করবেন, এসব করে কী লাভ। সব ধরনের সমালোচনা জেনেই আমার কথাগুলো লিখছি।

যেসব শিশু অক্ষর চেনে, বলতে পারে এবং লিখতে পারে, তাদের জন্য প্রতি সপ্তাহে দুটি চকলেট থাকে। যারা পারে না, তাদের জন্যও চকলেট থাকে। তবে তাদের জন্য একটি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক শিশু খাতা পেনসিল নিয়ে আসে না। তাই তাদের জন্য নাম লেখা খাতা শ্রেণিকক্ষে রেখে দিই। লেখা শেষ হলে তারা খাতাগুলো স্কুলেই রেখে যায়।

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে রিডিং পড়তে পারে কি না, লিখতে পারে কি না, সাধারণ যোগ বিয়োগ করতে পারে কি না, সাধারণ ইংরেজি লেটার ও ওয়ার্ড বলতে এবং লিখতে পারে কি না, সেসব নিয়মিত অনুশীলন করানো হয়। 

মাসে একদিন ছড়া ও কবিতার বই উপহার দিই। এতে তারা উৎসাহ পায়। যারা সাবলীলভাবে পড়তে পারে, তাদের উৎসাহিত করি। যারা দুর্বল, তাদের একটি কলম দিই। প্রয়োজন হলে খাতাও দিই। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে রিডিং পড়তে পারলে মাসে একদিন তাদের অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় শিক্ষোপকরণ দেওয়া হয়।

  • প্রতি তিন মাসে মা সমাবেশ করি। যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসে এবং বাড়ির কাজ করে, তাদের মায়েদের কাপ, মগ, বাটি ইত্যাদি উপহার দিই। তাঁরা আনন্দ পান। অবশ্য নানা কারণে সব সময় তা সম্ভব হয় না। তারপরও কার্যক্রমটি চালিয়ে যাচ্ছি।

যেসব শিশু খুব বেশি দুর্বল, তাদের একই শ্রেণিতে রেখেই সামর্থ্য অনুযায়ী শেখানোর চেষ্টা করি। তারা কিছুটা পিছিয়ে আছে। তারপরও কারিকুলাম অনুযায়ী তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করি। তারা যেন লেখাপড়াকে বোঝা মনে না করে, সে জন্য অভয় দিই। আমি একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আনন্দময় শিখন পদ্ধতি গড়ে তোলা আমার আজীবনের স্বপ্ন।

আমাদের সমাজের অনেক পরিবারে নির্মমতার মধ্যে শিশুদের বড় হতে হয়। কেউ সকালে না খেয়ে স্কুলে আসে। কেউ বাবা মায়ের তীব্র কোলাহল, বিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক সহিংসতার সাক্ষী হয়ে স্কুলে আসে। ফলে তাদের মানসিক স্থিরতা থাকে না। 

এই কারণে গত দুই বছর ধরে আমি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। কোনো শিশুর মন খারাপ হলে আমি তার কারণ জানতে চাই না। কারণ সে লজ্জা পেতে পারে। আমি একটি কর্নার করে দিয়েছি। শিশুরা জানে, মন খারাপ হলে সেখানে এসে বসতে পারে। আমার নির্দেশনা হলো, মন ভালো হলে আবার সাধারণ বেঞ্চে বসবে।

আমি তাদের স্টাফ রুমে এনে বিস্কুট ও ব্রেড দিই। এ বিষয়টি নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বিভিন্ন আর্থিক সংকটের কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি না হলে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। তাই আমার শিক্ষক ও দপ্তরী সবার মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখি।তাদের অনেকটা নির্ভরতার স্থল আমি। একটু অভয় পেলে কেউই দায়িত্ব এড়িয়ে যায় না। বরং নতুন উদ্যমে কাজ করে। এর চাক্ষুষ প্রমাণ আমি পেয়েছি।

আমার স্কুলের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে তিনটি বক্স রেখেছি। নাম দিয়েছি ‘আমার স্বপ্নের স্কুল’। শিক্ষার্থীরা সেখানে লিখে রাখে তাদের স্বপ্নের স্কুল কেমন হবে। বছরের শেষে বক্সগুলোতে জমা হওয়া মন্তব্যগুলো দেখি। 

