ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের মাহমুদা সুলতানা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৯, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের মাহমুদা সুলতানা
বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর NASA—মাহমুদা সুলতানার পথচলা দেখায় যে বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, গবেষণা ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব কতটা

তিনি ড. মাহমুদা সুলতানা—বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন বিজ্ঞানী, যিনি ন্যানোটেকনোলজি, সেন্সর ও মহাকাশযানের জন্য উন্নত যন্ত্র তৈরির গবেষণায় কাজ করছেন। NASA-এর বর্তমান প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি Goddard Space Flight Center-এর Planetary Environments Laboratory-তে instrument scientist হিসেবে কাজ করছেন।

মাহমুদা সুলতানার বিজ্ঞানযাত্রার শুরু বাংলাদেশেই। NASA-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর বাবা ছিলেন সরকারের একজন supervisory civil engineer এবং ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন প্রকৌশল প্রকল্পের কাজে গিয়ে যন্ত্র ও প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা জানার আগ্রহ তৈরি হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর পরিবার দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যায়। পরে তিনি University of Southern California থেকে Chemical Engineering-এ স্নাতক ডিগ্রি এবং MIT থেকে Chemical Engineering-এ পিএইচডি অর্জন করেন।

১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান মাহমুদা। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার নতুন পরিবেশে তিনি নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ পান। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে গণিতে অপ্রধান বিষয়সহ রাসায়নিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর বৃত্তি নিয়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ২০১০ সালে রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

A woman with medium brown skin and long dark hair wears a white lab coat and blue gloves.  She holds up a green board with silver circuitry mounted on its surface. The board has a larger black square near its bottom. There's a black spiral cord connected. The background is a desk with a desktop and a neon yellow light illuminating the wall behind the woman.

তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশে নারী প্রকৌশলীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। প্রকৌশলীদের একটি আবাসিক এলাকায় বড় হওয়ার সময় আশপাশে অসংখ্য পুরুষ প্রকৌশলী দেখলেও কোনো নারী প্রকৌশলী তাঁর চোখে পড়েনি। ফলে অল্প বয়সে তাঁর মনে ধারণা তৈরি হয়েছিল, প্রকৌশল হয়তো মূলত পুরুষদের পেশা। পরবর্তী সময়ে নিজের জীবন দিয়েই সেই ধারণা ভেঙেছেন তিনি।

  • মহাকাশ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরিতেও পরিবারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এক নিকট আত্মীয় ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার অ্যামেস গবেষণাকেন্দ্রে পদার্থবিদ হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কাছ থেকে মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে নানা গল্প শুনে মাহমুদার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। 

গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। নাসায় কাজ করার আকাঙ্ক্ষাও তখন থেকেই তাঁর মনে জায়গা করে নেয়।

ছোটবেলায় বাংলাদেশে বসে NASA-তে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নই একসময় তাঁকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান Massachusetts Institute of Technology (MIT)-এ, আর সেখান থেকে NASA-এর Goddard Space Flight Center-এ।

নাসায় যোগ দেওয়ার গল্পটিও তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পিএইচডির শেষ বছরে চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন মাহমুদা। এমআইটির একটি কর্মসংস্থান মেলায় নিজের জীবনবৃত্তান্ত বিতরণ করতে করতে শেষ কপিটি হাতে ছিল তাঁর। তখন নাসার গডার্ড মহাকাশ উড়ানকেন্দ্রের বুথ তাঁর চোখে পড়ে। ছোটবেলার স্বপ্নের কথা মনে করে শেষ জীবনবৃত্তান্তটি তিনি সেখানে জমা দেন।

NASA-তে তাঁর যাত্রাটিও ছিল কিছুটা আকস্মিক। MIT-তে পড়াশোনার শেষ দিকে একটি ক্যারিয়ার ফেয়ারে NASA Goddard-এর বুথ দেখে শৈশবের সেই স্বপ্নের কথা আবার মনে পড়ে যায়। নিজের শেষ জীবনবৃত্তান্তটি তিনি NASA-এর প্রতিনিধির কাছে জমা দেন। এরপর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ২০১০ সালে Goddard Space Flight Center-এ যোগ দেন।

তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ছিল James Webb Space Telescope-এর Microshutter Array নিয়ে গবেষণা। NASA জানিয়েছে, এই প্রযুক্তিতে শত শত ক্ষুদ্র শাটার বা জানালা রয়েছে, যেগুলো নির্দিষ্ট আলো ডিটেক্টরের দিকে প্রবেশ করতে দেয়। পরবর্তীতে মাহমুদা ন্যানোম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও বহুমুখী সেন্সর তৈরির গবেষণায় আরও এগিয়ে যান।

মাহমুদা সুলতানার গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো Multifunctional Nanosensor Platform। NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিতে একই প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ন্যানোম্যাটেরিয়ালভিত্তিক সেন্সর বসানো যায়।

এর লক্ষ্য হলো অত্যন্ত অল্প মাত্রার বিভিন্ন গ্যাস ও পরিবেশগত উপাদান শনাক্ত করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি গ্রহের পরিবেশ ও জীবনধারণের সম্ভাবনা অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন মহাকাশ মিশনে কাজে লাগতে পারে।

কোয়ান্টাম ডট নিয়েও কাজ করছেন এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী। NASA-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর Quantum Dot Spectrometer ধারণাটি এমন প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ন্যানোস্কেলের সেমিকন্ডাক্টর কণার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে মহাকাশে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিমাপ করা সম্ভব হতে পারে।

Mahmooda Sultana Selected as Goddard's FY17 IRAD Innovator of the Year  🇧🇩️ As a child living in Bangladesh, Mahmooda Sultana probably followed  NASA's accomplishments more so than other kids her age.

NASA-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের outer-planet exploration-এর সম্ভাব্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মাহমুদা সুলতানার গবেষণা NASA-তেও একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছে। NASA-এর অফিসিয়াল জীবনীতে তাঁর পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে ২০১৭ সালের Goddard Innovator of the Year Award, ২০১৯ সালের Robert H. Goddard Award for Technical Excellence, ২০২১ সালের STMD Innovation Award এবং Craig Tooley Award। এছাড়া James Webb Space Telescope-এর জন্য Group Achievement Award-ও তাঁর স্বীকৃতির তালিকায় রয়েছে।

মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে উৎসাহিত করতেও কাজ করেন মাহমুদা। NASA-এর সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বিশেষ করে মেয়েদের সামনে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল পেশার বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে তিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর নিজের জীবনের গল্পই এখন অনেক তরুণের কাছে বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণার একটি উদাহরণ।

বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর NASA—মাহমুদা সুলতানার পথচলা দেখায় যে বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, গবেষণা ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব কতটা।

তাঁর কাজের একটি বড় অংশ এখনো গবেষণা ও ভবিষ্যৎ মহাকাশ প্রযুক্তির উন্নয়নকে ঘিরে। তাই তাঁকে শুধু “NASA-তে কাজ করা বাংলাদেশি” হিসেবে নয়, বরং মহাকাশ গবেষণার জন্য নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী হিসেবেও দেখা যায়।

** প্রতিবেদনটি NASA-এর অফিসিয়াল প্রকাশনা ও জীবনী এবং প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন এর আলোকে। “ড. নওরীন সুলতানা” নামে নয়, সংশ্লিষ্ট NASA সূত্রগুলোতে বিজ্ঞানীর নাম Dr. Mahmooda Sultana হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!