মানুষ আসলে কী দিয়ে গঠিত?
মানবজীবনের ভেতরের জগৎ: প্রথম অধ্যায়
আমরা প্রতিদিন নিজের শরীর নিয়ে চলাফেরা করি, চিন্তা করি, অনুভব করি, সিদ্ধান্ত নিই, আনন্দিত হই, কষ্ট পাই। কখনো কোনো ঘটনা দীর্ঘদিন মনে থাকে, আবার কখনো পরিচিত একটি নামও মুহূর্তের জন্য মনে করতে পারি না। কখনো নিজের ইচ্ছায় কোনো কাজ করি, আবার কখনো এমন কিছু ঘটে যায়, যা আমরা সচেতনভাবে ঘটাতে চাইনি।
কিন্তু একটু থেমে যদি নিজেকে প্রশ্ন করি, মানুষ আসলে কী দিয়ে গঠিত? শুধু শরীর দিয়ে? নাকি শরীরের ভেতরে থাকা মস্তিষ্কই আমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে? তাহলে মন কোথায়? চিন্তা কোথা থেকে আসে? অনুভূতি কীভাবে তৈরি হয়? আর জীবন ও আত্মার সঙ্গে এসবের সম্পর্কই বা কী?
প্রশ্নগুলো সাধারণ মনে হলেও এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা প্রবেশ করি মানুষের এক বিস্ময়কর জগতে।
শরীর: জীবনের দৃশ্যমান কাঠামো
মানুষের শরীর অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠিত। কোষ হলো জীবদেহের মৌলিক গঠন ও কার্যকরী একক। বিভিন্ন ধরনের কোষ একত্র হয়ে টিস্যু তৈরি করে, টিস্যু থেকে গঠিত হয় অঙ্গ, আর বিভিন্ন অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করে তৈরি করে অঙ্গতন্ত্র।
হৃদ্যন্ত্র রক্ত সঞ্চালন করে, ফুসফুস অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে, কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করতে সাহায্য করে। পরিপাকতন্ত্র খাবার হজম করে শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে। হরমোন ও স্নায়ুতন্ত্র শরীরের বিভিন্ন কাজের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখে।
এই ব্যবস্থাগুলো আলাদা আলাদা কাজ করলেও একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা, পানির ভারসাম্য, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার প্রক্রিয়াকে বলা হয় হোমিওস্ট্যাসিস।
অর্থাৎ, আমরা শুধু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সমষ্টি নই। আমরা এমন একটি সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা, যার প্রতিটি অংশ অন্য অংশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করে।
মস্তিষ্ক: শরীরের সমন্বয়কেন্দ্র
মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গগুলোর একটি হলো মস্তিষ্ক। এটি স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান সমন্বয়কেন্দ্র। মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু মিলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠন করে।
আমরা যখন কোনো কিছু দেখি, শুনি, স্পর্শ করি কিংবা গন্ধ পাই, তখন শরীরের সংবেদনগ্রাহী অংশগুলো সেই তথ্য স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। মস্তিষ্ক সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
আমরা যখন হাঁটি, কথা বলি, লিখি, কোনো সমস্যার সমাধান করি কিংবা পরিচিত কাউকে চিনতে পারি, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ও স্নায়বিক নেটওয়ার্ক একসঙ্গে কাজ করে।
মস্তিষ্ক শুধু আমাদের সচেতন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে না। শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদ্স্পন্দন, রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা এবং ঘুম-জাগরণের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজেও এর ভূমিকা রয়েছে। এসব কাজের অনেকগুলোই আমাদের সচেতন নির্দেশ ছাড়াই পরিচালিত হয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: মস্তিষ্কের কোনো একটি অংশ একাই মানুষের সব চিন্তা, অনুভূতি বা আচরণ তৈরি করে না। বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই জটিল মানসিক কার্যক্রম সম্ভব হয়।
তাহলে মন কোথায়?
