ম্যারাডোনা থেকে মেসি—আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের অটুট ভালোবাসা
ঢাকার ছাদজুড়ে উড়ছে নীল-সাদা পতাকা, দেয়ালজুড়ে লিওনেল মেসির ম্যুরাল। দেখে মনে হতে পারে দেশটি আর্জেন্টিনা কিন্তু এটি বাংলাদেশ। যেখানে ফুটবলপ্রেমীরা আবারও দক্ষিণ আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তির প্রতি নিজেদের অনন্য ভালোবাসা উদযাপন করছে।
এএফপির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ কখনোই ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবুও কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনার প্রতি এ দেশের মানুষের এক অনন্য আবেগ ও সমর্থন গড়ে উঠেছে। যা বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে নতুন করে প্রকাশ পায়।
রোববার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে ইউরোপ সেরা স্পেনের। সেই ফাইনালকে ঘিরে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-প্রেম আবারও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে।
.png)

বুয়েনস আইরেসে যেমন আরেকটি শিরোপা জয়ের প্রত্যাশায় উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তেমনি ১০ হাজার মাইল দূরের ঢাকা শহরেও উত্তেজনা তুঙ্গে।
মোটর মেকানিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের সময় আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ঘামছিলাম, প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। তবে এখন আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আর্জেন্টিনাই জিতবে।’
বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থকদের বড় একটি অংশ ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তি ‘আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল’ এই দুই দলে বিভক্ত। তবে ব্রাজিল শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে বিদায় নেওয়ার পর অনেক ব্রাজিল সমর্থকও আর্জেন্টিনার পক্ষ নিয়েছেন।
অনেকের মতে, আর্জেন্টিনার বাইরে সবচেয়ে বেশি 'আলবিসেলেস্তে' সমর্থক বাংলাদেশেই। আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার সূচনা মূলত ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্য দেখেই।
নুরুল ইসলাম জানান, আর্জেন্টিনার প্রতি তার ভালোবাসা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে, যিনি ম্যারাডোনার ভক্ত ছিলেন। সেই ভালোবাসা এখন পৌঁছে গেছে তৃতীয় প্রজন্মের কাছেও। আমার দুই সন্তানও আর্জেন্টিনার সমর্থক। তারা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে খুবই আবেগপ্রবণ। নতুন জার্সি কিনে দেওয়ার জন্য জোর করেছিল।
এই উন্মাদনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জার্সির বাজারে। বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাকসেসরিজ মার্চেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা শামীম পাটোয়ারী বলেন, আর্জেন্টিনার জার্সির চাহিদা এখন ব্যাপক বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ঠিক কতজন আর্জেন্টিনা সমর্থক আছেন সে বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। তবে আমরা বিপুলসংখ্যক জার্সি বিক্রি করেছি।’
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। বিভিন্ন দেশের ফুটবল সমর্থকদের জন্য এখানেই বিপুল পরিমাণ ফুটবল জার্সি তৈরি হয়। বাংলাদেশের অন্যতম বড় স্পোর্টসওয়্যার বিক্রেতা গ্যালাক্সি স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মোট বিক্রির প্রায় ৩০ শতাংশই আর্জেন্টিনার জার্সি। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কিছু অভিভাবক নবজাতক সন্তানদের জন্যও আর্জেন্টিনার জার্সি কিনেছেন। আমরা যে পরিমাণ আর্জেন্টিনার জার্সি মজুত করেছিলাম তার প্রায় সবই বিক্রি হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্লেয়ার এডিশনের জার্সি।

ঢাকার নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে ফুটপাতের অনেক বিক্রেতা তাদের নিয়মিত পণ্যের পরিবর্তে এখন ফুটবল জার্সি বিক্রি করছেন। কম দামের জার্সি কিনতে সেখানে ভিড় করছেন সমর্থকেরা। ৫৫ বছর বয়সী বিক্রেতা আল মামুন বলেন, আমি ম্যারাডোনার খেলা দেখেছি। তারপর থেকেই আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে আছি।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৩তম হলেও প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ঘিরে সারা দেশে ফুটবল জ্বর ছড়িয়ে পড়ে। এই টুর্নামেন্টের আবেগ কখনো কখনো চরম পর্যায়েও পৌঁছে যায়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বিশ্বকাপ চলাকালে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী অনেক ম্যাচ গভীর রাতে শুরু হয়েছে। তবুও সমর্থকদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। ৩৭ বছর বয়সী জাকিয়া মুসান্না জানান, তিনি আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ দেখতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন এবং নীল-সাদা জার্সি পরেই খেলা উপভোগ করেন। তিনি বলেন, জার্সি পরলে মনে হয় আমরা দলেরই একটি অংশ। এক ধরনের একাত্মতার অনুভূতি কাজ করে।
মুসান্না আরো জানান, ২০২২ সালে বাবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় উদযাপন করেছিলেন। এবারও রোববারের ফাইনাল একই জায়গায় বসে দেখার পরিকল্পনা আছে। তার ভাষায়, আমরা একই জায়গায় গিয়ে আগের জয়ের স্মৃতি রোমন্থন করবো এবং আশা করছি এবারও আর্জেন্টিনার আরেকটি বিশ্বকাপ জয় উদযাপন করতে পারবো।