অনেক সময় আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কোন কোন জায়গায় কাজ করা দরকার, তা এসব লেখা থেকে বুঝতে পারি। এই কাজটি আমাকে যে আনন্দ দেয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

  • আমার স্কুল আঞ্চলিক মহাসড়কের ঠিক পাশে। তাই শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিই।আমার দপ্তরী এবং অভিভাবক কমিটির দুজন সদস্য শিক্ষার্থীদের ছুটির সময় গাড়ি থামিয়ে নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা করেন। 

অথচ ৩০ বছর ধরে শিক্ষার্থীরা রেড লাইট, ইয়েলো লাইট আর গ্রিন লাইটের ব্যাখ্যা নিয়ে কবিতা পড়ে আসছে। জেব্রা ক্রসিং দেওয়ার জন্য আবেদনপত্র নিয়ে কত জায়গায় যে ঘুরেছি, তার হিসাব নেই।

মাস তিন আগে  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আমাদের এলাকায় আসা উপলক্ষে রাস্তায় নামকাওয়াস্তে কিছু সাদা রং ঢেলে দেওয়া হয়েছে। সেটিকে জেব্রা ক্রসিং বলা যায় না। জেব্রা ক্রসিং নিয়ে শিশুরা বইয়ে পড়েছে। 

অথচ আমার এক শিশু জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তাকে নিয়ে সিলেট পর্যন্ত দৌড়েছি। অপারেশনের টাকা দিয়ে সুস্থ করে এনেছি। আজও সে খুঁড়িয়ে হাঁটে। তবু শান্তি। হাজারো শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে। সে প্রাণে বেঁচে গেছে। শিশুটি টিফিন আওয়ারে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। এ কারণে আমি সব সময় তটস্থ থাকি।

শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুলে পত্রিকা পড়ার কর্নার করেছি। প্রতিদিন পত্রিকা কিনে এনে রাখি। ছোটদের কাগজ লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করে কর্নারে রাখি। শিক্ষার্থীরা পড়ে এবং আনন্দ পায়। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষেই আলাদা বুক কর্নার আছে। 

শিশুরা বই পড়ে। এ ক্ষেত্রে চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি। প্রায় আট বছর ধরে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর একজন শিক্ষককে ‘এ বছরের সেরা শিক্ষক’ হিসেবে মনোনীত করে সম্মানিত করি।

বছর শেষে সেরা সুন্দর আচরণ, সেরা উপস্থিতি, সুন্দর হাতের লেখার সেরা শিক্ষার্থী, সেরা আঁকিয়ে, সেরা গল্প লেখক, সেরা কবিতা লেখক, সেরা বক্তা, সেরা ইংরেজিতে কিছু বলতে পারা এবং সেরা গণিতে পারদর্শী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে পুরস্কৃত করি। আমাদের স্কুলের দপ্তরী এবং তাঁর স্ত্রীকেও পুরস্কৃত করি।

এই অনুষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি ও অভিভাবক কমিটির সদস্যদের আমন্ত্রণ জানাই। এই বিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়া কিংবা অন্য বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে যাওয়া শিক্ষকদেরও আমন্ত্রণ জানাই। আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। 

তাই নিজের সন্তানকেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়িয়েছি। আমার সহকর্মীদেরও তাঁদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর পরামর্শ দিই। নিজের সন্তানকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালে শিক্ষকরা নিজেদের আরও সমৃদ্ধ করতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

  • প্রতি বছর রবীন্দ্রজন্মদিবস, নজরুলজয়ন্তী, বেগম রোকেয়ার জন্মদিন এবং বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিন পালন করি। স্কুল খোলার দিনে এসব দিবস পালন করা সহজ। কিন্তু সরকারি বন্ধের দিনে শিশুরা আসতে চায় না। তাই বিভিন্ন দিবস পালনে ৮০ শতাংশ উপস্থিতিও সব সময় সম্ভব হয় না।

প্রতি বছর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বছর শেষে কিছু করার চেষ্টা করি। ছয় বছরের শিখন কার্যক্রম শেষ হওয়ার সময় কোন বিষয়টি তাদের মনে দাগ কেটেছে, কী সুখ বা দুঃখ তারা অনুভব করেছে, সে বিষয়ে তাদের কিছু লিখতে বলি।

তাদের লেখা কখনো ট্রেন, কখনো স্পাইরাল বাইন্ডিং করে বই, কখনো দেয়ালিকা, কখনো ঝুড়িতে, কখনো বক্সে, কখনো লার্নিং ট্রিতে সংগ্রহ করে রাখি। হয়তো কোনো একদিন তারা স্কুলে আসবে। পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে হাসবে। সেই ভাবনাই আমাকে আনন্দ দেয়। এসব সংকলনের নাম দিয়েছি ‘অনুভূতি’, ‘চেতনা’, ‘আমার কথা’, ‘সহজিয়া’, ‘ঝিঙে ফুল’ প্রভৃতি।

প্রতি বছর শিশুদের নিয়ে আমার অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের সহযোগিতায় দেয়ালিকা তৈরি করি। এ বছরও নজরুল বর্ষ উপলক্ষে দেয়ালিকা বানিয়েছি। আমাদের দেয়ালিকার নাম ছিল ‘আমার বাংলাদেশ’, ‘চারুলতা’, ‘জন্মভূমি’, ‘নতুন দিগন্ত’, ‘হৃদয়ে নজরুল’ ও ‘নীলাকাশ’।

শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা হয়। এ কাজে আমরা জেলা পর্যায়ে পুরস্কারও পেয়েছি। আমরা সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাঙালির নববর্ষ পালন করি। নববর্ষের আগের দিন শিক্ষক শিক্ষার্থী মিলে সন্ধ্যা পর্যন্ত আলপনা এঁকে পুরো স্কুল সাজাই। অসাধারণ এক অনুভূতি হয়। সবাই রংবেরঙের উৎসবে মেতে ওঠে। শিক্ষক শিক্ষার্থী মিলে মুড়ি ও চিড়া খাই।

প্রাক প্রাথমিক ও নতুন ভর্তি হওয়া শিশুদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করি। তাদের ছবি আঁকার খাতা ও রং পেন্সিল উপহার দিই। এটি চলমান প্রক্রিয়া। আমি মনে করি, যে শিশু যত বেশি আঁকবে, তার হাতের জড়তা তত বেশি কাটবে।

প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। আমার স্বামী বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বে আছেন। তাঁর সহযোগিতায় বিনামূল্যে চোখের জটিল অপারেশন করিয়ে এনেছি। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ইউনিফর্ম তৈরি করে দিই।

আমার পূর্বের কর্মস্থলের অনেক শিক্ষার্থী এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও শিক্ষক। কেউ গৃহকর্মী। কেউ রংমিস্ত্রি। কেউ রাজমিস্ত্রি। কেউ চা বিক্রি করে। পেশা যাই হোক, সবাই আমাকে ভালোবাসে। 

আমার ডাক্তার হওয়া সাবেক শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আমার স্কুলের শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছি। প্রতি বছর সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের ঈদের জন্য নতুন কাপড় দিই। তাদের পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যও করি। আমার ঈদ বোনাসের টাকা তাদের জন্য ব্যয় করি।

  • আমের ও কাঁঠালের মৌসুমে স্কুলে ফল উৎসব করি। আমার সহকর্মীরা আমাকে সহযোগিতা করেন। আমরা শিশুদের মৌসুমি ফলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমার পুরো স্কুলজুড়ে শুধু গাছ আর গাছ। স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় নীতিকথা ও সুন্দর বাণী লেখা। সব শ্রেণিকক্ষেই পানির ফিল্টার আছে।

স্কুলে দেশের মানচিত্র ও বিদেশি মানচিত্র রাখা আছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বাংলা ও আরবি মাসের নাম লেখা আছে। আমার সব শিক্ষক প্রতিদিন সমাবেশে শিশুদের নিয়ে নীতিকথা বলেন। পরের দিন শিশুদের সেই নীতিকথা বলতে দেওয়া হয়। সবাই না পারলেও অধিকাংশই পারে।

তবে আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা অন্য জায়গায়। আমি আমার সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার কথা ভেবেছিলাম।তাদের পড়তে ভালো লাগে না। অন্য সবকিছু ভালো লাগে। আমি ভাবলাম, তাদের দিয়েই তাদের নিচের শ্রেণিতে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে পাঠদান করানো যায় কি না। 

একদিন দেখলাম, প্রথম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে রিডিং পড়তে পারছে। কিন্তু তাকে অনেক প্রশ্ন করা হলেও সে কিছু বলে না। আমি তাকে বললাম, এটা কি ঠিক? ১৫ দিনের মাথায় সে এসে আমাকে কী যেন একটা লেখা সাবলীলভাবে পড়ে শোনাল। তারপর বলল, ‘ম্যাডাম, আমি আরেক দিন ওয়ানের ক্লাস করাব।’ আমি বললাম, আজ তো সবাই আছে।

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এল। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বাংলা বই হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। আমার চোখে পানি চলে এল। আমি তাকে কাছে ডেকে নিলাম। তার চোখও ছলছল করছিল। আমিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। পরে তার শ্রেণিশিক্ষকের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, শিশুটির মা তার খোঁজ রাখেন না। 

মা অন্য সংসার করেছেন। বাবাও বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। সে মামা মামির আশ্রয়ে থাকে। আমি বুঝতে পারলাম, শিশুটি স্নেহের কাঙাল। তখন আমার মনে হলো, আমি কি কিছু করতে পারি? আসলেই কি আমার কিছু করার আছে? এই প্রশ্ন আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। দুই রাত ঘুমাতে পারিনি।

এ রকম কত ছেলে মেয়ে আমাদের সমাজে আছে, তার খবর আমরা রাখি না। তাদের কেউ স্নেহের কাঙাল। কেউ নিরাপত্তাহীন। কেউ অভুক্ত। কেউ পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে বড় হচ্ছে। কেউ আবার শুধু একটু স্বীকৃতি চায়। 

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবারই এসব শিশুর প্রতি দায়িত্ব আছে।আমি জানি, আমার একার পক্ষে পৃথিবীর সব শিশুর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমার সামনে যে শিশুটি আছে, তার দিকে তাকানো তো সম্ভব।

একটি চকলেট হয়তো খুব ছোট উপহার। একটি কলমও খুব বড় কিছু নয়। একটি বইয়ের দামও হয়তো সামান্য। একটি খাতা হয়তো কয়েক টাকার। কিন্তু কোনো শিশুর কাছে এগুলো হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসার চিহ্ন। একটি মন খারাপের শিশুকে কিছুক্ষণ একা বসার জায়গা করে দেওয়াও হয়তো তার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। একটি দুর্বল শিশুকে বলা, ‘তুমি পারবে’, কখনো কখনো একটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আমি জানি না, আমার মধ্যে কোনো বিশেষ গুণ আছে কি না। জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হতে পারিনি। যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁকে আমি অভিনন্দন জানাই। 

আমার জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি অন্য কোথাও। কোনো একদিন আমার কোনো শিক্ষার্থী যদি পুরোনো স্কুলে ফিরে এসে বলে, ‘ম্যাডাম, আপনি আমাকে ভুলে যাননি’, তাহলেই হয়তো আমার শিক্ষকজীবন সার্থক।

আমি শুধু চাই, আমার স্কুলের শিশুরা লেখাপড়াকে ভয় না পাক। স্কুলকে বোঝা মনে না করুক। তারা যেন স্কুলে এসে আনন্দ পায়। আর যারা একটু পিছিয়ে আছে, তারা যেন কখনো মনে না করে যে তারা অযোগ্য। কারণ একটি শিশুর আজকের দুর্বলতা তার আগামী দিনের পরিচয় নয়।

একজন শিক্ষক হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। কিন্তু তিনি একজন শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারেন। আমি সেই চেষ্টাটুকুই করে যেতে চাই।

লেখক : লতিফা নিলুফার পাপড়ি: প্রধান শিক্ষক (চ.দা), গিয়াসনগর সরকারি প্রাথমিকবিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সদর। লেখালেখির সাথে যুক্ত।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!