এবার আসি এমন একটি প্রশ্নে, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ বহু যুগ ধরে দর্শন, মনোবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েছে।
আমরা বলি, আমার মন ভালো নেই। মন খারাপ হয়েছে। মন দিয়ে পড়তে হবে। মন চায় একরকম, কিন্তু বাস্তবতা বলে অন্যরকম। আবার কখনো বলি, মন স্থির রাখতে পারছি না।
কিন্তু মনকে কি শরীরের কোনো অঙ্গের মতো দেখানো সম্ভব?
না। মস্তিষ্কের মতো মন কোনো স্বতন্ত্র অঙ্গ নয়। মন বলতে আমরা সাধারণত মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, কল্পনা, মনোযোগ, ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত এবং আত্মসচেতনতার মতো মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর সমষ্টিকে বুঝি।
বিজ্ঞান এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের গভীর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের মধ্যে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের আদান-প্রদান ঘটে। এই কার্যক্রমের বিভিন্ন বিন্যাসের সঙ্গে আমাদের চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে মনের সব অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট মস্তিষ্কের অংশের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষের মন বোঝার জন্য মস্তিষ্কের পাশাপাশি শরীর, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক সম্পর্ককেও বিবেচনায় নিতে হয়।
চিন্তা কোথা থেকে আসে?
ধরা যাক, আপনি একটি পুরোনো ছবি দেখলেন। মুহূর্তের মধ্যে আপনার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের কোনো ঘটনা। সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা কিংবা হারানোর বেদনা।
একটি ছবি কীভাবে এতগুলো চিন্তা ও অনুভূতির জন্ম দিল?
এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যবস্থা। দেখা ছবির তথ্য, পূর্বের স্মৃতি, আবেগ এবং বর্তমান পরিস্থিতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। ফলে একটি ছোট উদ্দীপনা থেকেও অনেক চিন্তার জন্ম হতে পারে।
আমাদের চিন্তা সব সময় সচেতনভাবে তৈরি হয় না। কখনো আমরা কোনো বিষয় নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাবি। আবার কখনো কোনো কাজ করতে করতে হঠাৎ অন্য একটি চিন্তা মাথায় চলে আসে। কখনো পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে, কখনো ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
অর্থাৎ, চিন্তার উৎপত্তি কোনো একক স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। স্মৃতি, মনোযোগ, আবেগ, ভাষা, ইন্দ্রিয়ের তথ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মস্তিষ্কীয় প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে।
এখানেই মানুষের ভেতরের জগৎ আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। আমরা চিন্তা করি, কিন্তু সব সময় জানি না কেন ঠিক সেই মুহূর্তে সেই চিন্তাটিই আমাদের মনে এল।
চেতনা: আমি যে নিজেকে অনুভব করছি
মানুষ শুধু চিন্তা করে না, সে নিজের চিন্তা সম্পর্কেও সচেতন হতে পারে।
যেমন, আপনি এখন এই লেখাটি পড়ছেন। আপনি শুধু শব্দগুলো দেখছেন না, একই সঙ্গে বুঝতে পারছেন যে আপনি পড়ছেন, ভাবছেন এবং কোনো কোনো বিষয়ের সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হচ্ছেন।
নিজের অস্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও মানসিক অবস্থাকে উপলব্ধি করার এই ক্ষমতার সঙ্গে চেতনা ও আত্মসচেতনতার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে চেতনা বলতে শুধু জেগে থাকা বোঝায় না। জেগে থাকা, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজের সম্পর্কে সচেতন হওয়া একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়।
বিজ্ঞান মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে চেতনার বিভিন্ন দিকের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছে। কিন্তু একজন মানুষ কীভাবে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভেতর থেকে অনুভব করে, সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি কী, এর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনো বিজ্ঞান দিতে পারেনি।
এটি মানুষের মনের জগৎ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি।

শরীর ও মনের সম্পর্ক
অনেক সময় আমরা মনে করি মন ও শরীর যেন দুটি আলাদা জগৎ। বাস্তবে তাদের মধ্যে গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
ভয় পেলে হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায়, হাত ঘামতে পারে, শ্বাস দ্রুত হয়। দুশ্চিন্তায় ঘুমের সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে মনোযোগ ও মেজাজে পরিবর্তন আসতে পারে। আবার পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এই যোগাযোগ শুধু মস্তিষ্ক থেকে শরীরের দিকে যায় না। শরীরের ভেতরের অবস্থাও মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। হৃদ্স্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, ক্ষুধা, ব্যথা কিংবা শরীরের অস্বস্তি আমাদের অনুভূতি ও চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই মনকে বুঝতে হলে শরীরকে বাদ দেওয়া যায় না। একইভাবে শরীরের যত্ন নিতে গেলেও মানসিক অবস্থাকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
জীবন ও আত্মা: বিজ্ঞানের সীমা কোথায়?
