ফেসবুক লাইভেই নারীদের ঈদ শপিং, মিলছে পাহাড়ের মনিপুরীও
করোনাকালীন ঈদে নারীরা এ বছর অনলাইন ভিত্তিক কেনাকাটায় ঝুঁকেছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তাঁতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন উদ্যোক্তারা। কখনো তাঁতি নিজের পেইজ খুলে আবার কখনো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে শাড়িগুলো সরবরাহ করছেন। আর বিভিন্ন পেইজ থেকে ফেসবুক লাইভে চলছে শাড়ি দেখানো। এভাবেই চলছে বেচাকেনা।
এবারের ঈদে সব বয়সী নারীরাই ঝুঁকেছেন সিলেটের মনিপুরী শাড়ির দিকে। মণিপুরী শাড়ির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাঢ় বা হালকা যে রংয়েরই শাড়ি হোক না কেন পাড়ের রং হবে গাঢ়। সাধারণত শাড়ির পাড়ের নকশাটি হয়ে থাকে ত্রিভুজাকৃতির আর শাড়ির ভেতরে থাকে হালকা সুতায় বোনা লতা পাতা। এই নকশাটি মণিপুরীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

মণিপুরীদের বুননে রং আর নকশার রয়েছে এক অপূর্ব সমন্বয়। একসময় নিজেদের প্রয়োজনে মনিপুরীরা তাঁতের কাপড় বুনলেও ধীরে ধীরে এটি বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মনিপুরী শাড়ির বাজার বেড়েছে। কারণ, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে মনিপুরী শাড়ি এখন যেকোনো সম্প্রদায়ের ফ্যাশন সচেতন নারীর কাছে পছন্দনীয়। মনিপুরী শাড়ির রঙ ও নকশা দেখলেই বোঝা যাবে, এটি মনিপুরী শাড়ি। কারণ, মনিপুরী শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হলো- এর নকশায় মাইরাংগ (টেম্পল) বা মন্দিরের প্রতিকৃতি থাকবে। তাই প্রায় প্রতিটি শাড়ির আঁচল, জমিন ও পাড়ের নকশায় দেখা যায় এই প্রতিকৃতি।

মনিপুরী শাড়ি তৈরি হয় বরাবরই উজ্জ্বল রঙের সুতায়। বর্তমানে আঁচল, জমিন ও পাড়ে মন্দির প্রতিকৃতির পাশাপাশি আঁচল ও জমিনে বিভিন্ন নকশা থাকে। এ ছাড়াও শাড়ির রঙ, নকশায়ও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। অনেক তাঁতিই শাড়ির রঙ, বুননে, নকশায় বৈচিত্র আনার চেষ্টা করছেন। চলেছে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রাজশাহীর সিল্ক সুতায়ও মনিপুরী শাড়ি বুনা হচ্ছে। সিল্ক সুতার তৈরি মনিপুরী শাড়ি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মসৃণ ও হালকা। সিল্ক সুতার মনিপুরী শাড়ি বাজারে জনপ্রিয়তাও পেয়েছে বেশ।
সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় মনিপুরী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এখন দেশে যে কয়টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মনিপুরী সম্প্রদায়। তাদের ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও সমৃদ্ধসংস্কৃতি এ দেশে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। মনিপুরীরা বুননশিল্পে খুব দক্ষ। নিজেদের কাপড় তারা নিজেরাই বুনে। প্রবাদ আছে- মনিপুরী মেয়েরা জন্মসূত্রেই তাঁতি ও প্রায় ৯০ শতাংশ নারী তাঁতের সঙ্গে যুক্ত।
মনিপুরীদের উৎপাদিত তাঁতপণ্যের মধ্যে রয়েছে- ফানেক (মনিপুরীদের বিশেষ এক ধরনের পোশাক) শাড়ি, শাল, ওড়না, থ্রি-পিস, গামছা, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর ইত্যাদি। মনিপুরী ভাষায় তাঁতকে বলে ‘ইয়োং’। ইয়োং আবার দুই ধরনের। মোয়াং ও পাং। মোয়াং তাঁতে সাধারণত মোটা সুতার কাপড় তৈরি করা হয়। আর পাং তাঁতে সাধারণত চিকন সুতার কাপড় তৈরি হয়।
মনিপুরীদের শাড়ি বুননের প্রক্রিয়াও অনেকটা আমাদের জামদানি বা দেশী তাঁতের শাড়ির মতো। একটি তাঁতে দু’জন তাঁতি কাজ করেন দুই দিকে বসে। প্রথমে সুতা মাড় দিয়ে শুকাতে হয়। তারপর শুকানো সুতা চরকায় পেঁচিয়ে গুঁটিতে ভরে সেখান থেকে মাকুতে নিয়ে বুনতে হয়। আর সবার আগে শাড়ির টানা বাঁধতে হয়। তারপর বুনন কাজ চলে। একটি শাড়ি বুনতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। তবে শাড়ির রঙ ও নকশার ওপর নির্ভর করে বোনার সময়।
সাধারণত মনিপুরী শাড়ির দাম কমবেশি নির্ভর করে শাড়ির নকশার ওপর ভিত্তি করে। এই শাড়ি এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে মনিপুরী শাড়ি বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আদিবাসীদের নিজস্ব দোকানে মনিপুরী শাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া অনলাইন ভিত্তিক মনিপুরী শাড়ি বিক্রি করে এমন কিছু ফেসবুক পেইজ হল- পাঁচফোড়ন, নীলাদ্রিকা, প্রিয়ম, পালং খিয়্যং, রঙপল্লী।