এবার আসি আরও গভীর একটি প্রশ্নে। শরীর, মস্তিষ্ক, মন ও চেতনার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক কী? আর আত্মা বা রূহের অবস্থান কোথায়?
জীববিজ্ঞান জীবনকে জীবদেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। কোষের কার্যক্রম, বিপাক, বৃদ্ধি, পরিবেশের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া, প্রজনন এবং অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো জীবনের বৈজ্ঞানিক আলোচনার অংশ।
অন্যদিকে, আত্মা বা রূহের ধারণা ধর্ম ও দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইসলামী বিশ্বাসে রূহ মানুষের অস্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশের বিষয়।”
— সুরা আল-ইসরা, ১৭:৮৫
এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। বিজ্ঞান মস্তিষ্কের কার্যক্রম, স্মৃতি, অনুভূতি ও চেতনার বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করতে পারে। কিন্তু রূহের অস্তিত্ব বা প্রকৃতিকে স্নায়ুবিজ্ঞানের কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা বা অপ্রমাণ করার দাবি করা যায় না।
ধর্মীয় বিশ্বাস, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের নিজস্ব প্রশ্ন ও পদ্ধতি রয়েছে। একটির সীমা অতিক্রম করে অন্যটির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
মানুষকে বোঝার জন্য তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সম্মান করতে হবে, আবার ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রশ্নের স্বতন্ত্র অবস্থানও বুঝতে হবে।
আমরা কি নিজেদের ভেতরের জগৎকে চিনি?
আমরা শরীরের যত্ন নিই, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাই, খাবার নির্বাচন করি, কাজ করি, পরিবার গড়ি। কিন্তু নিজের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয়, মনোযোগ কেন হারিয়ে যায়, চিন্তা কীভাবে আসে কিংবা ঘুমের সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে, এসব বিষয়ে আমাদের অনেকেরই ধারণা সীমিত।
অথচ প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে এসব বিষয় জড়িত।

কেন কোনো কথা সহজে মনে থাকে, আবার কোনো কিছু বারবার পড়েও মনে রাখা কঠিন হয়? কেন আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়তে বসে হঠাৎ অন্য চিন্তায় হারিয়ে যাই? কেন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি? কেন কখনো নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের ভেতরের ব্যবস্থাকে বুঝতে হবে।
মানুষের শরীর, মস্তিষ্ক, মন ও চেতনা আলাদা আলাদা শব্দ হলেও তারা বিচ্ছিন্ন কোনো জগৎ নয়। তাদের মধ্যে রয়েছে জটিল সম্পর্ক, পারস্পরিক প্রভাব ও সমন্বয়। আর আত্মা বা রূহের প্রশ্ন আমাদের নিয়ে যায় বিশ্বাস ও দর্শনের আরও গভীর আলোচনায়।
নিজেকে বুঝতে হলে শুধু নিজের শরীরকে চিনলেই হবে না; বুঝতে হবে নিজের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, মনোযোগ ও আচরণের ভেতরের কার্যপ্রণালিও।
এই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে আমরা আরও কাছ থেকে দেখব মানুষের মস্তিষ্ককে। মস্তিষ্কের কোন অংশ কী কাজ করে, স্নায়ুকোষ কীভাবে তথ্য আদান-প্রদান করে এবং কীভাবে এই জটিল ব্যবস্থা আমাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা জানবো মানুষের মস্তিষ্ক, গঠন ও কার্যপ্রণালি।
লেখক : রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন